অরুণ কুমার: হিমালয়ঘেরা নেপালে ফের প্রকৃতির ভয়াবহ রুদ্ররূপ। ২৬ আগস্ট বুধবার সকাল প্রায় ৮টা ৩০ মিনিটে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী-সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা। বিশেষ করে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোরখা জেলার নদীতীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বহু বসতি, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই বিপর্যয়ের সময় ওই এলাকায় অবস্থানকারী অথবা ওই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী শত শত পর্যটক ও ভ্রমণকারীর এখনও কোনো সন্ধান মেলেনি।
নেপাল সরকারের সংস্কৃতি, পর্যটন ও অসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়, নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড, ট্যুরিস্ট পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং পর্যটন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে নিখোঁজ পর্যটকদের অবস্থান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের ২৭ আগস্টের “Situation Update–3: Bhotekoshi Flash Flood” বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ট্রেকিং ও ট্রাভেল সংস্থাগুলির কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী মোট ৬৪৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারীকে নিখোঁজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২৭ জন নেপালি নাগরিক এবং ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তবে এই সংখ্যা প্রাথমিক এবং সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ সংস্থা, গাইড, স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে যাচাই করা হচ্ছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রকাশিত দেশভিত্তিক তালিকাটি পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক গুরুত্বও স্পষ্ট করে। তালিকায় ভারতের ১৭৮ জন, ইউক্রেনের ৫৩ জন, মালয়েশিয়ার ৫১ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৫ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫ জন, কানাডার ২৫ জন, জার্মানির ৮ জন, রাশিয়ার ৮ জন, লাটভিয়ার ৬ জন, দক্ষিণ আফ্রিকার ৬ জন, জাপানের ৫ জন, নিউজিল্যান্ডের ৫ জন এবং ফ্রান্সের ৪ জন নাগরিক রয়েছেন। এছাড়াও বেলজিয়াম, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড, হাঙ্গেরি, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, ইজরায়েল, কাজাখস্তান, লিথুয়ানিয়া, নেদারল্যান্ডস, ফিলিপাইনস, পর্তুগাল, সার্বিয়া, সিঙ্গাপুর, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডের নাগরিকরাও তালিকায় রয়েছেন। নেপালের নাগরিকদের মধ্যে ১২৭ জন নিখোঁজ বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তালিকায় ভারতের নাগরিকের সংখ্যা সর্বাধিক হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ভারতের পর্যটন ও কূটনৈতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কৈলাস-মানসসরোবর ও গোসাইঙ্কুণ্ডমুখী যাত্রাপথে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের চলাচল থাকায় তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই বিপর্যয়ে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা উঠে এসেছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর চারটি জেলার নদীতীরবর্তী অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নদীর প্রবল স্রোতের কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আহত ও আটকে পড়া মানুষদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের অবস্থান শনাক্ত করাই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
এই বিপর্যয় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি নেপালের পর্যটন-নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। নেপালের অর্থনীতিতে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক, ট্রেকার, পর্বতারোহী ও তীর্থযাত্রীরা সেখানে যান। ফলে পাহাড়ি পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে Early Warning System, পর্যটকদের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক ট্রাভেল রেজিস্ট্রেশন এবং দুর্যোগকালীন উদ্ধার-পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির অস্থিতিশীলতা এবং আকস্মিক ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোও দেখাচ্ছে যে অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত দ্রুতগতির জল, কাদা ও পাথরের স্রোত বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে পর্যটনকে শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে না দেখে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পর্যটনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি পর্যটন সংস্থা, ট্রেকিং কোম্পানি, গাইড ও ট্যুর অপারেটরের কাছে পর্যটকদের সঠিক অবস্থান, যোগাযোগ নম্বর, রুট এবং জরুরি তথ্য সংরক্ষিত থাকা উচিত। একই সঙ্গে বিপজ্জনক আবহাওয়া বা নদীর জলস্তর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পর্যটকদের দ্রুত বিকল্প নিরাপদ রুটে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড নিখোঁজ ও বিপদে পড়া পর্যটকদের পরিবারের জন্য জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থাও জানিয়েছে। টোল-ফ্রি জরুরি নম্বর ১২৩৪, হটলাইন ১১৪৪ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের নম্বর ৯৮৫১২৮৯৪৪৫-এ যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিকটবর্তী পুলিশ বা নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, ট্রাভেল এজেন্সি, গাইড অথবা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক সমন্বিত উদ্ধার অভিযান। নিখোঁজ ৬৪৪ জনের প্রত্যেকের অবস্থান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা, পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা এবং দেশভিত্তিক তথ্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলিকে দ্রুত সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের এই বিজ্ঞপ্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই হল—“Tourist safety remains our first priority.” অর্থাৎ পর্যটকের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এই দুর্যোগের মধ্য দিয়ে নেপালকে একদিকে যেমন মানুষের জীবন রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে, তেমনই ভবিষ্যতের জন্য আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরাপদ পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
প্রকৃতির এই নির্মম আঘাতে যারা নিখোঁজ, তাঁদের দ্রুত সন্ধান মিলুক, আহতরা সুস্থ হয়ে ফিরুন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি দ্রুত স্বজনদের কাছে ফিরে পান—এই মুহূর্তে এটাই নেপাল তথা আন্তর্জাতিক পর্যটনসমাজের প্রধান প্রত্যাশা।
তথ্যসূত্র: নেপাল পর্যটন বিভাগ দ্বারা জারি করা প্রেস বিজ্ঞপ্তি।