রাধাষ্টমীর তাৎপর্যঃ শস্ত্রধারী থেকে বংশীধারী, লড়াই থেকে আশ্রয়, শান্তি, স্থিতি


আজ রাধাষ্টমী। বংশীধারীর মতোই শ্রীরাধিকার বাস‌ও আমাদের হৃদপদ্মে। অনাদি, অনন্ত, আদ্যা এবং নিত্যা শক্তি শ্রীরাধিকাকে ভাষায় যতটুকু প্রকাশ করা সম্ভব, করলেন ঋতুপর্ণা কোলে-

Make love not war. বাংলা শক্তিবাদের দেশ। শক্তি অনাদি অনন্ত, আদ্যা নিত্যা। সৃষ্টিতত্ত্বকে অবলম্বন করে কল্পিত হন আদি দেবী। এই আদি দেবীর দর্শন, তত্ত্ব ও ইতিহাস পৃথিবীর সবপ্রান্তে পাওয়া গেলেও তা পূর্ণ মহিমায় আজও টিঁকে আছে ভারতভূমিতেই। আরও স্পষ্ট করে বললে বৃহৎবঙ্গেই আদিমাতা তাঁর দাপট আজও একইভাবে বজায় রেখেছেন। কালের প্রকোপে অন্য সব জায়গার মতো বাংলার বুকে আগ্রাসন নেমে এসেছে বারবার। কিন্তু অন্য জায়গার মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি মাতৃকা ধর্ম। কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো আপোষ করে আবার কখনো ভালোবাসা দিয়ে শাক্ত ধর্মের পতাকা উড্ডীয়ান থেকেছে। চামুণ্ডার রূপ কল্পনার দিকে বা কালীর আদিরূপের দিকে যদি তাকানো যায় সেখানে ভীতি প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে হঠে। মঙ্গলকাব্যের আদিপর্বের মনসা কিংবা চণ্ডীর গল্পগাথার মধ্যেও সেই ভয় দেখিয়ে ভক্তি আদায়ের কাহিনিই বারবার উঠে আসে। এই ভীতি প্রদর্শনের জায়গায় কোনো আপোষ থাকে না। অপর কাউকে স্থান দেওয়া হয় না। বরং অন্যের স্থানকে টলিয়ে দেবার প্রয়াস লক্ষ করার মতো। চামুণ্ডার মূর্তিই প্রমাণ করে তিনিই শেষকথা। লড়াই-এর ময়দানেও কাউকে রাখেন না, তাঁর কাছে সবই শব। মা কালীর পায়ের তলায় শবরূপী শিব কিংবা মনসামঙ্গলে শিব উপাসক চাঁদ বণিক বাধ্য হচ্ছে তাঁর আরাধ্য শিবকে সরিয়ে মনসার পুজো করতে। ভারত তথা বাংলায় যত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন হয়েছে সেখানে আদি স্তরে কোনো পুরুষ দেবতার অস্তিত্ব ছিলো না। জগদকারণ জগতপ্রসবিনী আদিমাতাই পূজিত হতেন। ধীরে ধীরে যখন আগ্রাসন শুরু হলো, প্রস্তুত হলো লড়াইয়ের ময়দান। আগ্রাসন শুরুর সময়কাল সঠিকভাবে নির্ণয় সম্ভব না হলেও তা পরিণত হরপ্পা সভ্যতার অবসানযুগেই শুরু হয়ে গেছিলো। আর্য আগমন তত্ত্ব একেবারেই খারিজ করে দেওয়া যায় না। কালের বিচারে আগ্রাসনের শুরুও তখন থেকেই এবং প্রাচীন বাংলায় তার কিছু পর থেকে। কিন্তু সেই আগ্রাসনকে বুঝে উঠতে এবং তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো বোধ জাগ্রত হতে সময় লেগে যায় কয়েকশ বছর।

চামুণ্ডা নামক দেবীর নথিবদ্ধ উল্লেখ ষষ্ঠ শতকে গৌড়ের উত্থানের সমসাময়িক দেবীমাহাত্ম্য শ্রীশ্রীচণ্ডীতে পাওয়া যায়। গৌড়ের উত্থান, তন্ত্রের জয়যাত্রা, শক্তিধর্মের বিপুল প্লাবন – এ সবেরই উৎসমুখ হল এই ষষ্ঠ শতকের শ্রীশ্রীচণ্ডী। মধ্যযুগের বাংলায় ইসলামের প্রসারের ইতিহাস বিষয়ে রিচার্ড ইটন-কৃত আলোচনা থেকে ধার করে বললে মাতৃধর্মের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের একটা ধাঁচ আছে। প্রথমে হয় স্থান ভিক্ষা, তারপরে স্তরে সমানাধিকার আর তারপরের স্তরে কোনও পুরুষ দেবতা (আল্লা ঈশ্বর গড)-র নিজেকে সুপ্রিম পাওয়ার বলে ঘোষণা করা। তৃতীয় স্তরের কাছে এসে পৃথিবীর সর্বত্র মাতৃকা ধর্ম নতিস্বীকার করেছে একমাত্র ভারতভূমি তার ব্যতিক্রম। এখানে মাতৃধর্ম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, দুপক্ষই আপোষ করেছে। বাংলার প্রেক্ষিতে পালযুগকে বলা যায় প্রতিরোধের কাল। এই যুগে ভয়ানক মাতৃমূর্তি যা পাওয়া গেছে তা পালযুগপূর্ববর্তী বাংলায় সেভাবে পাওয়া যায় না, যদিও হরপ্পা সভ্যতার অন্তর্গত ঝোব উপত্যকায় ভয়াল মাতৃমূর্তি পাওয়া যায়, কাজেই উপমহাদেশে ভয়াল মৃত্যুদায়িনী/মোক্ষদায়িনী মাতৃকার প্রাচীন ঐতিহ্য আছে। কিন্তু খ্রীষ্টপূর্ব দুই থেকে আড়াই হাজার বছর আগেকার চন্দ্রকেতুগড়ে গঙ্গারিডাই সভ্যতার কোনো মাতৃকামূর্তিই এত ভয়ানকরূপে পাওয়া যায়নি। তবে চন্দ্রকেতুগড়ের খনন একেবারেই অনিয়মিত, এবং প্রত্নবস্তুও বিদেশে পাচার হয়েছে, কাজেই সেখানে কি ছিল আর কি ছিল না, সে সম্পর্কে শেষ কথা কেউ বলতে পারে না।

এবার আসা যাক আপোষ প্রসঙ্গে। চামুণ্ডা মূর্তি দেখে এটা স্পষ্ট যে ইনি কোনো আপোষের ধার ধারেননি। কিন্তু এর পাশাপাশি শাক্তধর্মকে বিধ্বস্ত করে পুরুষ দেবতার সুপ্রিম পাওয়ারের প্রকাশ ঘটানোর প্রয়াস অনবরত দেখা যায়। যে বাংলায় মাতৃকা মূর্তিই প্রধান ছিল সেখানে গুপ্ত থেকে পাল যুগে প্রাপ্ত বৈষ্ণব মূর্তিতে দেখা যাচ্ছে পুরুষ দেবতার পদাশ্রিত হয়ে থাকছেন শক্তি। বিষ্ণুর পাদদেশে লক্ষ্মী সরস্বতী আবার নারায়ণের পদসেবায় রত লক্ষ্মী। আপোষ হয়েছে সমানাধিকারের মধ্যে দিয়ে। গুপ্ত পরবর্তী যুগের হরগৌরীর মতো পাশাপাশি অবস্থান করা নারী পুরুষ বা অর্ধনারীশ্বর মূর্তি বেশি পরিমানে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাঙালির মাতৃকা উপাসনা শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম পাওয়ার হয়ে ওঠার যে আগ্রাসন তার বিরুদ্ধে লড়াই করে সমানাধিকারের মধ্যে দিয়ে এক আপোষ করে। হরপ্পা পরবর্তী ভারতে, বৈদিক ও পৌরাণিক যুগে মাতৃকাগণ গৌণ হয়ে পড়েন। কারো স্ত্রী, কারো কন্যা, কারো মাতা। কিন্তু গৌণ, ক্ষুদ্র, সেকেন্ডারি। পুরুষ দেবতাদের শক্তি রূপেই পরিচয়। সেখানে দাঁড়িয়ে সমানাধিকার একটা বিপ্লব বই কি। এবং এভাবেই বাংলা তথা ভারতভূমিতে টিকে যায় মাতৃকা উপাসনা।

জ্যোতিষশাস্ত্র বিচারে রাধা নামটি খৃষ্টপূর্ব যুগের। রাধা নামের উল্লেখ এক নক্ষত্র হিসাবে পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে রচিত রাধা কৃষ্ণের প্রেমের কাহিনিতে রাধার স্বামী হিসাবে যে আয়ান ঘোষ নাম পাওয়া যায় তা নক্ষত্রের যাত্রাপথ যাকে বলা হয় অয়ন সেই স্মৃতিকেই বহন করে। কৃষ্ণের সঙ্গে গোপ কন্যাদের প্রেমের গল্প ভারতের নানা প্রদেশে লোকমুখে প্রচলিত ছিল বহুকাল থেকেই। কিন্তু শ্রীরাধিকার গোপীশ্রেষ্ঠ হয়ে ওঠার কাহিনি পালযুগের শেষের দিকেই সুত্রপাত। ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীরাধিকার জন্মদিবস সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায় পদ্মপুরাণে। যার লেখা শুরু হয় চতুর্থ শতকে আর শেষ হয় পঞ্চদশ শতক নাগাদ। রাধার কাহিনি অনুমান করা হয় পালযুগের শেষের দিকেই সংযুক্ত হয়েছে। এই পদ্মপুরাণ অনুসারে বলা হয় যে, “ভাদ্র মাসে সিত পক্ষে অষ্টমী তিথিতে বৃষভানুর যজ্ঞভূমিতে দিবাভাগে এই রাধিকা জাতা হইয়াছিল”।

প্রেমের মাধ্যমে শাক্তধর্মের আপোষকে একটি স্নিগ্ধ আবেশ দেওয়া হল রাধা কৃষ্ণের রূপকল্পে।

আদি পৃথিবীর মাতৃধর্ম সর্বত্র বিলুপ্ত। লৌহযুগ পরবর্তী পৃথিবীতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নেমে আসে, সেখানে তার মধ্যেও ভারতে বিশেষ করে বাংলায় শাক্তধর্ম অনবরত যুদ্ধ করেই অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। কিন্তু প্রেমের মাধ্যমে শাক্তধর্মের আপোষকে একটি স্নিগ্ধ আবেশ দেওয়া হল রাধা কৃষ্ণের রূপকল্পে। বলা দরকার শশাঙ্কযুগে শিব ও নীলাবতীর বিবাহ পরিকল্পনায় সেই একই আবেশ ছিল। সেই প্রেমেরই প্রতিমূর্তি হিসাবে বাংলার মাটিতে অনিবার্য আগমন ঘটলো রাধার। সেন যুগের কিছু আগে, পাল যুগের শেষের দিকে। হাল সঙ্কলিত ‘গাথাসপ্তশতী’-তে প্রথম রাধা নামের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। পালযুগে রাধা কৃষ্ণের প্রেমের সুমিষ্ট গান প্রচলিত ছিল, যার স্মৃতি আজও কৃষ্ণ ধামালী ধরনের পালাগানে বহমান। সেযুগের প্রাকৃত ভাষায় গীতগোবিন্দের অস্তিত্ব ছিল, যা জয়দেবের লেখনীতে সংস্কৃত ভাষায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। সেই রাধিকার আজ জন্মতিথি। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে রাধিকার জন্ম বলে মনে করা হয়। তন্ত্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ রাধাতত্ত্ব, তাতে শক্তিরূপিনী শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। আজকের দিনে তিনি শ্রীকৃষ্ণের লীলা সঙ্গিনী হিসাবে ধরাধামে অবতীর্ণ হন। পুরাণ ও নানা গল্পগাথা অনুসারে স্বয়ং বিষ্ণু যখন কংসকে বধ করার জন্য কৃষ্ণরূপে মর্ত্যে এলেন তখন লক্ষ্মী এলেন রাধার রূপ ধরে। তিনি অনেকটা “নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধু” হিসাবে। কারণ শক্তি সমস্ত প্রকাশের অতীত। শক্তি অব্যক্ত, তাই শ্রীরাধাও বাক্য ও মনের অগোচর, অনির্বচনীয়। শক্তির পদাশ্রিত শক্তিমান, জয়দেবের কাব্যে “দেহি পদপল্লবমুদারম” শ্লোকে প্রকাশিত।

যুদ্ধ ও আপোষ হয়ত ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু তাতে প্রেম থাকে না। আর প্রেমহীনতা সুন্দর হতে পারে না তা বাঙালির কবি জয়দেব অনুধাবন করেছিলেন। বাংলার দেব দেবীরা যে যে সকল সম্পর্কের আশ্রয়ে একে অন্যের সঙ্গে আপোষ করেছিলেন শ্রীরাধিকা সেই সকল সম্পর্ককে দূরে ঠেলে কেবল প্রেমকে আশ্রয় করে জন্ম দিলেন এক নামহীন সম্পর্কের। শক্তি ও শক্তিমানের সেই অনির্বচনীয় সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ভাবের জোয়ারে প্লাবিত হল বাঙালি, রসতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্ব এক হয়ে গেল শ্রীরাধার নামে। জয় রাধে।

  • লেখক পরিচিতি-ঋতুপর্ণা কোলে। পিএইচডি গবেষক, বাংলা বিভাগ, অসম বিশ্ববিদ্যালয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published.