বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশে গানবাজনা বন্ধ হওয়ার মুখে। গানবাজনা হারাম, তাই ঘরে কিম্বা বাইরে গানবাজনার চর্চা চলবে না, ফতোয়া দিয়েছে তৌহিদি জনতা। তৌহিদি জনতা নাম নিয়ে বাংলাদেশে ইসলামিক মৌলবাদীদের একাধিক সংগঠন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পন্ড করে বেড়াচ্ছে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ জুড়ে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মুহাম্মদ ইউনূসের জামানায় রাজধানী ঢাকায় জাতীয় নাটোৎসব পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে মৌলবাদীরা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু তারপরেও গানের আসর পন্ড করার হিড়িক বন্ধ হয় নি।
অতি সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে তৌহিদি জনতার বাধার মুখে কনসার্ট বন্ধ করতে হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই স্থানীয় আলেম-উলেমাদের দাবি ছিল, গান-বাজনা শরিয়ত বিরোধী। অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাঁরা দায়ী থাকবেন না। কনসার্টের উদ্যোক্তারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। কিন্তু প্রশাসনিক মহল মৌলবাদীদের হুমকির কাছে নতিস্বীকার করে আয়োজকদের উল্টো অনুষ্ঠান স্থগিত করার নির্দেশ দেয়।

উপমহাদেশের কিংবদন্তি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ সুরসম্রাট উস্তাদ বাবা আলাউদ্দিন খাঁর জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখন মৌলবাদীদের ভয়ে ছেলেমেয়েদের গানবাজনা শেখানো বন্ধ করে দিয়েছেন অভিভাবকেরা। ইউনূস জামানায় বাবা আলাউদ্দিন খাঁ নামাঙ্কিত অ্যাকাডেমিতে ঢুকে সমস্ত বাদ্যযন্ত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ভবনটি পুড়িয়ে দিয়েছে ধর্মান্ধ জনতা।
বাংলাদেশের শিল্পী মহল ভেবেছিল, বিএনপির জামানায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে। সরকার ধর্মান্ধদের দমন করবে। শিল্পীরা নির্ভয়ে গান-বাজনার চর্চা করতে পারবেন। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনে বাধা না এলেও ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি ইউনূসের আমলের থেকেও খারাপ হয়েছে বলে মনে করছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেই মৌলবাদী সংগঠনগুলির ভয়ে গান-বাজনার আসর বসাতে ভয় পান উদ্যোক্তারা। জেলা শহর বা উপজেলার পরিস্থিতি অনুমান করতে কষ্ট হয় না। গ্রামেগঞ্জে বাউল গানের আসর পন্ড করা শুরু হয়েছিল ইউনূসের আমলে। মঞ্চে উঠে বাউল শিল্পীদের মারধরের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ নিরীহ বাউলদের রক্ষা না করে উল্টে বাউলদের উপরেই চোটপাট করেছে। বিএনপির আমলেও বাউলদের উপর অত্যাচারের ধারা অব্যাহত আছে।
বিএনপি সরকারের বয়স ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন ইসলামের নামে যারা গান-বাজনা জোর করে বন্ধ করতে চায়, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ। আসিফ আকবর বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী। তিনি রাজনৈতিকভাবে বিএনপি মনোভাবাপন্ন। কিন্তু বিএনপি সরকার তৌহিদি জনতার নামে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের উপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন আসিফ।

স্থানীয় আলেম-উলেমাদের হুমকিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে পরপর কনসার্ট বন্ধ হওয়ার পর গায়ক আসিফ আকবর বাংলাদেশে গান-বাজনা হবে কি হবে না, তা সরকারকে স্পষ্ট করে জানাতে বলেছেন। আসিফ আকবর সরকারের উপর ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেন, “সরকারকে ইমিডিয়েট বলতে হবে বাংলাদেশে গানবাজনা হবে কি হবে না। বাংলাদেশের সংবিধান কী বলে? যদি সংবিধানে নিষেধ থাকে, বলে দেন শিল্পীরা সবাই বিদেশে চলে যাই।”
শুধু আসিফ আকবর নয়। সাবিনা ইয়াসমিন, হামিম আহমেদ, শেখ সাদী খান, বেবী নাজনিন ও নাজমুন মুনিরা ন্যান্সির মতো সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকারেরাও শিল্পীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
AI generated feature image is representational.