কলকাতায় বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী নূর নবীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ও অনেক প্রশ্ন - nagariknewz.com

কলকাতায় বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী নূর নবীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ও অনেক প্রশ্ন


বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের সাজাপ্রাপ্ত কুখ্যাত সন্ত্রাসী নূর উন লতিফ নবী বা নূর নবী ওরফে সারোয়ার ম্যাক্সনের কলকাতায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা অনেকগুলি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। গত ২৯ নভেম্বর রাতে, কলকাতার হরিদেবপুরের মতিলাল গুপ্ত রোডের একটি ফ্ল্যাট থেকে নূরের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। যদিও তাকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ থেকে অভিযোগ করেছেন মৃতের ভাই আক্তার হোসেন। জামাতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী নূরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে খুন-সন্ত্রাস-তোলাবাজি-বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র বহন সহ ৫০ টির বেশি মামলা ছিল। অস্ত্র মামলায় বিচারে তার ২১ বছরের সাজা পর্যন্ত হয়েছিল। এহেন বাংলাদেশী কুখ্যাত জঙ্গি পালিয়ে দুবাই হয়ে ভারতে ঢুকে পশ্চিমবঙ্গে এসে তমাল চৌধুরী নাম নিয়ে দীর্ঘদিন কলকাতায় ছিল। হরিদেবপুরে থেকে মাছের ব্যবসা করত নূর নবি। এক যুবতীর সঙ্গে থাকত স্বামী পরিচয় দিয়ে।

২০১৩ সালে চট্টগ্রামে গ্রেফতার হওয়ার পর। মাঝে নূর নবী ওরফে ম্যাক্সন। ছবি- প্রথম আলো থেকে সংগৃহীত

সব থেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল,  চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি নূর নবীকে ডানলপ থেকে সিআইডি গ্রেফতার করলেও এপ্রিলে জামিন পেয়ে যায় সে। ভারতে গ্রেফতার হ‌ওয়া বাংলাদেশী কুখ্যাত দুষ্কৃতী ও সন্ত্রাসীদের ওপর ঢাকা টাইমস গত ২২ মে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

আগে দেখে নিই ঢাকা টাইমসের সেই প্রতিবেদনে নূর নবীর গ্রেফতারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কী লেখা হয়েছিল-

শীর্ষ সন্ত্রাসী ম্যাক্সন কলকাতায় গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের শিবির ক্যাডার নূরনবী ওরফে ম্যাক্সনকে এ বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করে কলকাতা পুলিশ। উত্তর চব্বিশ পরগনার ডানলপ নর্দান পার্ক এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অস্ত্র মামলায় ২১ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এই সন্ত্রাসী জাল পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে নাম বদলে তমাল চৌধুরী পরিচয়ে কলকাতায় আত্মগোপনে ছিলেন।

কলকাতা ও চট্টগ্রাম পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ম্যাক্সন নিজেকে পরিচয় দিতেন মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে। দালাল ধরে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট জোগাড় করেন। চট্টগ্রামের পুলিশই ম্যাক্সনের কলকাতায় অবস্থানের বিষয়ে কলকাতা পুলিশকে তথ্য সরবরাহ করে। পরে তাকে ধরতে অভিযানে নামে সেখানকার সিআইডি পুলিশ।

গ্রেপ্তারের পর ম্যাক্সনের সঙ্গে থাকা কাগজপত্র ঘেঁটে পুলিশ জানতে পারে আত্মগোপনে থাকতে নিজের নামের পাশাপাশি বাবার নামও পরিবর্তন করে ম্যাক্সন। বাবার নাম রাখেন অসীম চৌধুরী।

শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল সারোয়ার বাবলা ও নূরনবী ম্যাক্সন। দুজনের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। একে-৪৭-এর মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন দুজন। ২০১৭ সালে গোপনে জামিন নিয়ে দুবাই পালিয়ে যায় এই দুই সন্ত্রাসী। পরবর্তীতে ম্যাক্সন দুবাই থেকে কলকাতায় চলে আসে।

বর্তমানে ম্যাক্সনের বিরুদ্ধে বায়েজিদ বোস্তামি থানায় সাতটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তাকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে অথবা কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ করে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানায় পুলিশ।

প্রশ্নগুলির উত্তর মিলবে কি?

বাংলাদেশের নিউজ পোর্টালটির এই  প্রতিবেদন পড়ার পর অনেকগুলি প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। যে প্রশ্নগুলির  উত্তর দেওয়ার দায় বর্তায় রাজ্য প্রশাসনের ওপর এমনকি কেন্দ্রের ইন্টেলিজেন্স উইংসগুলিও এই দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। চট্টগ্রাম পুলিশের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে রাজ্যের গোয়েন্দারা যেই বাংলাদেশের মোস্ট ওয়ান্টেড দুষ্কৃতীকে ধরল, মাত্র দু’মাসের মধ্যেই তার জামিন মিলল কীভাবে? যেখানে  সাধারণ অনুপ্রবেশকারীরাই ধরা পড়লে ফরেনার্স অ্যাক্টে অভিযুক্ত হ‌ওয়ার পর জামিন পায় না। ভারতের জেলে শত শত বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বছরের পর জেল খাটছে। এমনকি এই বন্দীদের মধ্যে বাংলাদেশের নির্যাতিত সংখ্যালঘুরাও বড় সংখ্যায় আছে।

যেখানে একজন ধৃত অনুপ্রবেশকারীর জামিন খারিজ হ‌‌ওয়ার জন্য ফরেনার্স অ্যাক্ট-ই যথেষ্ট, সেখানে নূর নবীর মতো কুখ্যাত দুষ্কৃতী ( যাকে হাতে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ইন্টারপোলের পর্যন্ত সাহায্য চেয়েছিল ) জামিন পায় কীভাবে?

চট্টগ্রামের পুলিশ ৫০ মামলার আসামি নূর নবীর ব্যাপারে যাবতীয় তথ্য সিআইডি ও কলকাতা পুলিশকে দিয়েছিল। সেই সূত্রের ভিত্তিতেই নূরকে গ্রেফতার করে সিআইডি। নূর  অবৈধভাবে ভারতীয় পাসপোর্ট ও ভোটার পরিচয়পত্র, আধার কার্ড জোগাড় করেছিল। গ্রেফতারের পর এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও করে সিআইডি। কোনও বিদেশি নাগরিক অবৈধভাবে দেশে ঢুকে নাম ভাঁড়িয়ে ভুয়ো পাসপোর্ট ও ভোটার পরিচয়পত্র জোগাড়ের অভিযোগে গ্রেফতার হলে তার বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দেওয়ার সুযোগ আছে। কুখ্যাত বাংলাদেশী দুষ্কৃতী নূর নবী আইনের কোন ফাঁক গলে জামিন পেয়ে জেল থেকে বেরিয়ে কলকাতার জনজীবনে মিশে গেল?

বাংলাদেশ সরকার জামাতের যে‌ই কুখ্যাত জঙ্গিকে প্রত্যর্পণের জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ করছিল, তার জামিন খারিজের  কোনও আইনি চেষ্টা করেছিল কি রাজ্য সরকার? নূর নবীকে ডানলপে সিআইডি গ্রেফতার করে ফেব্রুয়ারি মাসে। এপ্রিলে সে আদালত থেকে জামিন পেয়ে জেল থেকে বেরোয়। বাংলাদেশের এই ভয়ঙ্কর অপরাধী পুলিশের চার্জশিট পেশের আগেই জামিন পায় কীভাবে? আরও একটি প্রশ্ন- নূর নবী ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার হয়ে এপ্রিলে ছাড়া পায়। নভেম্বরের ২৯ তারিখ হরিদেবপুরে তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হল। নয় মাসের মধ্যেও সিআইডির তদন্তকারী দল বাংলাদেশের কুখ্যাত ফেরারি আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিতে ব্যর্থ হল কেন?

নূর নবী জামিনে মুক্ত হ‌ওয়ার পর তার গতিবিধির উপর কোন‌ও নজরদারি চালিয়েছিলেন রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দারা? একজন কুখ্যাত বাংলাদেশী দুষ্কৃতী, যার ব্যাপারে যাবতীয় রেকর্ডস রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দাদের কাছে আছে, সে এপ্রিলে জামিন পেয়ে হরিদেবপুরে সংসার করতে শুরু করে দিল। সাত মাস ধরে হরিদেবপুরে থাকল। পুলিশ কিছুই টের পেল না! ঘটনাটা আশ্চর্য না?

মামলার তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের তরফে গুরুতর কোনও গাফিলতি না থাকলে প্রতিবেশী দেশের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীর জামিন মেলে কীভাবে? নাকি পর্দার পেছনে অন্য কোনও রহস্য আছে।

ও পারের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’-দের এ পারে কারা দেয় আশ্রয়-প্রশ্রয়?

অনেকেরই অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশী জঙ্গি-খুনি-সন্ত্রাসবাদী ও দুষ্কৃতীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কলকাতা ও তার আশপাশের অঞ্চলে সহজেই গা ঢাকা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তারা। নাম এমনকি ধর্মীয় পরিচয় পাল্টে এ’দেশে রেশন কার্ড, আধার কার্ড এবং ভোটার পরিচয়পত্র করে নিচ্ছে তারা। কেউ কেউ ভারতীয় পাসপোর্ট‌ও বাগিয়ে নিয়ে বছরের পর রাজ্যে ঘাপটি মেরে ছিল। ২০২০– এর এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই খুনি আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেউদ্দিনকে কলকাতা থেকে গ্রেফতার করে কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দারা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ দীর্ঘ ২৫ বছর পশ্চিমবঙ্গে লুকিয়ে ছিল। কলকাতার বেডফোর্ড লেনে আলি আহমেদ নাম নিয়ে বাস করত মাজেদ। এই ভুয়ো নামে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের যাবতীয় নথি জোগাড় করে ফেলেছিল সে। আব্দুল মাজেদ শুধু শেখ মুজিবের হত্যাকারী দলের সদস্য‌ই ছিল না, জেলখানায় বাংলাদেশের চার জাতীয় নেতার হত্যাকান্ডের সঙ্গেও জড়িত ছিল।

প্রতিবেশী দেশের মোস্ট ওয়ান্টেড দুষ্কৃতীরা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতেই পারে। কিন্তু তাদের বিষয়ে কোনও তথ্য দেশের ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলির হাতে থাকবে না? পক্ষান্তরে তাদের দেশের পলাতক খুনি-জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদীদের গতিবিধির উপরে নজরদারি চালাতে অনেক বেশি সফল বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি সহ  এখনও পর্যন্ত যে ক’জন বাংলাদেশী জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদী-দুষ্কৃতী পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের গতিবিধির ব্যাপারে  সুনির্দিষ্ট তথ্য এসেছে ঢাকা থেকে।

বাংলাদেশের কুখ্যাত অপরাধীরা  পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে কীভাবে নিরাপদ আস্তানা বানিয়ে ফেলে। ভুয়ো নামে ভারতীয় নাগরিকত্বের নথি পেতে  কারা তাদের সহায়তা করে। গ্রেফতার হ‌ওয়ার পরে কেন তাদের জামিন মেলে। এই সব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায় কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসনের না হলে আর কার?

Feature Photo Credit- Prothom Alo.


Leave a Reply

Your email address will not be published.