দিল্লি দর্শন: সব থেকে কম সময়ে এবং কম খরচে ঘুরে ফেলুন ভারতবর্ষের রাজধানী - nagariknewz.com

দিল্লি দর্শন: সব থেকে কম সময়ে এবং কম খরচে ঘুরে ফেলুন ভারতবর্ষের রাজধানী


সহজে, সুলভে এবং স্বল্প সময়ে কীভাবে দিল্লি দর্শন করবেন, আপনাকে জানাচ্ছেন ভ্লগার ঋতুপর্ণা-

দিল্লি ভারতের রাজধানী। সারা বছরই দিল্লিতে দেশ-বিদেশের মানুষ থিক থিক করে। কিন্তু তারপরেও সাধারণত শুধু দিল্লি ভ্রমণের উদ্দেশ্য নিয়েই কেউ দিল্লিতে পা রাখেন না। সরকারি কাজ, ব্যবসা পড়াশোনা ও চিকিৎসার কারণে তো দিল্লিতে আসতেই হয়। দেশি-বিদেশি বহু পর্যটক‌ও দিল্লিতে আসেন। কিন্তু তাদের বড় অংশই দিল্লিকে মূলতঃ এক-দু’দিনের ‘বেস ক্যাম্প’ হিসেবেই বেছে নেন। অর্থাৎ হরিদ্বার-হৃষিকেশ, কেদারনাথ সহ চারধাম, আগ্রা, হিমাচল, পাঞ্জাব, কাশ্মীর ও রাজস্থান সহ উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের আরও বহু পর্যটনস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দিল্লি আসেন। তাই এক বা দুদিনের বেশি দিল্লিকে সময় দেওয়া সম্ভব হয় না কার‌ও পক্ষে‌ই। এত কম সময়ে গোটা দিল্লি দেখা সম্ভব নয়। তবে ঠিকভাবে ট্যুর প্ল্যানিং করলে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলি দু’দিনের মধ্যেই কভার করা যায়। এই প্ল্যানিংটা করতে আমি আপনাদের সাহায্য করতে পারি। আশা করি প্রতিবেদনটি পড়ে শেষ করার পর আপনি দিল্লি কীভাবে ঘুরবেন, কোথায় কোথায় ঘুরবেন এবং কোথায় থাকবেন তদুপরি কতটা সাশ্রয়ে ঘোরাঘুরি সারতে পারবেন- সব বিষয়েই একটা স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যাবেন।

কোথায় থাকবেন

সবার প্রথম যে প্রশ্নটা মাথায় আসে সেটা হলো দিল্লিতে এসে থাকবেন কোথায়। বেশিরভাগ দিল্লিতে আগত মানুষজন পাহাড়গঞ্জের হোটেল পছন্দ করেন। যেহেতু এটা নিউদিল্লি স্টেশনের কাছে। দিল্লিতে থাকার ব্যাপারে পাহাড়গঞ্জের চিন্তা বাতিল করে থাকতে পারেন নিউ দিল্লি কালীবাড়ির গেস্টহাউসে। এটিও নিউ দিল্লি স্টেশনের কাছে। এছাড়াও ভারত সেবাশ্রম, সফদরজং মাতৃমন্দির-ও থাকার জন্য আদর্শ। পাহাড়গঞ্জ এলাকা বর্তমানে ঠগ-জোচ্চোরদের আড্ডাখানা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যা যা না দেখলেই নয়

এবার চলে আসি ঘোরার প্ল্যানিং-এর ব্যাপারে। কেবল দিল্লি বলে নয়, যেখানেই ঘুরতে যান না কেনো সেখানকার ম্যাপটা ভালো করে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাহলে ভ্রমণ অনেক কম সময় ও কম অর্থ খরচেই সেরে নিতে পারবেন। দিল্লিতে একটা ‘হো হো’ (Hop on Hop off) বাস সার্ভিস’ হয়। ‘দিল্লি দর্শন’ নাম দিয়ে একদিনে দিল্লির বেশ কিছু জায়গা ঘোরায় সেই বাস সার্ভিস। আপনি চাইলে এই বাস সার্ভিসের সাহায্য নিতে পারেন। তবে তারা যে যে জায়গায় নিয়ে যায়, তাতে প্রকৃত দিল্লিকে চেনা একেবারেই সম্ভব নয়। দিল্লিকে চিনতে, দিল্লিকে জানতে এর রাজনীতির ওঠা পড়াকেও বুঝতে হবে। তোমার, চৌহানদের হাত থেকে দিল্লির ক্ষমতা যায় মামলুকদের হাতে। এই মামলুকরাই নির্মাণ করলেন ‘কুতুবমিনার’।

কুতুব মিনার

কুতুবমিনারে প্রবেশের কিছু পূর্বেই রাস্তার ধারেই দেখা যাবে একটা বিশাল মোটা ভাঙা দেওয়াল। ওটাই কিলা রাই পিথোরার দেওয়াল বা লালকোটের দেওয়াল অর্থাৎ যে প্রাসাদে পৃথ্বীরাজ থাকতেন তার দেওয়াল। মামলুকদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় খিলজিদের হাতে। কুতুব মিনারে প্রবেশ করলে সেখানেই দেখতে পাবেন অর্ধ নির্মিত, অসম্পূর্ণ আলাই মিনার। খিলজিদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় তুঘলকদের হাতে। দিল্লি জুড়ে তুঘলকদের নানা স্থাপত্য থাকলেও তুঘলকদের রাজধানী তুঘলকাবাদ দেখা দিল্লি ঘোরার প্রেক্ষিতে আবশ্যিক বলা যেতে পারে। তুঘলকদের পর মুঘলরা আসার আগে দুটি রাজবংশ পর্যায়ক্রমে দিল্লির মসনদে বসেন সৈয়দ বংশ এবং লোদি বা লোধি বংশ। এই দুই বংশের স্থাপত্য পেয়ে যাবেন লোধি গার্ডেনে। এরপর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লির ক্ষমতা দখল করেন বাবর। শুরু হয় মুঘল যুগ। হুমায়ুন টুম্ব, জামা মসজিদ এবং লালকেল্লা এসবই মুঘলদের বানানো।

ইন্ডিয়া গেট

আবার ক্ষমতার হস্তান্তর। ইংরেজ সরকারের রাজধানী দিল্লি। তাদের হাতে গড়া পার্লামেন্ট হাউস, রাষ্ট্রপতি ভবন, ইন্ডিয়া গেট এগুলো না দেখলে দিল্লি আসাই বৃথা। আজ দিল্লিকে যে দেশের রাজধানী বলে জানি তা তো এগুলোর জন্যই। এখন এগুলোর পাশাপাশি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সেন্ট্রাল ভিস্তা। রাজনীতির উত্থান পতন যেমন ঘটেছে তেমনি দিল্লিতে এসে আশ্রয় নিয়েছে নানা ভাষার, নানা ধর্মের মানুষ। রাজধানীর বুকে নিজস্ব সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। দিল্লি এলে অবশ্যই দেখা উচিত বাঙালির সি আর পার্ক কালীবাড়ি, পাঞ্জাবির বাংলা সাহিব গুরুদোয়ারা এবং বাহাই সম্প্রদায়ের লোটাস টেম্পল। হাতে সময় থাকলে দক্ষিণ ভারতীয়দের মালাই মন্দির এবং গুজরাটিদের অক্ষয়ধাম দেখতেই পারেন।

ঘুরতে এলে কেনাকাটা করবেন না এটা তো হতে পারে না। অল্পবয়সী মেয়েদের কাছে দিল্লিরসরোজিনী নগর হলো স্বর্গরাজ্য। দাম দর ঠিকঠাক করতে পারলে এখানে এমনসব জিনিস এতটাই সস্তাতে পাবেন যা সারা ভারতের কোথাও পাবেন না।

কোথা থেকে শুরু করবেন কোথায় শেষ করবেন

এবার আসা যাক ট্যুর প্ল্যানের দিকে। গোটা দিল্লি ঘোরানোর জন্য চার সিটের গাড়ি সারাদিনের জন্য (আট ঘন্টা) দু’হাজার টাকায় পাওয়া যায়৷ ঘুরতে যাওয়ার আগের দিন দাম দর করে ঠিক করে রাখতে হবে। বেশিরভাগ দিল্লির অতিথিরা নিউদিল্লি স্টেশনের কাছাকাছি থাকা পছন্দ করেন। চেষ্টা করবেন ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে যাত্রা শুরু করার। প্রথমেই জনপথ দিয়ে গিয়ে বিজয়চকে পৌঁছে দেখে নিন ইন্ডিয়াগেট, পার্লামেন্ট হাউস, সেন্ট্রাল ভিস্তা ইত্যাদি। কোনোটাই ভেতরে ঢোকা যাবে না ফলে এখানে সময় বেশি লাগবে না। এখান থেকে লোধি গার্ডেন। এরপর সোজা চলে যান কুতুবমিনার। সকালে ফাঁকায় ফাঁকায় দেখে সি আর পার্ক কালীবাড়ি। এখানে এসেও বাঙালি ব্রেকফাস্ট করতে পারেন। কালীবাড়ির কাছেই ১ ও ২ নং মার্কেট। সেখানের মিষ্টির দোকানে কচুরি, সিঙারা এবং খুব ভালো কোয়ালিটির মিষ্টি পেয়ে যাবেন।

তুঘলকবাদ ‘ফোর্ট’

কালীবাড়ি ঘুরে চলে যান তুঘলকাবাদ ফোর্ট। ফোর্ট ও টুম্ব দুটোই দেখে নিন। ফোর্টের উপর থেকে দিল্লি শহরটাকে পাখির চোখে দেখার সোভাগ্য হয়ে যাবে। ফোর্ট ঘুরে আসুন লোটাস টেম্পলে। বাইরে থেকে দেখুন। এবার আসুন সোজা হুমায়ুন টুম্বে তারপর পুরানা কিলা। সময়ের দিকে খেয়াল রাখবেন। কোনো জায়গাতেই সময়ের অপচয় করবেন না। পুরানা কিলার বর্তমান কাঠামো শেরশাহের বানানো। হুমায়ুন এখানেই সিঁড়ি থেকে পড়ে মারা গেছিলেন। অনেকে বলে থাকেন আজ যেখানে পুরানা কিলা অবস্থিত, সেখানেই আগে ছিল পান্ডবদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থ। আশা করা যায় এর মধ্যে দুপুর হয়ে যাবে। সোজা চলে যান বাংলা সাহিব গুরুদোয়ারায়। লাঞ্চ করুন এখানের লঙ্গরে। একটা ভীষণ ভালো অভিজ্ঞতার সাক্ষী থেকে যাবেন। এখান থেকে বেরিয়ে সোজা রাজঘাট হয়ে লালকেল্লা (বাইপাস)। যদি লালকেল্লার ভেতরে ঘুরতে চান তাহলে গাড়িকে এখানেই ছেড়ে দিন। লালকেল্লা ঘুরে টোটো নিয়ে চলে যান জামা মসজিদ। তারপর একটা অটো রিজার্ভ করে ফিরে আসুন হটেলে বা গেস্ট হাউসে। এখান থেকে ১০০-১৫০ টাকায় অটো রিজার্ভ করতে পারবেন।

তবে লালকেল্লার ভেতরে মুঘল মিউজিয়াম বিকালের দিকে বন্ধ হয়ে যায়। যদি ভীষণরকম ইতিহাস প্রেমী হন তবে দ্বিতীয় দিনটা মিউজিয়ামকে উৎসর্গ করুন। এই দিনটার জন্য দিল্লি মেট্রো ও অটোর উপর ভরসা রাখুন। সকাল দশটায় লালকেল্লা খুলে যায়। নিউ দিল্লি মেট্রো স্টেশন থেকে ইয়োলো লাইনে চেপে কাশ্মীরি গেটে নামুন। সময়পুর বাদলির দিকের মেট্রোতে চাপবেন। এখান থেকে অটোতেও যেতে পারেন। নয়তো। মেট্রো লাইন বদলে মাজেন্টা লাইনের মেট্রোতে চাপুন পরের স্টেশন লালকেল্লায় নেমে চার নম্বর গেট দিয়ে বাইরে গিয়ে সোজা লালকেল্লায় ঢুকে যান।

লালকেল্লা

লালকেল্লা ভালো করে ঘুরে একই ভাবে কাশ্মীরী গেটে এসে ইয়োলো লাইনে হুডা সিটির দিকের মেট্রোতে চেপে উদ্যোগ ভবনে নামুন। সেখান থেকে মিনিট পাঁচেকের রাস্তা। অটো নিয়ে ন্যাশানাল মিউজিয়ামে চলে যান। হরপ্পা সভ্যতায় প্রাপ্ত জিনিসপত্র এখানে সংরক্ষিত আছে। চোখের সামনে অনুভব করবেন চার হাজার বছরের চলাচল। মিউজিয়াম ঘুরে ফিরে আসুন উদ্যোগ ভবনের মেট্রো স্টেশনে। হুডা সিটির দিকের মেট্রোতেই চাপুন। দিল্লি হাটে নামুন। দিল্লি হাটকে বলতে পারেন মিনি ভারত। সারা ভারতের প্রতিটি রাজ্যের হস্তশিল্প ও খাবারের স্টল পেয়ে যাবেন। জায়গাটা ঘুরতেও বেশ লাগবে। দিল্লি হাট ঘুরে পিঙ্ক লাইনের মেট্রোতে চেপে দিল্লিহাটের পরের স্টেশন সরোজিনী নগর চলে যান। সারাবছরই এখানে লেগে রয়েছে কুম্ভমেলা। সরোজিনী নগর ঘুরে ফিরে আসুন দিল্লিহাটে। এখান থেকে ইয়োলো লাইনের মেট্রোতে চাপুন যেটা সময়পুর বদলির দিকে যাচ্ছে। নিউদিল্লি স্টেশনে নেমে সন্ধ্যার মধ্যে পৌঁছে যান আপনার হোটেলে বা গেস্ট হাউসে।

আরও কিছু টু দ্য পয়েন্ট টিপস-

  • দিল্লির বেশিরভাগ জায়গা সোমবার বন্ধ থাকে। সোমবার দিল্লি ঘোরার প্ল্যান রাখবেন না।
  • লালকেল্লা, কুতুবমিনার এসব জায়গায় অনলাইনে টিকিট কাটার ব্যবস্থা থাকলেও না কাটাই ভালো। বেশিরভাগ সময় টাকা কেটে নেয় টিকিট আসে না, টাকা রিফান্ড-ও আসে না।
  • বাংলা সাহিবে গাড়ির ফ্রী পার্কিং এর ব্যবস্থা আছে।
  • মেট্রোতে ঘোরার প্ল্যান থাকলে মেট্রো লাইনের কালার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে নেবেন গুগল থেকে।
  • কেবল দিল্লি বলে নয় যেকোনো জায়গা ঘোরার ক্ষেত্রে ম্যাপটা হাতে রাখবেন। দিল্লি শহরে গুগল ম্যাপকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।

দিল্লি ডায়েরিসের ভিডিওতেও দেখে নিন-

Video Credit- Delhi Diaries YouTube channel.


Leave a Reply

Your email address will not be published.