ইতুপূজার ইতিকথা - nagariknewz.com

ইতুপূজার ইতিকথা


ইতুপূজা আসলে বাঙালির ঊষা বা সূর্য তথা সূর্যের শক্তির আরাধনা। ইতুপূজার ইতিকথায় আরও যা জানালেন ঋতুপর্ণা কোলে-

ভারতবর্ষের পূর্বদিকে থাকা বাঙালি নামক জাতিটির সম্পর্কে প্রচলিত প্রবাদ হলো– “বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ”। আসলে তেরো নয় অজস্র পার্বণ। পার্বণ বলতে বোঝায় পরব, উৎসব ইত্যাদি। যার মধ্যে মিশে থাকে একটি জাতির ধারাবাহিকতা। কালের নিয়মে, আধুনিকতার করালগ্রাসে আজ অনেক উৎসব বা পরব বা পার্বণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবু যেটুকু বেঁচে আছে তার নানা বৈচিত্র্য। কেবল দিন, ক্ষণের বৈচিত্র্য নয় বা আচার আচরনের ফারাকে নয়, বৈচিত্র্য তার ভিন্নমুখিতায়। নানা মতবাদ, নানা তত্ত্ব ও নানা বিশ্বাসের পারস্পরিক সহাবস্থান দেখে বিস্মিত হতে হয় বৈদিক, অবৈদিক, মিশ্রিত, লোকায়ত, ধর্মযুক্ত, ধর্মবিযুক্ত নানা উৎসব সারা বছর জুড়ে পালিত হয় বঙ্গদেশে। বর্তমানের মূল আলোচ্য বিষয় হলো বাঙালি জীবনের সূর্যকেন্দ্রিক উৎসব তথা ইতুপূজার নানাদিক।

ক’দিন আগে বিহারের মানুষজন ছট পুজোয় মেতে উঠেছিলেন। “ছটি মাইয়ার” পূজা করেছিলেন। কিন্তু যদি কাউকে জিজ্ঞেস করেন “ছট পূজা” মানে কী এককথায় উত্তর পাবেন সূর্য পূজা। আশ্চর্যের ব্যাপার না একবার শোনা যাচ্ছে ছটি মাইয়া আর একবার শোনা যাচ্ছে সূর্যপূজা। যদি সূর্যই হয় তবে মাইয়্যা কেনো হবে। আচ্ছা একটু বিহার থেকে বাংলায় ফিরে আসা যাক। ইতুপুজোর কথা সকলেই জানেন। ইতুপূজাও নাকি সূর্য পূজা। জানেন তো ইতুকে সাধ খাওয়ানো হয়। ইতু শব্দের উৎপত্তি বিচারে বলা হয়ে থাকে সূর্যের আরেক নাম মিত্র তা থেকে ইতু শব্দ এসেছে। তাহলে সাধ খাওয়নোর ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে না? সূর্য তথা সূর্যের শক্তি যে এ পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টির মূলে, তা আমাদের পূর্বমানুষেরা ভালোই অনুধাবন করেছিলেন। আদিতে সূর্য এবং সূর্যের শক্তিকে আলাদা করে দেখা হত না। সৃষ্টির প্রতীককে মা হিসাবেই কল্পনা যে করা হয়েছিল তা ছটি মাইয়া কিংবা ইতুর সাধ খাওয়ানোর মতো প্রথা থেকেই বোঝা যায়। খেয়াল করলে দেখা যাবে ঊষাকালে ছট পূজা হয়ে থাকে। ইতু ভাসানের ক্ষেত্রেও একই সময়।আজকের ধর্মাচারণে ঊষাবন্দনা সূর্যবন্দনার নামের আড়ালে মিশে আছে তা স্পষ্ট। ঊষা মাতৃকার পূজা হরপ্পা সভ্যতাতেও ছিল। সূর্যকে আদিতে মাতৃকারই প্রকাশ বলে মনে করা হতো। ইনন্যা ঊষা ইতুলক্ষ্মী তারই দৃষ্টান্ত। সূর্যের গতির সাথে কালচক্রের ধারণার সংযোগ আছে। সেই পথেই কালরূপা এবং পৃথিবীমাতা একীভূত হয়েছেন। সেই শক্তির কাছে ইতু সরা যা “মিনি বিশ্বে”র সমার্থক তাকে উৎসর্গ করা হয়। এর থেকে প্রমাণিত যে প্রাচীন কাল থেকেই প্রাণ আছে এমন কিছুই উৎসর্গ করা হয়। পশু ও উদ্ভিদ দুই উৎসর্গ করার প্রথা ছিল।

ইতু পূজা আসলে বাঙালি নারীদের একমাস ধরে চলা একটি ব্রতের মতো। যেখানে নারীরাই ব্রতকথা পাঠের মধ্যে দিয়ে পূজা সম্পন্ন করে। ইতুপূজার পূজা পদ্ধতি এবং উপকরণ অনেক সময় শস্য পূজার কথা স্মরণ করায়। কার্তিকের সংক্রান্তি থেকে অগ্রহায়ণের সংক্রান্তি পর্যন্ত এই একটা মাস প্রতি রবিবার ইতুপূজা করতে দেখা যায়। কার্তিক সংক্রান্তির দিনে একটি সুন্দর মাটির মালসায় মাটি দিয়ে তাতে পাঁচ রকমের শস্যের বীজ দিতে হয়, যেমন, ধান, হলুদ, কলমী, মান বা কচু এবং মটর বা ছোলা। এরপর নিয়মিত জল দিতে হয়। এই সরা বা মালসার উপর একটি মাটির ঘট দেওয়া হয়। অগ্রহায়ণ সংক্রান্তির দিন ঘটটি দই, দুধ, মিষ্টি ইত্যাদি দিয়ে পূর্ণ করা হয়। এই দিনটি হলো ইতুর সাধ অর্থাৎ গর্ভবতী নারীকে সন্তান প্রসবের আগে যেমন নানা পছন্দ মতো খাবার খাওয়ানো হয় অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে সেটাই করা হয় ইতুর জন্য। তারপর সেই ঘটের মধ্যে আমপাতা, বেলপাতা, দূর্বা ইত্যাদি দেওয়া হয়। এই সাধ দেওয়ার সময় নানা মন্ত্র উচ্চারণ করেন ব্রতীরা। তার মধ্যে একটি হলো–

চালকটা দিয়ে রাঁধল সখী

ভাতকটা দিই খাই

কড়ির চুপড়ি মাথায় করে

গয়লা বাড়ি যাই

গয়লাভাই, গয়লাভাই

ঘরে আছো ভাই?

আমার ইতু সাধ খাবে

ভালো দুধ চাই।

এইভাবে ময়রাভাই, কুমোরভাই, ছুতোরভাই বলে বলে ছড়াটি লম্বা হয়। এতে সমস্ত পেশার মানুষকে স্মরণ করে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের কামনা করা হয়। হিন্দু ধর্ম অনুসারে রাত বারোটায় নতুন দিনের সূচনা নয়,  বরং সূর্যোদয়ের সাথে নতুন দিনের শুরু হয়, তাই অগ্রহায়ণ সংক্রান্তি শেষে নতুন দিনের সূচনা লগ্নে নানা শস্যের গাছ সহ মালসা ও ঘট জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

তবে বর্তমানে এই পূজা স্বকীয়তা হারিয়েছে অনেকটাই। যদিও ইতুর সাধ দেওয়া ব্যাপারটি এখন‌ও বাঙালি মেয়েরা বজায় রেখেছে বা নিজে হাতেই করে থাকে, কিন্তু অগ্রহায়ণের প্রতি রবিবার যে ইতুর পূজা হয় তার অনেকটাই ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রনে চলে গেছে। এখন অনেক বাড়িতেই ব্রাহ্মণ এসে পূজা সম্পন্ন করে যান।

ইতুপূজার আচার আচরণ এবং উপকরণ থেকে অনেকের মনে করেন এটি আসলে শস্য পূজা বা লক্ষ্মী পূজা। শব্দার্থ পরিবর্তনের অনেক কারণ পাওয়া যায় তার মধ্যে অন্যতম হলো অজ্ঞতাজনিত কারণ তার কারণে অনেকে ইতু পূজা কে ঋতু পূজা বলে থাকেন। অনেক সময় অজ্ঞতা না বলে এটাকে হাইপারকারেকশনও বলা যায়। কারণ ইতুকে ঋতু বলার প্রবণতা গ্রামবাংলার তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। কিন্তু ইতুকে ঋতু বলা কিংবা দেবী হিসাবে কল্পনা করার বিশেষ কারণ নেই। এটি সামগ্রিকভাবেই বাঙালির সূর্য তথা সূর্যের শক্তির আরাধনা, ঊষার আরাধনা। ইতু পূজার যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান পালিত হয় ভোরবেলা, ঊষা কালে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। ব্রতকথা পাঠও হয় সেই সময়ে। লক্ষ করলে দেখা যায় ইতুপূজার জন্য নির্ধারিত দিন হল রবিবার বা আদিত্য বার। অর্থাৎ যে দিনটি বিশেষভাবেই সূর্যের নাম অনুসারী সে দিনটিই ইতু পূজার জন্য নির্ধারিত।

ইতুপূজা করার সময় ব্রাহ্মণেরা যে পদ্ধতি অবলম্বন করেন তা হলো– প্রথমে সূর্যের ধ্যান ও ধ্যান মন্ত্র উচ্চারণ করেন। তারপর উচ্চারিত হয় সূর্যের প্রণাম মন্ত্র “ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম । ধান্তারীং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্“ এবং মিত্রকে স্মরণ করে বলা হয়, “ওঁ মিত্রায় নমঃ” ইতুপূজায় অর্পণ করা হয় পঞ্চ শস্য উদ্ভিদযুক্ত মাটির সরা বা মাটির মালসা। সকল প্রাণের উৎস, ধারক, বাহক সূর্য হলেও সেটা উদ্ভিদের ক্ষেত্রে আরও সত্য। মানুষ খাদ্যের বিষয়ে অনেকটাই উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীল। কৃষিকেন্দ্রিক সভ্যতায় সূর্যালোকের ভূমিকা অসীম। সালোকসংশ্লেষ সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও উদ্ভিদের বেঁচে থাকা ও বৃদ্ধির উপর সূর্যালোকের ভূমিকা সে যুগেই অনুধাবন করা সম্ভব হয়েছিলো। দেবতার কাছে কিছু উৎসর্গ করা বহু প্রাচীন প্রথার মধ্যে অন্যতম। মনস্কামনা পূরণের পর পশু বা চালকুমড়ো ইত্যাদি বলি দেওয়া হয় অনেক সময়। ইতু পূজা বিষয়টির সঙ্গে শস্য দেবীর আরাধনার সঙ্গে না মিলিয়ে; অঘ্রানে শস্যভান্ডার পূর্ণ হয় সূর্যের কৃপায়, তাই ফলন্ত কৃষি জমির প্রতীক স্বরূপ শস্যের সমৃদ্ধ গাছসহ মালসা বা সরা পৌষের সূর্য ওঠার আগেই তাঁর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হিসাবে দেখা যেতে পারে। বলির আগে যেমন পশুকে কিছুদিন পালন করতে হয় তেমন সূর্যকে উৎসর্গ করার আগে একমাস ধরে শস্য উদ্ভিদের পরিচর্যা করা অনেকাংশে মিলে যায়। ‘ইতুর মালসা‘ শব্দটির মধ্যে দিয়েই প্রকাশ পায় সূর্যের জন্যেই এই মালসা বা সরা উৎসর্গীকৃত। একারণেই সূর্যাস্তের সাথে সাথে মালসাটিকে ঢেকে দেওয়া হয়।

ইতুপূজা যে আসলে সূর্যের শক্তির আরাধনা সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। বাঙালি জীবনে সূর্যের গুরুত্ব এবং বাঙালির সূর্য আরাধনা নিয়ে বিশেষ আলোচনার প্রয়োজন কারণ সূর্যকে সমস্ত শক্তির উৎস হিসাবে সেই জাতিই গ্রহণ করেছে যারা প্রকৃত অর্থেই অত্যন্ত প্রাচীন জাতি হিসাবে পরিচিত। মানব সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই সূর্যকে সৃষ্টির কারণ হিসাবে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ আগুন আবিষ্কারেরও অনেক আগে থেকেই, কৃষিকাজ বোঝার বহু পূর্বেই। মানুষ যখন থেকে বুঝেছিলো আকাশে চলমান এক বস্তু যতক্ষণ আকাশে থাকে ততক্ষণ চারপাশ থাকে দৃশ্যমান। সেকারণেই মেসোপটেমিয়া সভ্যতা, সুমেরীয় সভ্যতা, প্রাচীন গ্রীক, রোম এবং ভারতবর্ষে সূর্য আরাধনার কথা পাওয়া যায়। বঙ্গদেশে সূর্যের পূজা প্রচলন আছে বলেই বঙ্গদেশে কোনো প্রাচীন সভ্যতা বিরাজমান ছিলো প্রমাণ হয় না। কিন্তু ইতুপূজার আয়োজন থেকে শুরু করে সমাপনের দিকে তাকালে প্রতি পদে পদে প্রাচীনতার ছাপ স্পষ্ট। ইতুপুজা করা হয় মাটির মালসায়। আগুনের ব্যবহার শেখার পর মানুষের সৃষ্টিমূলক ক্রিয়ার মধ্যে অন্যতম ছিলো মাটির বাসনপত্র নির্মাণ। পাথরের বিকল্পের খোঁজ মানুষ পেয়েছিলো। সেই মাটির পাত্র আজও ব্যবহৃত হচ্ছে ইতুপূজায়। শক্তিকে জাগতিক বস্তু দিয়ে প্রতিকায়িত করে আরাধ্য দেবতার রূপ কল্পনা বা মূর্তিপূজা অবশ্যই প্রাচীন। একটি মাটির পাত্র ধারণ করে আছে প্রাণ, যেভাবে ধারণ করে আছে সূর্য প্রাণময় জগতকে। ইতুপূজার গভীরে আজও বেঁচে আছে প্রাচীন মাতৃতান্ত্রিক সমাজের ঐতিহ্যসূত্রও। সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় পূর্বে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতো মেয়েরা এবং পুরুষেরা যেতো পশু শিকারে। বীজ থেকে ফসল ফলানোর মন্ত্র জানা ছিলো মেয়েদের। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ বদলেছে কিন্তু ইতুপূজার মধ্যে রয়ে গেছে সেই ঐতিহাসিক সত্য। শস্য ফলানো এবং তা দেবতাকে উৎসর্গ করা মাতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরোটাই ছিলো মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে সেই ধারাবাহিকতা আজও রয়ে গেছে বাঙালির এই সূর্য আরাধনায় তথা ইতুপূজায়।


Leave a Reply

Your email address will not be published.