স্পোর্টস ডেস্ক: নেইমার নয়, রোনাল্ডো নয় এমনকি প্রয়াত পেলে-মারাদোনাও নয়, ফুটবলের ঈশ্বর মেসি। মৃত্যুর মুখ থেকেও যিনি নিজের টিমকে ফিরিয়ে আনতে পারেন, তিনি ঈশ্বর নয় তো, ঈশ্বর কে! ৭৯ মিনিট পর্যন্ত মিশরের কাছে দুই গোলে পিছিয়ে থাকার পরেও আর্জেন্টিনা আজ জিতে মাঠ ছাড়বে, আর্জেন্টিনার অতি বড় সমর্থকও তা ভাবতে পারেন নি। গ্যালারির নীল-সাদা শিবিরে শোকসভা বসে গিয়েছিল। চোখের জল ফেলতে ফেলতে স্টেডিয়াম ছাড়ার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দিয়েছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু মেসি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। ৩৯ বছর বয়সেও শেষ মুহূর্তে হারা ম্যাচ জিতে বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়তে পারেন একমাত্র লিওনেল মেসিই।
নরওয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে নেইমারের ব্রাজিল। স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে রোনাল্ডোর পর্তুগাল। নক-আউটে বুধবার মেসির আর্জেন্টিনার হাতেও বুয়েনস এইরেসের ফ্লাইটের টিকিট প্রায় ধরিয়ে দিয়েছিল মিশর। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০-তে এগিয়ে থাকা ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে তিনটি গোল হজম করে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল মোহাম্মদ সালাহদের দল।
প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস মেসির
খেলা শুরুর আগেই মিশরের ডিরেক্টর অফ ফুটবল হাসান বলেছিলেন, “মেসিকে ভয় পাই না। আমাদের দলে ২৬ জন মেসি আছেন।” সত্যিই এদিন মাঠে অনবদ্য টিম গেমের স্বাক্ষর রাখল মিশর। প্রথমার্ধে সালাহ্ পেরে উঠছিলেন না। কিন্তু ইব্রাহিম, হাসান, জিকোরা বলের উপর যথেষ্ট দখল রেখে বারে বারে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিলেন। খেলার ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় ডান প্রান্ত থেকে আসা হাসানের ক্রসে অনবদ্য একটি হেড মেরে আর্জেন্টিনার জালে গোল ঢুকিয়ে দেন মিশরের ইয়াসের ইব্রাহিম।

কয়েক মিনিট পরেই পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু মিস করেন মেসি। মিশরের গোলরক্ষক মুস্তাফা শোবেইরের বাঁ দিক দিয়ে শট মারেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত দুর্বল সেই শট অনায়াসে রুখে দেন মুস্তাফা। প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ নষ্ট করে আর্জেন্টিনা। মেসির পেছনে দু’জন মার্কার লাগিয়ে দেন মিশরের কোচ। বারে বারে খেই হারান মেসি।
দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে দ্বিতীয় গোল মিশরের
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই তেড়েফুঁড়ে নামে মিশর। প্রতি আক্রমণে গিয়েও সুবিধা করতে পারছিলেন না মেসি, ম্যাকঅ্যালিস্টার ও আলভারেজরা। উল্টো দিকে একটি প্রতি আক্রমণ থেকে তিন পাসে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে জালে বল জড়িয়ে দেন মিশরের মুস্তাফা জিকো। কিন্তু গোল করার প্রাক মুহূর্তে লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে জিকো ফাউল করায় গোল বাতিল করে দেন রেফারি। খেলার ৬৭ মিনিটের মাথায় ফের আরও একটি প্রতি আক্রমণ থেকে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে পর্যুদস্ত করে দ্বিতীয় গোলটি করেন জিকোই।
শেষ ১৫ মিনিটে খেলা ঘোরালেন মেসি
মেসির টিম দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর হাল ছেড়ে দেন স্টেডিয়ামে থাকা আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। শেষ ১৫ মিনিটে রক্ষণে ভিড় বাড়ায় মিশর। উদ্দেশ্য একটাই- গোল আটকানো। মার্কার মুক্ত হতেই গা ঝাড়া দিয়ে ওঠেন লিওনেল মেসি। খেলার বয়স যখন ৭৯ মিনিট, তখন মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে পাওয়া বলে হেডে গোল করে ব্যবধান কমান ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর।

চার মিনিট পর মিশরের বক্সে দুর্দান্ত একটি ব্যাক ভলি মারেন লউতারো মার্তিনেজ। সেই ব্যাকভলি ঘুরে মেসির পায়ে পড়তেই বিদ্যুতের চমকের থেকেও দ্রুত এক জোরালো শটে মিশরের গোলরক্ষককে শোবেইরকে পরাস্ত করেন ফুটবলের ঈশ্বর। খেলায় সমতা ফিরে আসে। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে
ডান প্রান্ত থেকে লাউতারোর পায়ে বল আসতেই ক্রসে বল ঢোকালেন মিশরের বক্সে। সেই বলে হেড মেরে জয়সূচক গোলটি দিলেন এনজো ফার্নান্দেজ। শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে মিশরকে হারিয়ে ছাব্বিশের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে গেল গতবারের বিশ্বকাপজয়ীরা।
দুর্দান্ত খেলেও স্বপ্নভঙ্গ মিশরের
নিঃসন্দেহে দুর্দান্ত খেলেছে মিশর। দীর্ঘ সময় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখলেও শেষ মুহূর্তের চাপ সামলাতে পারে নি মোহাম্মদ সালাহদের মিশর। গোলরক্ষক শোবেইরের একাধিকবার দুর্দান্ত সেভ করে সবার নজর কেড়েছেন। জান দিয়ে লড়েও আর্জেন্টিনার আক্রমণের সামনে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় মিশরকে। নকআউটের খেলায় ৭৯ মিনিট পর্যন্ত বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে মিশর। শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হল সালাহদের।
জিতেও কেঁদে ভাসালেন মেসি
এটাই শেষ বিশ্বকাপ লিওনেল মেসির। আজকেই বিশ্বকাপে মেসির শেষ দিন হতে পারতো। কমেন্ট্রি বক্সে ধারাভাষ্যকারেরা বলতে শুরু করেছিলেন, আর মাত্র ১৫ মিনিট মেসিকে বিশ্বকাপে দেখা যাবে। শেষ ১৫ মিনিটেই মেসির কাছ থেকে ম্যাজিক দেখল ফুটবল বিশ্ব। যথারীতি তিনি গোল করলেন, তিনি গোল করালেন। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপছর কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেল আর্জেন্টিনা।

রবিবার হেরে মাঠে অশ্রু ঝরিয়েছেন ব্রাজিলের নেইমার। মঙ্গলবার জিতেও হাউ হাউ করে কাঁদলেন মেসি ও তাঁর সতীর্থরা। শুধু পরাজয় নয় কষ্টার্জিত জয়েও যে চোখে আনন্দাশ্রু জমে। মিশরের বিরুদ্ধে যে’ভাবে দেশকে জেতালেন বলা ভাল টেনে তুললেন লিওনেল মেসি, তারপরেও মেসির দু চোখ কীভাবে শুষ্ক থাকে!
Feature image credit: NPR.