বিশেষ প্রতিবেদন: সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে কেরলে বিজেপি যে ফল করেছে, তাকে ইএমএস নাম্বুদিরিপাদের রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের সূচনা হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল। বহুদিন থেকেই কেরলে পায়ের নিচের মাটি শক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে আরএসএস। রাজ্যটিতে সিপিএম ও আরএসএস-এর রক্তাক্ত সংঘর্ষের ইতিহাসের শুরু ৭২ বছর আগে স্বাধীনতার পরপরই। দুই পক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় সমান-সমান। পরিহাসের বিষয় হল, কেরলে যে হিন্দুত্ববাদীদের ঠেকাতে কমিউনিস্টরা হাতে অস্ত্র ধরেছে ১৯৫২ সাল থেকেই, সেই হিন্দুত্ববাদীদের জমি শক্ত হচ্ছে বামেদের ভোটব্যাঙ্ক ধসিয়েই। একদম বাংলার চিত্র। বাংলায় বামেদের পুরো ভোটটাই কার্যত বিজেপির ঘরে স্থানান্তর হয়ে গেছে। কেরলের পরিস্থিতিও যে উপেক্ষা করার জায়গায় নেই, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে তা স্বীকার করে নিয়েছেন সীতারাম ইয়েচুরি।
কেরল ভারতের এমন একটি রাজ্য, যেখানে ১৯৫৭-র নির্বাচন থেকেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ার সূচনা। এই সেই রাজ্য যেখানে পৃথিবীর প্রথম নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার গঠিত হয়েছিল ৬৭ বছর আগে। কেরলের মানুষ সাধারণত পাঁচ বছর পর পর সরকার পাল্টান। সেই পাল্টাপাল্টি সীমাবদ্ধ থাকে সিপিএম নেতৃত্বাধীন এলডিএফ ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ-এর মধ্যে। মালায়ালাম রাজনীতি এখনও পর্যন্ত দ্বিমুখী, কিন্তু কতদিন এই ধারা বজায় থাকবে, সেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনের ফল। ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়নের এলডিএফ সরকারের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরাটা সবাইকে চমকে দিয়েছিল। অথচ মাত্র তিন বছরের মাথায় লোকসভা নির্বাচনের ফল কেরলের সিপিএম নেতৃত্বের মনে অস্তিত্ব সঙ্কটের আতঙ্ক ধরিয়ে দিয়েছে।
গোপালন-নাম্বুদিরিপাদের রাজ্যে খাতা খুলল বিজেপি
লোকসভা নির্বাচনে ২০-টিতে মাত্র একটি আসন জিতেছে এলডিএফ। ১৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সিপিএমের প্রাপ্তি মোটে একটি। ইউডিএফ জিতেছে ১৮টি আসন। ১৬টি আসনে লড়ে কংগ্রেস জয়ী হয়েছে ১৪টিতে। প্রথমবারের মতো লোকসভায় জিতে কেরলের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস রচনা করেছে বিজেপি। বিজেপি নেতৃত্ব মনে করেন, তামিলনাড়ু ও কেরলে নির্ণায়ক শক্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের দাক্ষিণাত্য অভিযান অসম্পূর্ণ থাকবে। দ্রাবিড় অস্মিতার ভূমি তামিলনাড়ু শূন্য হাতে ফিরিয়েছে কিন্তু কমিউনিস্ট শাসিত কেরলে খাতা খুলেছে বিজেপি। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ একে গোপালনকে দলের প্রাণপুরুষ বলে কার্যত স্বীকার করে সিপিএম। গোপালন-নাম্বুদিরিপাদের রাজ্য কেরল শুধু ভারতবর্ষের মধ্যেই নয় আন্তর্জাতিক মহলেও কমিউনিস্টদের মুলুক হিসেবে পরিচিত। সেই কেরলে বিজেপির উত্থানে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন কারাত-ইয়েচুরিরা।
বিজয়নের বুথে পদ্মের ১০০ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি!
চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে দলগতভাবে সিপিএমের ভোট না কমলেও একুশের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এলডিএফ-এর ভোট কমেছে ১২ শতাংশের বেশি। কেরলে বিজেপি একটি আসন পেলেও একুশের বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় এনডিএ-র ভোট বেড়েছে ৬.৮৩ শতাংশ। এনডিএ-র প্রাপ্ত ভোট ১৯.২৪ শতাংশ। বিজেপি একাই পেয়েছে ৩২ লক্ষ ৯৬ হাজার ৩৫৪টি ভোট, যা মোট প্রদত্ত ভোটের ১৬.৬৮ শতাংশ। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন কান্নুরের যে বুথের ভোটার, সেই বুথে বিজেপির ভোট ৫৩ থেকে বেড়ে ১১৫ হয়েছে। একে গোপালনের জন্মভূমি কান্নুরকে কেরলের বাম দুর্গ বলা হয়। কেরলে সিপিএম-আরএসএস সংঘর্ষের ঘটনার প্রায় ৭০ শতাংশই কান্নুর জেলাকে ঘিরে। সেই কান্নুর লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির ভোট বেড়েছে ৪.৮ শতাংশ।
২০টি লোকসভার মধ্যে ১৭টিতেই ভোট বেড়েছে এনডিএ-র
ত্রিশূর লোকসভা কেন্দ্রে জিতে কেরলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পদ্ম ফুটিয়েছেন বিজেপির সুরেশ গোপী। ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৩৭.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে সুরেশ হারিয়েছেন সিপিএমের ভিএস সুনীল কুমারকে ৭৪,৬৮৬ ভোটের ব্যবধানে। সুনীল পেয়েছেন ৩০.৯৫ শতাংশ ভোট। ৩০.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় কংগ্রেসের কে মুরলীধরন। ত্রিশূরে প্রায় দশ শতাংশ ভোট বাড়িয়েছে বিজেপি। তিরুবনন্তপুরমে রীতিমতো কষ্টসাধ্য জয় পেয়েছেন ক্যারিশম্যাটিক শশী থারুর। শক্ত লড়াই দিয়ে থারুরের কাছে মাত্র ১৬,০৭৭ ভোটে হেরেছেন বিজেপির রাজীব চন্দ্রশেখর। থারুর পেয়েছেন ৩৭.১৯ শতাংশ ভোট। চন্দ্রশেখরের প্রাপ্ত ভোট ৩৫.৫২ শতাংশ। ২৫.৭২ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় সিপিএমের পান্নিয়ান রবীন্দ্রন। গত দশ বছর ধরেই তিরুবনন্তপুরম বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। তিরুবনন্তপুরম লোকসভা কেন্দ্রে ৪.৩৯ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি করেছে বিজেপি।

২০টি লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ১৭টিতেই ভোট বাড়িয়েছে এনডিএ। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ১৩টিতেই জামানত খুইয়েছিলেন এনডিএ-র প্রার্থীরা। চব্বিশে ৮টি কেন্দ্রে এনডিএ-র ভোট ১৬.৬ (জামানত বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয়) শতাংশের নিচে। মাত্র একটি কেন্দ্রে ( মালাপপুরম) এনডিএ-র প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ এক অঙ্কের। ত্রিশূর ও তিরুবনন্তপুরম ছাড়াও বিজেপি ৩০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে আট্টিঙ্গাল (৩১.৬ শতাংশ) আসনে। ২৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে আলাপ্পুঝা (২৮.৩ শতাংশ) ও পাঠানমথিত্তা (২৫.৫ শতাংশ) কেন্দ্রে।
৩০টি বিধানসভা আসনকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে বিজেপি
২০২৪-এর লোকসভা ভোটের ফলাফল অনুযায়ী কেরলের ১৪০টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১১টিতে বিজেপি এগিয়ে। ৫টি জেলার ৯টি বিধানসভায় দ্বিতীয় স্থানে। ৯টি জেলার ১০টি বিধানসভা আসনে বিজেপি তৃতীয়। তার মধ্যে আলাপ্পুঝা লোকসভার আমবালাপ্পুঝা বিধানসভা আসনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা এলডিএফ প্রার্থীর সঙ্গে বিজেপি প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান মাত্র ১১০। একই লোকসভার করুনাগাপ্পাল্লি বিধানসভায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা এলডিএফ প্রার্থীর থেকে বিজেপি প্রার্থী পিছিয়ে মাত্র ১৯১ ভোটে। আট্টিঙ্গাল লোকসভা কেন্দ্রের বামনাপুরমে দ্বিতীয় স্থানে থাকা এলডিএফ প্রার্থীর থেকে মাত্র ৪৩৭টি ভোট কম পেয়েছেন বিজেপির প্রার্থী। তিরুবনন্তপুরম লোকসভা কেন্দ্রের পারাস্সালা আসনে এলডিএফ প্রার্থীর থেকে মাত্র ৬৯৭ ভোটে পিছিয়ে বিজেপির প্রার্থী। তিন বছর পরে বাংলার সাথেই কেরলেও বিধানসভা নির্বাচন। ২০২৬-এ এই ৩০টি আসনকে পাখির চোখ করে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দিয়েছে গেরুয়া শিবির।
হিন্দু ও খ্রিস্টান ভোট বিজেপিমুখী
কেরলের রাজনীতিতে দুটো বড় পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়, যা অবশ্যই উপকূলীয় রাজ্যে বিজেপির পালে হাওয়া যোগাচ্ছে। এক, যে হিন্দুরা এতদিন বামেদের ভোট দিয়ে এসেছেন, তাদের একটি অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছেন। দুই, মালওয়ালি খ্রিস্টানদের একটি অংশের আস্থা অর্জন সফল হয়েছে বিজেপি। জর্জ কুরিয়ান কেরল বিজেপির বড় মুখ। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী জর্জ বিজেপির জন্মলগ্ন থেকেই যুক্ত। তৃতীয় মোদী মন্ত্রিসভায় মৎস্য, পশুপালন ও ডেয়ারি দফতরের প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন জর্জ কুরিয়ান। কেরলের জনসংখ্যার ১৮.৪ শতাংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। হিন্দু ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে ৫৪.৭ শতাংশে। এই দুই জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিজেদের অনুকূলে এনে আদি শঙ্কররাচার্যের জন্মভূমিতে বড় শক্তিতে পরিণত হওয়ার সঙ্কল্প নিয়েছে বিজেপি।
Feature Graphic is representational and designed by NNDC.