স্পোর্টস ডেস্ক: ব্রাজিলের সমর্থকেরা সোমবার বার সকালে সমাজে মুখ দেখাবেন কোন লজ্জায়! পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা মুখে চুনকালি মেখে মাঠ ছাড়লে বরং ব্যাপারটা তাদের জন্য মানানসই হত। রবিবার রাতে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে ম্যাচ হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল সেলেসাওরা। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে নতুন ইতিহাস গড়ল নরওয়ে। ইতিহাস গড়ার নায়ক একজনই- এরলিং হালান্ড! ম্যাচের শেষদিকে জোড়া গোল করে ব্রাজিলের স্বপ্নে জল ঢেলে দিয়ে নিজের দেশের নাম ইতিহাসের পাতায় তুলে দিলেন হালান্ড। এবারের বিশ্বকাপে সাত গোল করে যিনি লিয়োনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপের ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস ফেলছেন।
সুযোগ নষ্টের খেসারত দিল ব্রাজিল
ম্যাচের শুরু থেকেই দিশাহীন ছন্নছাড়া ব্রাজিল দল। জেতার জন্য যে মনোসংযোগ ও দৃঢ়তা দরকার, তা কি ছিল সেলেসাওরাদের? প্রথমার্ধে ব্রাজিল যে আক্রমণাত্মক ছিল না, এমন নয়। বলের দখলে তারাই ছিল এগিয়ে। কিন্তু বিপক্ষের জালে বল ঢোকানোর সুযোগ যখন এসেছে, তখন ব্যর্থ হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এমন মরণ-বাঁচন ম্যাচে পেনাল্টি কেউ মিস করে! ব্রুনো গিমারায়েসের শট কী দুরন্ত মুনশিয়ানায় সেভ করে দিয়ে ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিলেন নরওয়ের গোলরক্ষক ওরিয়ান নাগাল্যান্ড।
শেষ ১১ মিনিট ব্রাজিলের রক্ষণে ঝড় তুলে দেন হালান্ড
খেলার বেলা যত গড়িয়েছে, ততই আক্রমণ থেকে গুটিয়ে নিয়ে রক্ষণে জোর দিয়েছে আত্মবিশ্বাসহীন ব্রাজিল। অথচ শেষ ১১ মিনিট ম্যাচ বের করে নেওয়ার জন্য মরীয়া হয়ে ওঠে নরওয়ে। ব্রাজিলের রক্ষণে মুহুর্মুহু হামলা চালায় নরওয়ে। ঠিক ৭৯ মিনিটে দুরন্ত হেডে দলকে এগিয়ে দেন হালান্ড। এরপর অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন হালান্ড। ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা খেই হারিয়ে ফেলেন।

খেলা যখন ৯০ মিনিট, অতিরিক্ত সময় শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে দ্রুত গতিতে আক্রমণে যায় নরওয়ে। বল পায়ে পড়তেই সামনে দৌঁড় লাগান হালান্ড। তিনজন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার দাঁড়িয়ে। তাঁদের প্রতিরোধ গড়ার সুযোগ না দিয়ে বাম পায়ে মাটি ঘেঁষে জোরালো এবং কৌশলী শট হালান্ডের। নিখুঁত ফিনিশিং যাকে বলে। বল ধরার সুযোগই পেলেন না ব্রাজিলের গোলরক্ষক। বল জালে জড়াতেই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।
যে গোল ব্রাজিলের কোনও কাজেই আসল না
খেলার ৬৭ মিনিটে মাঠে নেমেছিলেন নেইমার। বাকি ২৩ মিনিট নেইমার যে ঠিক কী করলেন, বোঝা গেল না। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করা ছাড়া নেইমারের আর কোনও ভূমিকা দর্শকদের চোখে ধরা পড়ে নি। এই গোলকে বলে নিষ্ফলা গোল। নেইমারের গোল কেবল হারের ব্যবধান কমিয়েছে ব্রাজিলের। এক মিনিট পরেই শেষ বাঁশি বাজান রেফারি। মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন নেইমার। মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকেন। রাফিনহো এগিয়ে এসে শান্ত করে সাজঘরে পাঠান নেইমারকে। বিরাট ফুটবলার! কিন্তু বিশ্বকাপে ব্যর্থ। চারটি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু দেশকে ট্রফি দেওয়ার ধারেকাছেও নিয়ে যেতে পারেন নি ট্র্যাজিক নায়ক।
আনচেলত্তির কৌশল প্রশ্নের মুখে
ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির আর মুখ দেখানোর জো রইল না। তিনি দলকে কী দিলেন, এটাই সবার প্রশ্ন! আক্রমণ তৈরি করে আসল সময়ে সুযোগ হাতছাড়া- গোটা বিশ্বকাপে এই ছিল ব্রাজিলের ফুটবলারদের পারফরম্যান্স। নকআউটেও তাই। পেলের দেশ কি গোল করতে ভুলে গেল! ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি স্বীকার করলন, সুযোগ তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তে তা কাজে লাগাতে না পারার মূল্য দিতে হয়েছে ব্রাজিলকে।
নরওয়ে প্রমাণ করল, চেষ্টা থাকলে ইতিহাস গড়া যায়
এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে পৌছাল নরওয়ে। দীর্ঘদিন ইউরোপের মাঝারি সারির দল হিসেবে পরিচিত ছিল নরওয়ে। কেউ সমীহ করত না। এবার দেখিয়ে দিল, তারা আর শুধুই ‘ডার্ক হর্স’-ই নয়- শিরোপার দৌড়েও অন্যতম দাবিদার। হালান্ডের দুর্ধর্ষ ফর্ম গোটা দলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ম্যাচের শেষে বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, বলের ৬৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ ছিল নরওয়ের ফুটবলারদের পায়ে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে যারা পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন, তাদের এমন দুর্দশা কেন? ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ পেলের দেশ! বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলের সমর্থকদের জন্য রবিবারটা হয়ে উঠল শোকদিবস।
Feature image credit: Sky Sports