খাদ্য সংকটের জেরে যে দেশের বাজারে এক কেজি পেঁয়াজের দাম ১০০০ টাকা! - nagariknewz.com

খাদ্য সংকটের জেরে যে দেশের বাজারে এক কেজি পেঁয়াজের দাম ১০০০ টাকা!


একজন ফিলিপিনোর নূন্যতম দৈনিক মজুরিকেও ছাপিয়ে গেছে পেঁয়াজের দাম!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পেঁয়াজের ঝাঁঝে নয় দাম শুনেই চোখে জল ফিলিপাইনের মানুষের। পেঁয়াজের দাম কানে গেলে হার্টফেল হ‌ওয়ার‌ও আশঙ্কা। রাজধানী ম্যানিলার খুচরো বাজারে ১ কেজি পেঁয়াজের দাম স্থানীয় মুদ্রায় ৭০০ পেসো। যা ১৩ ডলারের সমান। ভারতীয় মুদ্রায় ১ ডলার এখন ৮১ টাকার সমান। অর্থাৎ ফিলিপাইনের জনগণকে বাজারে গিয়ে এক কেজি পেঁয়াজ কেনার জন্য ভারতীয় মুদ্রায় খরচ করতে হচ্ছে ১০৫৩ টাকা! সাধারণত মাংস সব দেশেই মহার্ঘ। কিন্তু ফিলিপাইনে পেঁয়াজের দাম মাংসকেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে রোজের খাদ্য তালিকা থেকে পেঁয়াজকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রের বাসিন্দারা। এমনকি একজন ফিলিপিনোর নূন্যতম দৈনিক মজুরিকেও ছাপিয়ে গেছে পেঁয়াজের দাম।

পেঁয়াজের দাম বাড়লে মুখ শুকিয়ে যায় পৃথিবীর সব দেশের মানুষের‌ই। প্রায় প্রতিটি আমিষ নিরামিষ পদের‌ই স্বাদ বৃদ্ধিতে পেঁয়াজ একটি অপরিহার্য আনাজ। পেঁয়াজ ছাড়া মাছ-মাংসের কোনও রেসিপির কথা ভাবাই যায় না। কাঁচা পেঁয়াজ ছাড়া সালাদ কারো মুখেই রোচে না। চাহিদা-যোগানে তালমিলের অভাব হলে ভারতের বাজারেও সময় সময় পেঁয়াজের দাম বেড়ে যায়। কিন্তু কখনও তা হাজার টাকা কেজিতে পৌঁছায় না। ফিলিপিনোরা‌ও প্রায় সমস্ত রান্নায় পেঁয়াজ দিতে ভালবাসে। কিন্তু এখন মাংস থেকেও পেঁয়াজ বর্জন করেছে তারা। গত কয়েক মাস ধরেই ফিলিপাইনে পেঁয়াজের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়েছে দেশটি। মুদ্রাস্ফীতি চরমে, গত ১৪ বছরে যা সর্বোচ্চ। ফলে জ্বালানি, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া। তবে পেঁয়াজের দাম সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে।

ম্যানিলার বাজারে পেঁয়াজ নিয়ে বসে আছেন এক খুচরো আনাজ বিক্রেতা। ফটো ক্রেডিট- বিবিসি

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা সহ দেশটির কোনও শহরের রেস্তোরাঁতেই আর খাবারের সঙ্গে পেঁয়াজ মিলছে না। কোনও পদ রাঁধতে পেঁয়াজ ব্যবহার করছেন না হোটেলের রাঁধুনিরা। হোটেল-রেস্তোরাঁর দরজায় ‘নো অনিয়ন টপিং’ লেখা বোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাড়ির হেঁসেলেও পেঁয়াজ ঢোকা বন্ধ। ফিলিপাইনের একটি চার-পাঁচ সদস্যের মধ্যবিত্ত পরিবারে আগে মাসে কম করে বারো কেজি পেঁয়াজ লাগত। এখন আধা কেজি পেঁয়াজে মাস চালাচ্ছেন তাঁরা। ফিলিপাইনে পেঁয়াজ এতটাই বিলাসদ্রব্যে পরিণত হয়েছে যে বিয়ের কনে ফুলের বদলে পেঁয়াজের গুচ্ছ হাতে আসরে উপস্থিত হচ্ছেন।

ফিলিপাইনের ইলোইলো শহরে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে ফুলের বদলে পেঁয়াজ গুচ্ছ হাতে কনে। ফটো ক্রেডিট-বিবিসি

কোভিড অতিমারির ধাক্কায় পৃথিবীর সব দেশ‌ই অর্থনৈতিক ভাবে কম-বেশি বেসামাল। তবে শুধু বাজার মন্দার কারণেই নয় প্রকৃতির বিরূপতাও ফিলিপাইনের দুরাবস্থার জন্য দায়ী। পর পর দুটি শক্তিশালী সামুদ্রিক ঝড়ের ফলে দেশটির চাষাবাদ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেঁয়াজ সহ বিভিন্ন শস্যের উৎপাদন ব্যাপক হারে মার খেয়েছে। যার জেরে বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ হ্রাস পায়। তেইশের শুরু থেকেই যে ফিলিপাইনে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে, সেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিলেন দেশটির কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

খাদ্যদ্রব্যের আকাশছোঁয়া দাম কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। জনগণ ভালো করে খেতে পারছে না। স্বাভাবিক ভাবেই চাপে সরকার। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেঁয়াজ সহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য আমদানির নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। আমদানির মাধ্যমে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে পারলে খাদ্যের দাম খানিকটা কমে আসবে বলে সরকারের আশা। অবস্থা দ্রুত শোধরাতে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ দফতরের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। ফিলিপাইনের সরকার প্রধান থেকে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষ- সকলের‌ই আশা ফেব্রুয়ারি থেকে দুরাবস্থা কাটতে শুরু করবে। ফেব্রুয়ারি মাস ফিলিপাইনে ফসল কাটার মরশুম। মার্চে খেত থেকে বাজারে নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করলে পেঁয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে বলে ফিলিপাইনের অর্থনীতিবিদ নিকোলাস মাপার আশা।

খাদ্য ঘাটতির সমস্যা সাময়িকভাবে যদি মিটেও যায় দীর্ঘ মেয়াদে কিন্তু বড় বিপদ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এই দ্বীপরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ঘন ঘন সামুদ্রিক ঝড়ে বিপর্যস্ত। আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। যা দেশটিকে স্থায়ী খাদ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মোট ৭১০৭টি দ্বীপ নিয়ে ফিলিপাইন দেশটি গঠিত। তার মধ্যে ১১টি বড় দ্বীপ দেশটির মোট আয়তনের ৯৪ শতাংশ নিয়ে রেখেছে।

Feature Image Source- Twitter.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *