বৈদিক ভিলেজে শিবির শেষ, বঙ্গ বিজেপিতে শৃঙ্খলা ও ঐক্য ফিরল ক‌ই?


কোন্দল মেটানোর জন্য শিবির বসল। শিবির মিটল কিন্তু রাজ্য বিজেপির কোন্দল মিটল না!

রাজনৈতিক প্রতিবেদন : কোন্দলে জেরবার বঙ্গ বিজেপিকে শোধরানোর অনেক কোশিস করছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বিধানসভা ফস্কেছে। সামনে লোকসভা ভোট। হাতে সময় দেড় বছরের‌ও কম। উনিশে বাংলা থেকে এসেছে ১৮ টা আসন। কিন্তু একুশে কী হবে, এই চিন্তায় কেন্দ্রীয় নেতাদের ঘুম হারাম হলেও রাজ্য বিজেপির নেতাদের হেলদোল আছে বলে মনে হয় না। দলে এক নেতার মুখ আরেক নেতা দেখেন না। একজন আরেকজনকে প্রকাশ্যেই ধুয়ে দিচ্ছেন। এক নেতার কর্মসূচি ডাকলে আরেক নেতা ভন্ডুল করে দিচ্ছেন। গত পুজোর আগে দিলীপ ঘোষকে সরিয়ে বালুরঘাটের সাংসদ অধ্যাপক সুকান্ত মজুমদারকে রাজ্য বিজেপির সভাপতি করা হয়েছে। কিন্তু মুরলীধর সেন লেনের গৈরিক বাড়িতে খোয়াখুয়ি যে বন্ধ হয় নি, তা দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চেয়ে ভাল আর কেউ জানে না। বঙ্গ বিজেপির নেতাদের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ- দিল্লিতে উড়ে গিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে শাহ-নাড্ডার কাছে অভিযোগ জানানো এবং শাহ-নাড্ডা কলকাতায় এলে একে অপরের বিরুদ্ধে নালিশ ঠোকা। অমিত শাহ কড়া ধাতের মানুষ। বাংলার নেতাদের বকাঝকা কম করেন না কিন্তু তাতে নেতারা শুধরেছেন এমন প্রমাণ এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

এই পরিস্থিতিতে বঙ্গ বিজেপির সংসারে ভাইচারা আনতে রাজধানীর দীনদয়াল ভবন থেকে নতুন পর্যবেক্ষক পাঠানো হয়েছে। বিজেপির সংগঠনে পর্যবেক্ষকদের বিরাট ভূমিকা। রাজ্যসভাপতি যদি টিমের ক্যাপ্টেন হন পর্যবেক্ষক তবে কোচ। নতুন পর্যবেক্ষক সুনীল বনশল জাঁদরেল নেতা। উত্তরপ্রদেশে দলের সংগঠন মেরামত করার অভিজ্ঞতা সুনীলের ঝুলিতে। পশ্চিমবঙ্গে সুনীল বনশলের পোস্টিং দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাংলাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন অমিত শাহ-জেপি নাড্ডা। সুনীল কলকাতায় পা দেওয়ার আগে রাজ্য বিজেপির অন্দরে সম্প্রীতির চেহারাটা ছিল দেখার মতো। রাজ্যসভাপতির চেয়ার হাতছাড়া হ‌ওয়ার পর থেকেই দিলীপ ঘোষ বেপরোয়া, দলীয় শৃঙ্খলার ধার ধারেন না। সম্প্রতি দিলীপ একাধিকবার এমন সব মন্তব্য করেছেন, তাতে মনে হ‌ওয়া স্বাভাবিক সুকান্ত মজুমদারের নেতৃত্বাধীন রাজ্য বিজেপিকে গোল্লায় পাঠাতে পারলেই সবথেকে খুশি হন তিনি। রাজ্য বিজেপিতে ঠিক কটা গোষ্ঠী, গোষ্ঠীগুলির ভেতরে আবার কটা উপগোষ্ঠী। কার সঙ্গে কার আড়ি, কার ভাব বলা খুব শক্ত। সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে‌ও প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর একরাশ অভিযোগ। রাজ্যসভাপতির ডাকা বহু কর্মসূচিতে তাঁর বিরাগভাজনরা ডাক পান না বলে অভিযোগ।

রাজ্য বিজেপির প্রশিক্ষণ শিবিরে বক্তৃতা দিচ্ছেন পর্যবেক্ষক সুনীল বনশল।

সুনীল বনশল বাংলার দায়িত্ব পেয়েই সংগঠন মেরামতিতে নেমে পড়েছেন। বৈদিক ভিলেজে রাজ্য বিজেপির তিনদিনের প্রশিক্ষণ শিবির বৃহস্পতিবার‌ই শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক রণকৌশল নির্ধারণ করার পাশাপাশি রাজ্যের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল শিবিরের উদ্দেশ্য। প্রশ্ন একটাই- শিবির তো মিটল কিন্তু বঙ্গ বিজেপির কোন্দল মিটল কি? আবাসিক শিবিরে অনেক আলাপ-আলোচনা, বক্তৃতা, তত্ত্বকথা হল। গান-বাজনা, খেলাধুলোও হয়েছে। শিবিরে সব থেকে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে ঘর গোছানোতে। বিধানসভা নির্বাচনে হারার পর থেকে স্থানীয় অথবা লোকসভা-বিধানসভার উপনির্বাচন, কোনও ভোটেই ভাল ফল করতে পারে নি বিজেপি। সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। তারপরেই লোকসভা ভোট। তার আগেই ঘর গুছিয়ে বঙ্গ বিজেপিকে লড়াইয়ের জন্য তৈরি করতে চান সুনীল বনশল। ঘর গোছানোর এই শিবিরে দলের সমস্ত জনপ্রতিনিধি ও পদাধিকারীদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল। অথচ চার কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রীর তিনজন‌ই শিবিরে গরহাজির। ডঃ সুভাষ সরকার যোগ দিলেও এড়িয়ে গেছেন নিশীথ অধিকারী, শান্তনু ঠাকুর ও জন বার্লা। আমন্ত্রণ পেয়েও এঁদের প্রত্যেকের শিবির এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে অসন্তোষ। তিন মন্ত্রীর এই আচরণ কি ঐক্যের ছবিটাকে উজ্জ্বল করল?

শিবিরে ঐক্যের ছবি: দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারী,অমিতাভ চক্রবর্তী ও সুভাষ সরকার পাশাপাশি।

শিবির মিটতে না মিটতেই দিল্লি থেকে দলের রাজ্যসভাপতি সুকান্ত মজুমদারকে ধুয়ে দিলেন অনুপম হাজরা। বোলপুরের প্রাক্তন সাংসদ অনুপম বর্তমানে সর্বভারতীয় বিজেপির সম্পাদক। বৈদিক ভিলেজের শিবিরে অনুপম আমন্ত্রণ পান নি। আমন্ত্রণ না পাওয়ায় অনুপমের মুখ বেলাগাম হয়েছে। অনুপম হাজরার অভিযোগ ফেলনা নয়। অনুপমের প্রশ্ন- কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে দিলীপ ঘোষ রাজ্য বিজেপির শিবিরে ডাক পেলে আমি কেন বাদ? বোলপুরে সম্প্রতি বাইক র‍্যালি করছেন সুকান্ত মজুমদার। অনুপম বোলপুরের ছেলে। নিজের শহরে দলের কর্মসূচিতেও ডাক না পাওয়ায় তার ক্ষোভ আরও বেড়েছে। ক্ষেপে গিয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতিকে সংগঠন পরিচালনায় অযোগ্য, ব্যক্তিত্বহীন, দো আঁশলা বলে সংবাদ মাধ্যমের সামনে কটাক্ষ করেন অনুপম হাজরা। এই যদি দলের সর্বভারতীয় সম্পাদকের ভাষা হয় রাজ্যসভাপতির সম্পর্কে, তবে গুচ্ছের টাকা খরচ করে অভিজাত বৈদিক ভিলেজে শিবির করে লাভ কী?

Photo credit- West Bengal BJP FB page.


Leave a Reply

Your email address will not be published.