সার্চ কমিটির 'প্যানেলে' আস্থা নেই, উপাচার্য নিয়োগের আগে 'ইন্টারভিউ' নিতে চান রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস - nagariknewz.com

সার্চ কমিটির ‘প্যানেলে’ আস্থা নেই, উপাচার্য নিয়োগের আগে ‘ইন্টারভিউ’ নিতে চান রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস


ডেস্ক রিপোর্ট: প্রাথমিক থেকে উচ্চতর- বাংলায় পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার‌ই নাজেহাল অবস্থা। সি ভি আনন্দ বোস সবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের দায়িত্ব নিয়েছেন। এই প্রাক্তন আমলা নিজে উচ্চ শিক্ষিত ও লেখক। পড়ালেখার জগতেই থাকেন। কাজেই চোখকান খোলা। সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে যে রাজ্যে এসেছেন, তার শিক্ষার হালহকিকত সম্পর্কে তিনি অন্ধকারে, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। সুবীরেশ ভট্টাচার্য নিয়োগ দুর্নীতিতে ফেঁসে জেলের ঢোকার পর থেকে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও স্থায়ী উপাচার্য নেই। অস্থায়ী উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ওমপ্রকাশ মিশ্র। সম্প্রতি তাঁর কাজের মেয়াদ রাজ্যপাল আর‌ও চার সপ্তাহ বৃদ্ধির নির্দেশ দিলেও নতুন উপাচার্য নিয়োগের কাজ শুরু করে দিয়েছে শিক্ষা দফতর। তবে এবার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়ায় একটু নজরদারি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস।

রাজ্যের সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উপাচার্য নিয়োগের কাজটি সারে মূলতঃ সরকার নিয়ন্ত্রিত সার্চ কমিটি। উপাচার্য পদে সার্চ কমিটি তিনটি নাম বেছে ‘আচার্য’ রাজ্যপালের কাছে পাঠায়। রাজ্যপাল একটি নাম বেছে নিয়ে তাঁকে উপচার্য হিসেবে নিয়োগপত্র দেন। আসলে প্যানেলে তিনজনের মধ্যে থেকে কাকে উপাচার্য পদে নিয়োগ করা হবে, তাও রাজ্যপালের কানে কানে বলে দেন শিক্ষামন্ত্রী। রাজ্যপালের নামে নিয়োগ হয়, এইটুকুই যা। এবার যখন উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন আর সার্চ কমিটির প্যানেলের উপর অন্ধভাবে আস্থা রাখতে রাজি নন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস। সার্চ কমিটির তালিকায় থাকা তিনজনের সঙ্গেই সরাসরি কথা বলতে চেয়েছেন রাজ্যপাল। অর্থাৎ উপাচার্য পদ প্রত্যাশী তিনজনের ইন্টারভিউ নিতে চান রাজভবন নিবাসী আচার্য।

উপাচার্য নিয়োগের ব্যাপারে অতীতে এমন ঘটনা রাজ্যে কখনও ঘটে নি। সরকার রাজ্যপালের এই পদক্ষেপকে কীভাবে নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। জগদীপ ধনখড় যে কয়দিন রাজভবনে ছিলেন, রাজ্যপালের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কেমন সুমধুর সম্পর্ক ছিল, তা সকলের জানা। পদাধিকার বলে রাজ্যপাল রাজ্যের প্রায় সবকটি সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। জগদীপ ধনখড় ডেকে পাঠালেও নবান্নের ইশারায় রাজভবনে গরহাজির থাকতেন উপাচার্যরা। রাজ্যপালকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে আচার্য পদে বসাতে গত জুন মাসে বিধানসভায় একটি বিতর্কিত বিল পর্যন্ত পাশ করিয়ে নেয় রাজ্য সরকার। যদিও সেই বিলে ধনখড় স্বাক্ষর করে না যাওয়ায় আজ‌ও তা আইনে পরিণত হয় নি।

উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে দলবাজি করতে এবং তৃণমূল অনুগতদের হাতে উপাচার্য পদ পুরস্কার হিসেবে তুলে দিতেই সরকার রাজ্যপালের ক্ষমতা খর্ব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে বিরোধীদের অভিযোগ। নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত সুবীরেশ ভট্টাচার্যকে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করেছিল বিকাশ ভবন। নবান্নের সম্মতি ছাড়া সুবীরেশ যে নিয়োগ পান নি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুবীরেশ জেলে যাওয়ার পর ওমপ্রকাশ মিশ্রকে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্য হিসেবে পাঠানো হয়। একদা মমতার কঠোর সমালোচক এই অধ্যাপক বছর তিনেক আগে হঠাৎ পাল্টি খেয়ে দিদির দলে ভিড়ে যান। বিধানসভা নির্বাচনে শিলিগুড়ি আসনে ওমপ্রকাশ গো হারান হারেন। শেষে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্য পদটি সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে জোটে ওমপ্রকাশ মিশ্রের।

রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের সিদ্ধান্তের কথা জানার পর রাজ্যের শিক্ষা মহল বলছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কী চলছে, সেই খবর রাজ্যপালের কানে নিশ্চয় এতদিনে পৌঁছে গেছে। ন‌ইলে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে তিনি এমন নজিরবিহীন পদক্ষেপ করতে যাবেন কেন। নতুন রাজ্যপাল যে রাজ্যের উচ্চ শিক্ষার হালচাল জানতে যথেষ্টই আগ্রহী, তার প্রমাণ আগামী ১৭ জানুয়ারি রাজ্যের সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্যদের নিয়ে রাজভবনে একটি বৈঠক ডেকেছেন তিনি। যত দূর জানা যাচ্ছে, পরের দিন‌ই সার্চ কমিটির ঠিক করা তিন জনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলবেন সি ভি আনন্দ বোস। রাজ্যপালের সিদ্ধান্তে সরকারের গাত্রদাহ হলেও আপাতত সি ভি আনন্দ বোস অখুশি হন, এমন কাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করবেন না বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

রাজ্যর শিক্ষা মহলের অনেকের‌ই প্রত্যাশা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থার দিকেও নজর দিন রাজ্যপাল। সরকারের খামখেয়ালিপনায় ১৬৫ বছরের প্রাচীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়‌ও স্থায়ী উপাচার্য হীন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে সোনালি চক্রবর্তীর নিয়োগ ছিল প্রথম থেকেই বিতর্কিত। সোনালির যোগ্যতা নিয়েই অনেক প্রশ্ন উঠেছিল শিক্ষা মহলে। সে’সব পাত্তা না দিয়েই সোনালি চক্রবর্তীকে দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষে বসিয়ে দেয় সরকার। খুঁটির জোরেই সে’বার সোনালির উপাচার্য পদপ্রাপ্তি ঘটেছিল বলে কটাক্ষ করতে ছাড়ে নি বিরোধীরা। রাজ্যপালকে এড়িয়ে সোনালি চক্রবর্তীকে দ্বিতীয় বার উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করে নিজের মুখ পোড়ায় রাজ্য সরকার। সোনালির নিয়োগ নিয়ে হাইকোর্টে মামলা হতেই ধরা খায় নবান্ন। সোনালিকে উপাচার্য পদে পুনরায় বসাতে গিয়ে সরকার নিয়ম ভেঙেছে, হাইকোর্টে প্রমাণিত হয়। আদালতের নির্দেশে সোনালি পদ খোয়ান। এর পর থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অভিভাবক শূন্য। রাজ্যের উচ্চ শিক্ষার ওপর রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস একটু নজর দিলে পরিস্থিতি খানিক শোধরাতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।

Feature Image is representational and collected.


Leave a Reply

Your email address will not be published.