সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস কেন অনন্য, জেনে নিন - nagariknewz.com

সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস কেন অনন্য, জেনে নিন


বাংলা পাচ্ছে দেশের সবচাইতে দ্রুত গতির ট্রেন বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক বন্দে ভারত আমাদের গর্বের। বিশেষ প্রতিবেদন-

নতুন বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বড় উপহার পাচ্ছে উত্তরবঙ্গবাসী। সপ্তাহে ছয়দিন হাওড়া-এনজেপি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস চলাচল করবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে। রবিবার হাওড়া স্টেশনে চলেও এসেছে বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। মোদী সরকারের লক্ষ্য ভারতকে হাইস্পিড বুলেট ট্রেনের জগতে পৌঁছে দেওয়া। তার‌ই আগের ধাপ বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। বন্দে ভারত এক্সপ্রেসকে বলা হয় সেমি হাইস্পিড ট্রেন।

বন্দে ভারত এক্সপ্রেস: সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ভারতের সর্বোচ্চ দ্রুত গতির ট্রেন। ফটো- সংগৃহীত

জাপানের বুলেট ট্রেন ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৩২০ কিলোমিটার গতি তুলতে পারে। সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের পরীক্ষিত সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ১৮০ কিলোমিটার। যদিও ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলতে সক্ষম করেই বন্দে ভারত এক্সপ্রেসকে নির্মাণ করেছেন আই সি এফ বা ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরির ইঞ্জিনিয়াররা। সর্বোচ্চ গতি ১৮০ কিলোমিটার হলেও ট্র্যাকের কথা ভেবে সাধারণত ১৩০ থেকে ১৬০ এর মধ্যেই চলাচল করে থাকে বন্দে ভারত।

হাওড়ায় চলে এসেছে বন্দে ভারত। যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় লিলুয়া ইয়ার্ডে বন্দ ভারত এক্সপ্রেস। ফটো- সংগৃহীত

বন্দে ভারত এক্সপ্রেস চালুর খবরে খুব সঙ্গত কারণেই উৎফুল্ল উত্তরবঙ্গের মানুষ। এখন এনজেপি থেকে ট্রেনে চেপে ১০ ঘন্টার আগে কলকাতা পৌঁছানো যায় না। বন্দে ভারতে চেপে আট ঘন্টার মধ্যেই নিউ জলপাইগুড়ি-হাওড়া যাতায়াত করা যাবে। এনজেপি-হাওড়ার মাঝে মালদহ ও বোলপুরে স্টপেজ দেবে দেশের সবথেকে দ্রুতগতির এই ট্রেন। এনজেপি থেকে দুপুর ২টা বেজে ৫০ মিনিটে ছেড়ে বন্দে ভারত হাওড়া পৌঁছাবে রাত ১০টা ৫০ মিনিটে। আবার পরদিন ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে ছেড়ে এনজেপি পৌঁছাবে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে।

মুম্বাই-গান্ধীনগর বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের উদ্বোধনের পর একটি কোচেরেলের উচ্চ পদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণো। ফটো ক্রেডিট- বিজনেস টুডে

আই সি এফ-এর রেল প্রযুক্তিবিদদের চার বছরের পরিকল্পনা, ডিজাইনিং, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার ফল বন্দে ভারত। বন্দে ভারতের প্রযুক্তিগত নাম ট্রেন-18। ২০১৯-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি নিউ দিল্লি- বারাণসীর মধ্যে প্রথম বন্দে ভারত এক্সপ্রেস চালু হলেও তার আগে একাধিকবার ট্রেনটির ট্রায়াল রান হয়। প্রথম ট্রায়াল রান হয় ২০১৮-র ২৯ অক্টোবর চেন্নাইয়ে। পরেরটি হয় ৭ নভেম্বর দিল্লিতে। এরপর রাজস্থানের কোটায়। উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদ-রামপুর সেকশনেও ট্রায়াল রান হয়। একের পর এক ট্রায়াল রানের পর ভারতীয় রেলের নিরাপত্তা বিভাগের আধিকারিকেরা যখন এর নিরাপত্তা সম্পর্কে‌ শতভাগ নিশ্চিত হন, তখনই ট্রেন-18 কে যাত্রীবাহী ট্রেন হিসেবে চলাচলের ছাড়পত্র দেয় রেল মন্ত্রক। প্রথম Train-18 তৈরি করতে খরচ হয়েছিল ৯৭ কোটি টাকা। চেন্নাইয়ের আই সি এফ ওয়ার্কশপে ট্রেনটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল ১৮ মাস।

বন্দে ভারত এক্সপ্রেস কেন দেশের দ্রুত গতির বাকি ট্রেনগুলির থেকে আলাদা, জেনে নিন-

  • ওজনে হালকা: যেই হেতু দ্রুত গতির ট্রেন। তাই ওজনে হালকা হ‌ওয়া দরকার। Train-18 বা বন্দে ভারত সিরিজের সেমি হাইস্পিড ট্রেনের কোচগুলির বডি তৈরি হচ্ছে ওজনে হালকা অথচ মজবুত স্টেইন লেস স্টিল দ্বারা। বন্দে ভারত ট্রেনের চতুর্থ প্রজন্মের কোচগুলি তৈরি হবে আরও হালকা অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় দিয়ে। প্রথম নির্মিত বন্দে ভারত ট্রেনের ওজন ছিল ৪৩০ টন। ৩২ টন ওজন ঝড়িয়ে দ্বিতীয় প্রজন্ম থেকে বন্দে ভারত মাত্র ৩৯২ টন।
  • ইঞ্জিন বিহীন ট্রেন: মোট ১৬ কোচের বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ৩৮৪ মিটার বা ১২৬০ ফিট লম্বা। কিন্তু এটাই ভারতের প্রথম ইঞ্জিন বিহীন এক্সপ্রেস ট্রেন। অর্থাৎ পৃথক কোনও ইঞ্জিন কোচগুলিকে টানে না। তাই ইঞ্জিন থেকে বন্দে ভারত ট্রেনকে পৃথক করার প্রশ্নই ওঠে না। হাইস্পিড বুলেট, মেট্রো কিম্বা ইএম‌ইউ-ডিএম‌ইউর মতোই বন্দে ভারতের ট্রেনটির সঙ্গেই ইঞ্জিন স্থায়ীভাবে সংযুক্ত। স্বয়ংচালিত এই ট্রেনের গতি স্বাভাবিকভাবেই দেশের বাকি ট্রেনগুলির থেকে বেশি।
  • স্বয়ংক্রিয় স্লাইডিং দরজা: ১৬ কোচের পুরো ট্রেনটিই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। সবগুলি কোচ‌ই চেয়ার কার এবং এক্সিকিউটিভ ও ইকোনমি – প্লেনের মতো দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। এক্সিকিউটিভ ক্লাসের চেয়ারগুলি ঘূর্ণায়মান বা রিভলভিং, যা ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরানো সম্ভব। এক্সিকিউটিভ হোক আর ইকোনমি- প্রতিটি আসনের যাত্রীদের জন্য‌ই রয়েছে পর্যাপ্ত ‘লেগ স্পেস’। সিট পুশব্যাক হ‌ওয়ায় যাত্রীরা গা এলিয়ে দিতে পারেন স্বচ্ছন্দ্যে। বন্দে ভারতের আরও একটি উল্লেখ করার মতো ফিচার হল মেট্রো ট্রেনের মতো স্বয়ংক্রিয় স্লাইডিং দরজা।
  • চমৎকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা: কোচের অভ্যন্তরে যাত্রী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক কথায় অনবদ্য। ১৬ টি কোচে‌ই আছে সিসি ক্যামেরার নজরদারি। স্টেশনে ট্রেন পুরোপুরি থামার পরেই কেবল স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলে যাবে। ট্রেন চালু হ‌ওয়া মাত্র‌ই দরজা লক হয়ে যাবে। প্রত্যেকটি কোচে আছে ফায়ার ডিটেকশন অ্যালার্ম সহ অত্যাধুনিক অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্হা। আগুন ও উচ্চ তাপ প্রতিরোধী তার দিয়ে কোচের অভ্যন্তরে বিদ্যুতের সার্কিট তৈরি করা হয়েছে।
  • দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বিশেষ কবচ: দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ও সুরক্ষায় সর্বোচ্চ নজর দেওয়া হয়েছে। বন্দে ভারতের নতুন কোচগুলিতে সংঘর্ষ প্রতিরোধে বিশেষ রক্ষা কবচ বা train collision avoidance system (TCAS) যোগ করা হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে চালককে আগাম সতর্ক করে দেয় টিসিএএস।
  • জিপিএস নিয়ন্ত্রিত তথ্য সহায়তা: বন্দে ভারতে যাত্রীদের জন্য রয়েছে জিপিএস নিয়ন্ত্রিত অত্যাধুনিক অডিও-ভিস্যুয়াল তথ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। যাত্রাপথের প্রতি মুহূর্তের আপডেট সিটে বসেই জানতে পারেন যাত্রীরা। ছেড়ে যাওয়া ও পরবর্তী স্টেশনের নাম ঘোষনা করা হয় কোচের ভেতরে থাকা প্যাসেঞ্জার অ্যাড্রেস সিস্টেমের মাধ্যমে।
  • অন বোর্ড হটস্পট ওয়াই-ফাই: চলন্ত ট্রেনে যাত্রীদের জন্য অন বোর্ড হটস্পট ওয়াই-ফাইয়ের সুবিধা রয়েছে বন্দে ভারতে। ট্রেনের ওয়াইফাই ব্যবহার করে যাত্রীরা নিজেদের মোবাইল, ট্যাবস কিম্বা ল্যাপটপ থেকে ইউটিউব ও সোস্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট সার্ফিং সহ অনলাইনের অন্যান্য কাজ সেরে নিতে পারেন।
  • ট্রেন থেকেই খাবার সরবরাহ: বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে টিকিটের মূল্যের সঙ্গেই খাওয়ার দাম ধরা। ট্রেনের সঙ্গেই পরিচ্ছন্ন প্যান্ট্রি কার রয়েছে। চা-কফি, স্ন্যাকস, ঠান্ডা পানীয়, লাঞ্চ ও ডিনারে গরম গরম ভেজ- ননভেজ উপাদেয় খাবার যাত্রীদের পরিবেশন করে থাকেন রেলের কর্মীরা।
  • প্লেনের মতো টয়লেট: বন্দে ভারতের শৌচালয় প্লেনের মতোই বায়ো-ভ্যাকুয়াম। দেশি এবং পশ্চিমী- দু’ধরণের‌ই ঝা চকচকে ও পরিচ্ছন্ন শৌচালয় রয়েছে ট্রেনটিতে। ট্রেনের শৌচালয় নিয়ে অনেক যাত্রীর মধ্যেই একটা খুঁতখুতানি ভাব থাকে। বন্দে ভারতের অত্যাধুনিক শৌচালয়ের ‘টাচ ফ্রি’ বা স্পর্শমুক্ত পরিচ্ছন্ন ফিটিং যাত্রীদের জন্য বড়‌ই স্বস্তিদায়ক।
  • শব্দ-ধুলোবালি ও ঝাঁকুনি মুক্ত: বন্দে ভারত ট্রেনের অভ্যন্তর প্রায় শব্দ ও ঝাঁকুনি মুক্ত। দুই কোচের মধ্যবর্তী স্থানে কোন‌ও ফাঁকা স্থান নেই। বাফার জোন বা মধ্যবর্তী স্থান সিল করা। ফলে কামরাগুলি বাইরের শব্দ ও ধুলোবালি থেকে মুক্ত। গোটা ট্রেন নিরাপদে হেঁটে বেড়ানো যায় এবং ট্রেনটি এমনভাবেই ডিজাইন করা যে, যেকোনও কামরা থেকেই চালকের কেবিন দেখার সুযোগ পান যাত্রীরা।
  • প্রতিটি আসনের সঙ্গে চার্জার সকেট: প্রত্যেকটি আসনের সঙ্গে মোবাইল, ট্যাবস ও ল্যাপটপ চার্জ দেওয়ার সকেট রয়েছে। প্রত্যেক যাত্রীর মাথার ওপর রিডিং লাইটের সুবিধা রয়েছে।
  • দিব্যাঙ্গদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা: শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে, এমন যাত্রীদের সুবিধার্থে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের কিছু কিছু কোচে হুইল চেয়ার রাখা ও চলাচল করার পর্যাপ্ত স্থান রাখা হয়েছে।
  • অধিক স্থান যুক্ত মড্যুলার র‍্যাক: বন্দে ভারতের চেয়ার কার গুলিতে রয়েছে মড্যুলার র‍্যাক। ফলে‌ গতিমান এক্সপ্রেস সহ দেশের অন্য যে কোনও দ্রুতগতির ট্রেনের থেকে বন্দে ভারতে লাগেজ রাখার জন্য অনেক বেশি জায়গা পান যাত্রীরা।

সব থেকে বড় কথা, বন্দে ভারত এক্সপ্রেস ভারতের আত্মনির্ভরতার প্রতীক। এই সেমি হাইস্পিড ট্রেন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত। এবং অত্যন্ত সস্তায় এত সর্বাধুনিক ট্রেন দেশবাসীকে উপহার দিতে পেরেছেন আমাদের প্রযুক্তিবিদেরা। প্রথম Train-18 তৈরিতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৯৭ কোটি টাকা। পরের দুটি বন্দে ভারত নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০৬ কোটি টাকা। আরও আধুনিক ও অধিকতর উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত যে বন্দে ভারত ট্রেন এখন তৈরি হচ্ছে তাতে খরচ পড়ছে ১১০ কোটি টাকা। এক-একটি কোচের পেছনে খরচ সাত কোটির‌ও কম, যা বিদেশ থেকে রপ্তানি করলে দাম দিতে হত প্রায় দ্বিগুণ।

বন্দে ভারত ট্রেনের ইন্টেরিয়র: গতির পাশাপাশি নিরাপত্তা ও যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্যেও অনবদ্য বন্দে ভারত। ফটো- সংগৃহীত

বন্দে ভারত এক্সপ্রেস নিঃসন্দেহে আমাদের গর্বের। একে পরিচ্ছন্ন ও নিখুঁত রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

Feature Image is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published.