মমতার মন্ত্রিসভায় রদবদল: এবার সরকারেও প্রভাব বাড়ল অভিষেকের


ফিরহাদ হাকিমের গুরুত্ব কমল মন্ত্রিসভায়। অভিষেক ঘনিষ্ঠ তিন নবাগত বাবুল সুপ্রিয়, স্নেহাশিস চক্রবর্তী ও পার্থ ভৌমিক পূর্ণমন্ত্রী।

ডেস্ক রিপোর্ট :নিয়োগ দুর্নীতিতে ফেঁসে গিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায় ইডি হেফাজতে যেতেই রাজ্য মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নতুন করে গঠনের জন্য তৃণমূলের ভেতরে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্ত্রিসভা না ভাঙলেও রদবদলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।‌ মমতা এই রদবদলকে ‘ছোট’ বলে দাবি করলেও রাজনৈতিক গুরুত্ব বিচারে তা যে নেহাতই ছোট নয় সেই পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার সন্ধ্যায় নতুন আট মন্ত্রীর শপথ ও দফতর বন্টনের পর বোঝা যাচ্ছে এবার রাজ্য মন্ত্রিসভাতে‌ও অভিষেকের ছায়া জোরালো হল।

ফিরহাদের গুরুত্ব হ্রাস! 

মমতার মন্ত্রিসভায় নতুন এলেন বাবুল‌ সুপ্রিয়, উদয়ন গুহ, স্নেহাশিস চক্রবর্তী, পার্থ ভৌমিক, প্রদীপ মজুমদার, তাজমুল হোসেন, বিপ্লব রায়চৌধুরী এবং সত্যজিৎ বর্মণ। মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়লেন‌ শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী পরেশ‌ অধিকারী, হুমায়ুন কবীর, সৌমেন মহাপাত্র এবং রত্না দে নাগ। নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত পরেশের ছাঁটাই অবধারিত ছিল। রদবদলে মন্ত্রিসভায় যাঁর গুরুত্ব হ্রাস বিশেষ ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল, তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ আস্থাভাজন ‌ফিরহাদ হাকিম। পরিবহণ ও আবাসন ফিরহাদের হাতছাড়া হল। এখন হাকিমের হাতে র‌ইল কেবল পুর ও নগরোন্নয়ন। পরিবহণের দায়িত্ব পেলেন ক্যাবিনেটে নবাগত স্নেহাশিস চক্রবর্তী। আবাসনের অতিরিক্ত দায়িত্ব বর্তালো অরূপ বিশ্বাসের ওপর। দীর্ঘদিন ধরেই ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে অভিষেকের ঠান্ডা লড়াই অব্যাহত। শোনা যায়, ফিরহাদের কলকাতার মেয়র হ‌ওয়ার পথেও কাঁটা বিছিয়ে ছিলেন অভিষেক। কিন্তু সে’বার মমতার হস্তক্ষেপে ববির ফাঁড়া কাটে। মন্ত্রিসভায় গুরুত্ব যে কমবে এমন ইঙ্গিত আগেই পেয়েছিলেন করাও মেয়র। বুধবার রাজভবনে নতুন মন্ত্রীদের ‌শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে ফিরহাদের মুখে হাসি থাকলেও মনের ভেতরে কী তোলপাড় চলছে কে জানে!

মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন বাবুল সুপ্রিয় ও উদয়ন গুহ সহ অন্যান্যরা।

বরাত খুলল বাবুলের

এই মুহুর্তে তৃণমূলের ভেতরে অভিষেক ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বাবুল সুপ্রিয় অন্যতম। বাবুলকে অভিষেক কলকাতার মেয়র করতে চেয়েছিলেন বলেন জানা যায়। কিন্তু মমতার ইচ্ছেয় সেই পদ যায় ববির হেফাজতে। তবে বালিগঞ্জ উপনির্বাচনে জিতে বাবুল সুপ্রিয় বিধানসভায় যাওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক মহল ধরে নিয়েছিল- রাজ্য মন্ত্রিসভায় একটা দফতর লাভ বাবুলের জন্য শুধু সময়ের অপেক্ষা। তথ্য ও প্রযুক্তি এবং পর্যটন দফতরের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন বাবুল। তথ্য ও প্রযুক্তি ছিল পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। পার্থ কান্ডের জেরে তৃণমূলের ভেতরে প্রবল ঝাঁকুনি না লাগলে মমতা এত তড়িঘড়ি মন্ত্রিসভায় রদবদল করতেন বলে মনে হয় না। রদবদল করলেও বাবুলের বরাতে জোড়া দফতর জুটতো কিনা সন্দেহ।

শোভনদেব-শশীর গুরুত্ব বাড়ল

মমতার মন্ত্রিসভায় পার্থ‌ চট্টোপাধ্যায়ের গুরুত্ব ছিল মুখ্যমন্ত্রীর ঠিক পরেই। পার্থের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পরিষদীয় দফতর গেল তৃণমূলের অন্যতম প্রবীণ মুখ শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। এখন থেকে কৃষির পাশাপাশি পরিষদীয় দফতর‌ও সামলাবেন  অভিজ্ঞ শোভনদেব। পরিষদীয় ও তথ্য-প্রযুক্তির পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্য‌ও সামলাতেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়। শিল্প ও বাণিজ্য গেল শশী পাঁজার হাতে। এখন থেকে নারী ও শিশুকল্যাণের পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্য‌ও সামলাবেন শশী। রাজ্য মন্ত্রিসভায় নিঃসন্দেহে শোভনদেব ও শশী পাঁজার গুরুত্ব বাড়ল। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় মমতার দুঃসময়ের সাথীদের একজন। তবে ইদানিং শশীর ঘোরাঘুরি অভিষেক শিবিরে বলেই জানা যাচ্ছে।

মলয়ের মন্ত্রীত্ব বাঁচলেও ডানা ছাঁটা হল

মন্ত্রিসভা থেকে ছাঁটাই হ‌‌ওয়াদের তালিকায় মলয় ঘটকের‌ও নাম থাকতে পারে বলে গত কয়েকদিন ধরে মিডিয়ায় জোর জল্পনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীত্ব ধরে রাখতে পারলেও ক্যাবিনেটে গুরুত্ব কমল মলয় ঘটকের। মলয়ের হাত থেকে পূর্ত দফতর কেড়ে নিয়ে দেওয়া হয়েছে পুলক রায়ের হাতে। শুধুমাত্র আইন ও শ্রম থাকল মলয়ের কাছে। মনে রাখতে হবে, কয়লা পাচার কেলেঙ্কারিতে মলয় ঘটকের ভূমিকা ইডি-সিবিআইয়ের স্ক্যানারে। ইতিমধ্যেই চারবার ইডি-র হাজিরা এড়িয়েছেন মলয় ঘটক। যে কোনও মুহুর্তে ইডি মলয়ের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ করতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।

অবশেষে উদয়নের স্বপ্ন পূরণ

উত্তরবঙ্গ থেকে উদয়ন গুহ মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন বলে পূর্বাভাস ছিল‌ই। প্রত্যাশা মতোই মমতার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন দিনহাটার বিধায়ক। উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের দায়িত্ব পেলেন উদয়ন গুহ। ২০১৬ সালে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরেই ফর‌ওয়ার্ড ব্লক ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন উদয়ন গুহ। উদয়নের বাবা প্রয়াত কমল গুহ ছিলেন বামফ্রন্ট জামানার একজন হেভিওয়েট মন্ত্রী। তৃণমূলে যোগদানের পর মন্ত্রী হ‌ওয়ার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে‌ হল কমলপুত্রকে। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে নিশীথ অধিকারীর কাছে অতি সামান্য ব্যবধানে হারলেও উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে দিনহাটা পুনুরুদ্ধার করেন উদয়ন গুহ। মন্ত্রিসভা থেকে পরেশ অধিকারীর বিদায়ের পর উদয়নের মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তি ছিল এক প্রকার নিশ্চিত। অবশেষে মন্ত্রী হ‌ওয়ার স্বপ্ন পূরণ হল উদয়ন গুহের।

পূর্ণমন্ত্রী অভিষেক অনুগত আরও দুই বিধায়ক

মন্ত্রিসভায় নবাগত হুগলির জাঙ্গিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল বিধায়ক স্নেহাশিস চক্রবর্তী পেয়েছেন পরিবহণ দফতরের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব। ফিরহাদ হাকিমের কাছ থেকে পরিবহণ গেল স্নেহাশিসের হাতে। আরেক নবাগত নৈহাটির বিধায়ক পার্থ ভৌমিক পেয়েছেন সেচ ও জলপথ দফতরের পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব। এতদিন সৌমেন মহাপাত্র এই দায়িত্ব পালন করতেন। সৌমেনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্নেহাশিস ও পার্থ উভয়েই অভিষেকের আস্থাভাজন বলে জানা গেছে। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের পূর্ণমন্ত্রী হলেন ক্যাবিনেটের আরেক নবাগত সদস্য প্রদীপ মজুমদার। দুর্গাপুর পশ্চিমের বিধায়ক প্রদীপ এতদিন কৃষি দফতরের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন। উত্তর দিনাজপুর জেলার হেমতাবাদের বিধায়ক সত্যজিৎ বর্মণ পেয়েছেন শিক্ষা দফতরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। মন্ত্রিসভা থেকে পরেশ অধিকারীর অপসারণে এই দায়িত্ব পেলেন সত্যজিৎ।

মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের সঙ্গে রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রী।

দেখা যাচ্ছে মন্ত্রিসভায় রদবদলে সবথেকে লাভবান অভিষেক ঘনিষ্ঠ বাবুল সুপ্রিয়। পাশাপাশি অভিষেক ঘনিষ্ঠ আরও দুই বিধায়ক পার্থ ভৌমিক ও স্নেহাশিস চক্রবর্তী। মমতার মন্ত্রিসভার সবথেকে হেভিওয়েট সদস্যদের সবথেকে বড়  ক্ষতি নিঃসন্দেহে ফিরহাদ হাকিমের।

Photo Credit- Official FB page of Mamata Banerjee. Feature image is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published.