অরুণ কুমার: নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর উদ্ধার ও ত্রাণকাজ জোরদার করা হয়েছে। ২৬ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে ভোটেকোশি ও ত্রিশূলী নদীতে আকস্মিক বন্যার জেরে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোরখা জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের ২৭ আগস্টের Situation Update–5 অনুযায়ী, বন্যার পর বহু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের প্রকাশিত সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, মোট ৬৬৭ জন এখনও নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২৭ জন নেপালি নাগরিক। একই তালিকায় ভারত, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিন, মালয়েশিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বহু দেশের নাগরিকের নাম রয়েছে। ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা তালিকায় ১৭৮ জন, যা বিদেশি নিখোঁজদের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ অংশ।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের পর্যটক, ট্রেকার, গাইড ও যাত্রীরা দুর্গত এলাকায় আটকে থাকতে পারেন। তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, ট্রাভেল এজেন্সি, ট্রেকিং সংস্থা ও গাইডদের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্য নিয়মিতভাবে ক্রস-চেক করে তালিকা সংশোধন করা হচ্ছে।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA)-র তথ্য উদ্ধৃত করে ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, রাসুয়ার তিমুরে ও ভোটেকোশি এলাকা থেকে ২৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। প্রকাশিত তালিকায় ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। অন্য একটি পরিস্থিতি আপডেটে মোট ৩১ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতির সঙ্গে সংখ্যাও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে সরকারি তালিকার সর্বশেষ সংস্করণকেই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
বন্যার জলোচ্ছ্বাস ও ধসের কারণে দুর্গত অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। নেপাল সেনা, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী দল দুর্গত এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজও চলছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিপর্যয়ের ব্যাপকতা এবং বহু মানুষের নিখোঁজ থাকার কথা উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড পর্যটক ও তাঁদের পরিবারের উদ্দেশে শান্ত থাকার, সরকারি নির্দেশ মেনে চলার এবং স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন, ট্রাভেল এজেন্সি বা ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার আবেদন জানিয়েছে। জরুরি সহায়তার জন্য নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে টোল-ফ্রি ১২৩৪, হটলাইন ১১৪৪ এবং Tourist Police নম্বর ৯৮৫১২৮৯৪৪৫ দেওয়া হয়েছে।
নেপালের এই সংকটে ভারত দ্রুত সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২৬ আগস্ট নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথা বলে প্রাণহানির ঘটনায় সমবেদনা জানান এবং জানান যে ভারত সম্ভাব্য সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। ভারতীয় দলগুলি নেপালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে বলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এদিকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ভারতীয় নাগরিকদের অবস্থান শনাক্তকরণ ও সহায়তার জন্য ২৪ ঘণ্টার বিশেষ কন্ট্রোল রুম সক্রিয় করেছে। উদ্ধার ও ত্রাণ সমন্বয়ের পাশাপাশি নেপালে আটকে পড়া ভারতীয়দের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজও চলছে। ত্রাণের ক্ষেত্রেও ভারত জরুরি সামগ্রী পাঠিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত নেপালের জন্য প্রায় ৫০ মেট্রিক টন ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নেপাল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভারতীয় নাগরিকদের উদ্ধার ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কাজ করছে।
নেপালের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে পর্যটন গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে রাসুয়া, তিমুরে, লাংটাং ও তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলি ট্রেকিং ও তীর্থপর্যটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই বিপর্যয়ে মানুষের প্রাণহানি ও নিখোঁজের পাশাপাশি পর্যটন অবকাঠামো এবং স্থানীয় অর্থনীতির উপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি কাজ হল—নিখোঁজদের দ্রুত শনাক্ত করা, জীবিতদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা, দুর্গত এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার। একই সঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেপাল ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলির কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
নেপালের এই বিপর্যয় শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি সীমান্ত পেরিয়ে মানবিক সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংহতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলির দ্রুত সহায়তা এবং নেপালের উদ্ধারকারী সংস্থাগুলির সমন্বিত প্রচেষ্টাই এখন শত শত নিখোঁজ মানুষের সন্ধান ও দুর্গত মানুষের পুনর্বাসনের প্রধান ভরসা।
সূত্র: নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি।