প্রশান্ত বর্মনের মামলায় রাজ্য পুলিশের মুখে চুনকালি লেপে দিল সুপ্রিম কোর্ট! প্রশান্তকে রক্ষায় পুলিশের আগ্রহের নেপথ্যে রহস্যটা কী? লিখলেন উত্তম দেব—
বিডিও-র চাকরি করতে করতে একটা মানুষ খুনের মামলায় জড়ালেন। ঘটনার এক বছর পার— অভিযুক্ত মানুষটা শুধু আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরেই নেই, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশকে কলা দেখিয়ে গত মে মাস পর্যন্ত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন! বিধাননগর দত্তাবাদের স্বর্ণব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যার ক্ষত-বিক্ষত দেহ নিউটাউনের যাত্রাগাছি এলাকায় একটি খালপাড় থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছিল ২০২৫-এর ২৯ অক্টোবর। ঘটনার পর থেকে প্রশান্তর বিরুদ্ধে কার্যত কোনও পদক্ষেপই করে নি বিধাননগর থানার পুলিশ। অথচ নিহতের পরিবারের তরফে করা এফআইআরে অভিযুক্ত হিসেবে একমাত্র নামটিই ছিল প্রশান্ত বর্মনের।
ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ বেশ দ্রুততার সঙ্গেই প্রশান্তর গাড়ির চালক সহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করলেও প্রশান্ত বর্মনকে একবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় তলব পর্যন্ত করে নি! প্রশান্ত বর্মনকে মমতার পুলিশ খুঁজে পায় নি। শুভেন্দু অধিকারীর পুলিশ গত ২৫ মে রাতে নিউ টাউনের ইকো পার্কে পথসুরক্ষা বিধি ভঙ্গের মামলায় প্রশান্তকে গ্রেফতার করেও পরের দিন আদালত থেকে জামিন পাইয়ে দিয়েছে— খুনের মামলায় প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট লাগু থাকার পরেও বিধাননগর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে নি। স্বপন কামিল্যা খুনের মামলার নথি সন্ধ্যা পর্যন্ত বারাসত আদালতে এসে না পৌঁছানোয় রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিওকে পথসুরক্ষা বিধি ভঙ্গের মামলায় জামিন দিয়ে দেন বিচারক। জামিন পেয়ে প্রশান্ত বর্মন পুলিশ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের চোখের সামনে দিয়ে গাড়িতে উঠে হাওয়া হয়ে যান।

খুনের মামলায় প্রধান অভিযুক্ত হওয়ার পরেও গত বছরের ২৬ নভেম্বর প্রশান্ত বর্মনের আগাম জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলা আদালতের জেলা বিচারক শান্তনু ঝাঁ। জেলা আদালত থেকে পাওয়া প্রশান্তর আগাম জামিন খারিজ করে দিয়ে ২২ ডিসেম্বর তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলেন কলকাতা হাইকোর্টর বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ। হাইকোর্টের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ বিধাননগর আদালতে প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানালে আদালত তা মঞ্জুর করে। কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে প্রশান্তকে গ্রেফতারে কার্যকর কোনও উদ্যোগ না নিয়ে তাঁকে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় বিধাননগর থানার পুলিশ।
গত ১৯ জানুয়ারি শুনানি শেষে হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ না করেই স্বপন কামিল্যা হত্যা মামলায় প্রশান্ত বর্মনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। প্রশান্তকে ২৩ জানুয়ারির মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দিয়েছিল বিচারপতি রাজেশ বিন্দল এবং বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোইয়ের বেঞ্চ। কিন্তু দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পরেও প্রশান্ত বর্মন আত্মসমর্পণ করেন নি। মে মাসের ৪ তারিখ রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশান্ত বর্মনের ব্যাপারে পুলিশের ভূমিকার পরিবর্তন হয় নি!
পর্দার পিছনে রহস্যটা কী? খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়ার আগে থেকেই প্রশান্ত বর্মন নামটা বিতর্কিত। সাদা খাতা জমা দিয়েও ডাব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় পাশ করে রাজ্য সিভিল সার্ভিসের এ গ্রুপে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ নিয়েও হাইকোর্টে প্রশান্তর বিরুদ্ধে মামলা চলছে। একজন বিডিও হয়েও বদমেজাজি প্রশান্ত জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের মাথায় পা দিয়ে চলতেন বলে শোনা যায়। তাঁকে কেউ ঘাটাতে সাহস পেতেন না। প্রশান্ত বর্মনকে রাজগঞ্জ ব্লক থেকে বদলি করার নির্দেশ দেওয়ার পরেও তা ২৪ ঘন্টার মধ্যে রদ করেছে নবান্ন। তৃণমূলের জামানায় সবাই বলত, প্রশান্তর মাথায় দিদির হাত, তাঁকে কেউ কিছু করতে পারবে না।

জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জের বিডিওর সল্টলেকের দত্তাবাদের স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কীসের কারবার? গাড়ি ভর্তি লোকজন নিয়ে স্বপন কামিল্যাকে তাঁর সোনার দোকান থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ প্রশান্তর বিরুদ্ধে। একজন ডাব্লিউবিসিএস এক্সিকিউটিভ ক্যাডার সোনা পাচারচক্রে জড়িত বলে বাতাসে গুঞ্জন। পাচারকর্মে জড়িয়ে গিয়ে তিনি মানুষ পর্যন্ত খুন করে বসলেন! একজন আমলা হয়েও এতবড় অপরাধ করে যিনি প্রশাসনের মুখে চুনকালি মাখাতে পারেন, তাঁকে ধরতে প্রথম থেকেই পুলিশের কোনও হেলদোল নেই। কত বড় বড় অপরাধী, ভয়ঙ্কর সব সন্ত্রাসবাদী, মোস্ট ওয়ান্টেড মাওবাদী নেতা পুলিশের পাতা জালে ধরা পড়ে যায়। আর প্রশান্তকে পুলিশ খুঁজে পায় না!
খুনে অভিযুক্ত একজন সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। সেই আধিকারিক ১০-১১ মাস ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অথচ তাঁর চাকরির বর্তমান ‘স্ট্যাটাস’-টা ঠিক কী, তা খোলসা করছে না সরকার। আইনের চোখে পলাতক একজন আসামি বেতন তুলছেন কীভাবে? নিহত স্বপন কামিল্যার পরিবার বিচার চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ না হলে আমরা জানতেই পারতাম না, রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও-র স্যালারি অ্যাকাউন্টে স্যালারি ঢুকে যাচ্ছে।
গত ৬ অক্টোবরের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের বেঞ্চ রাজ্য সরকারের মুখে কার্যত জুতোর বাড়ি মারে। ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রশান্ত বর্মনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয় বেঞ্চ। ১০ মাস ধরে ফেরারী একজন আসামীর সম্পত্তি কেন এখনও বাজেয়াপ্ত করা হয় নি, সরকারের কাছে জানতে চায় আদালত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে খুন-অপহরণের মামলায় অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিকের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেয় কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। প্রশান্ত বর্মন মাসে মাসে বেতন পেয়ে যাচ্ছেন শুনে তাজ্জব হয়ে যান প্রধান বিচারপতি। অবিলম্বে তাঁর বেতন বন্ধের নির্দেশ দেয় আদালত।
আমি আশ্চর্য হয়ে যাই, প্রশান্তর আইনজীবীর দুর্বুদ্ধি, দুঃসাহস ও ধৃষ্টতা দেখে! স্বর্ণকারকে খুন-অপহরণের মামলায় ৯ মাস আগেই প্রশান্তর আগাম জামিনের আর্জি খারিজ করে দিয়ে তাঁকে সাত দিনের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করেছেন প্রশান্ত। একই মামলায় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের দেওয়া ৬ অক্টোবরের রায়ের বিরুদ্ধে আবার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন প্রশান্ত বর্মনের আইনজীবী। মামলাটি মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টে উঠলে বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও বিচারপতি মনুভাই পাঞ্চোলির বেঞ্চ তাজ্জব হয়ে মন্তব্য করে, “একজন ব্যক্তি পুরো ব্যবস্থাকে (সিস্টেম) উপহাস করে রেখে দিয়েছেন। এই আদালতের আগের নির্দেশ অমান্য করেছেন। কীভাবে এমন হতে পারে?”
গত ডিসেম্বর মাস থেকেই প্রশান্ত বর্মন আদালতকে, দেশের বিচার বিভাগকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছেন! আর এই কাজে তাকে পেছন থেকে নীরবে মদত দিয়ে যাচ্ছে কে? উত্তর— পুলিশ ও প্রশাসন। দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। অনেক বড় বড় রাঘব বোয়াল, প্রভাবশালীদের দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশকে উপেক্ষা করার সাহস হয় নি।
গত ডিসেম্বর মাস থেকেই প্রশান্ত বর্মন আদালতকে, দেশের বিচার বিভাগকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছেন! আর এই কাজে তাকে পেছন থেকে নীরবে মদত দিয়ে যাচ্ছে কে? উত্তর— পুলিশ ও প্রশাসন। দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। অনেক বড় বড় রাঘব বোয়াল, প্রভাবশালীদের দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশকে উপেক্ষা করার সাহস হয় নি। আর প্রশান্ত কে? সমান্য একজন সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক, যার বিরুদ্ধে আবার সাদা খাতা জমা দিয়ে ‘ডাব্লিউবিসিএস’ পাশ করার অভিযোগ। এই লোকটা সুপ্রিম কোর্টকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফেরারী হয়েও দিনের পর দিন ড্যাং ড্যাং করে ঘুরে বেরিয়েছেন। পুলিশ দেখেও দেখে নি, এমনকি ঘটনাচক্রে ধরা পড়ার পরেও তাঁকে খুনের মামলায় গ্রেফতার না করে ছেড়ে দিয়েছে! পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, প্রশান্ত বর্মন এমন একজন প্রভাবশালী ভারতীয়, যাঁর মাথায় ট্রাম্প, পুতিন, জিনপিং— তিনজনেরই হাত আছে।
প্রশান্ত বর্মনের মামলা খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের ৬ অক্টোবরের রায়কে বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টে মুখ পুড়েছে রাজ্য সরকারের। শুনানি চলাকালে বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, “আমরা অবাক হয়ে যাচ্ছি! আগে নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও তা অমান্য করা হয়েছে। পুলিশ কি অভিযুক্তের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে?”
একজন প্রশান্ত বর্মনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের মুখে চুনকালি মাখল রাজ্যের পুলিশ। কার নির্দেশে পুলিশ খুন-অপহরণের মতো মারাত্মক মামলায় অভিযুক্ত প্রশান্তর ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থেকে দেশের শীর্ষ আদালতে বদনাম কুড়োলো? প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশ ছাড়া এমন স্পর্শকাতর মামলায় তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ ইচ্ছেকৃত ঢিলেমি করার, গাফিলতি করার ঝুঁকি নিতে পারে? নেওয়া সম্ভব? প্রশান্ত বর্মন রহস্য যে প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও গভীর, তা বোঝার জন্য ‘কোয়ান্টাম ফিজিক্স’ জানার দরকার পড়ে না। আমরা সাধারণ মানুষ দুইয়ে দুইয়ে চার ভালোই করতে পারি।

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।