জল্পেশগামী পুণ্যার্থীদের কী মর্মান্তিক পরিণতি! আর কখনও অসাবধানতা নয়


শ্রাবণ মাস জুড়েই উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রাচীন শৈবতীর্থ জল্পেশ্বর শিবমন্দির থাকে জমজমাট। বিশেষ করে প্রতি রবিবার মধ্যরাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত জল্পেশ মন্দির চত্বর হয়ে ওঠে লোকে লোকারণ্য। কোনও কোনও দিন লক্ষাধিক পুণ্যার্থী মন্দিরে পুজো দেন, শিবের মাথায় জল ঢালেন। রবিবার রাতে জল্পেশগামী পুণ্যার্থীদের একটি দলের ওপর যে মর্মান্তিক ও ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল, তাতে আমরা সবাই শোকে-দুঃখে স্তম্ভিত! যাত্রাপথে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে ১০টা তাজা প্রাণ চলে গেল। মৃতেরা সকলেই কোচবিহার জেলার শীতলখুচি গ্রামের বাচ্চা বাচ্চা ছেলে।‌ বয়স মাত্র ১৬ থেকে ১৮-র মধ্যে। আর‌ও ষোলটি ছেলে আহত। তবে তারা বিপন্মুক্ত বলে জানা গেছে।

মহেশ্বর শিব আশুতোষ। তিনি অল্পেই তুষ্ট হয়ে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ১০টি কিশোর-সদ্যযুবার অকাল মৃত্যুতে সবাই শোকাহত। মৃতদের প্রিয়জন-স্বজন, ভক্তজনেরা কপাল চাপড়ে বলছেন, দয়াল ভগবান, এ তোমার কেমন বিচার প্রভু! তোমার ঘরে, তোমার ধামে যাওয়ার পথেই ছেলেগুলোকে এ ভাবে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিতে‌ পারলে? জল্পেশ‌ মন্দিরকে কেন্দ্র করে বছরে দু’বার যুগ যুগ ধরেই উৎসবে মেতে ওঠেন মানুষ। কিন্তু অতীতে কখনও এমন হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায় না।

কীভাবে চ্যাংড়াবান্ধায় ধরলা নদীর সেতু পেরোনোর সময় এমন‌ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল? যা জানা যাচ্ছে, একটি পিক আপ ভ্যানে চড়ে শীতলখুচি থেকে ৩৬ জন ছেলে যাচ্ছিল জল্পেশে শিবের মাথায় ‌জল‌ ঢালার উদ্দেশ্যে। পিক আপ ভ্যানে বাজছিল প্রবল শব্দে ডিজের মিউজিক। তার তালে তালে নাচছিল সবাই। ডিজে চলছিল পিক আপ ভ্যানটিতে সেট করা একটি শক্তিশালী জেনারেটরের সাহায্যে। জেনারেটর থেকে যে কোনও ভাবেই হোক শর্ট সার্কিট হয়ে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয় যাত্রীরা। পিক আপ ভ্যানের ধাতব বডি কারেন্ট হয়ে যাওয়ায় সকল পুণ্যার্থীই তড়িদাহত হন বলে পুলিশের অনুমান। রবিবার সন্ধ্যা থেকেই বৃষ্টি চলছিল। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ভক্তেরা র‌ওনা দিয়েছিল পুণ্যার্জনে। জেনারেটরের ওপর বৃষ্টির জল পড়তে থাকায় তা শর্ট সার্কিটের কারণ হতে পারে বলে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছে পুলিশ।

বৃষ্টির মধ্যে পিক আপ ভ্যানে জেনারেটর রাখার আগে পুণ্যার্থীদের ভাবা উচিত ছিল। জেনারেটর সঙ্গে নিয়ে গেলেও তা কীভাবে সুরক্ষিত ও ঝুঁকি মুক্ত রাখা যায়, বিবেচনা করা উচিত ছিল। দলে অভিজ্ঞ ও দায়িত্ববান এমন কেউ হয়তো ছিল না যে সবাইকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে‌ই এমন ভুল হয়। ভাবের আতিশয্যে হুঁশ থাকে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর‌ও বিষয়গুলি চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু বিপদ তো‌ বলে-কয়ে আসে না। অসাবধানতার সুযোগে হঠাৎ বড় কোনও বিপর্যয় ঘটে যায়। জল্পেশগামী পুণ্যার্থীদের একটা বড় অংশ‌ই অল্পবয়সী। অনেকের মধ্যেই ভক্তির চেয়ে বেশি থাকে হুল্লোড়। যাত্রাপথে পুণ্যার্থী দলের বিসদৃশ আচরণ মানুষের হামেশাই চোখে পড়ে। একটা কথা মনে রাখতে হবে- ভগবান‌ ভক্তের কাছ‌ থেকে নির্মল ভক্তি, হৃদয়ের ভালবাসা চান। বেপরোয়া উচ্ছৃঙ্খলতা কিম্বা ভাবের ঘোরে অসাবধানতা নয়। অসাবধানীকে, বেপরোয়াকে ভগবান‌ও বোধ হয় রক্ষা করেন না। ভবিষ্যতে আর কখনও যাতে জল্পেশগামী পুণ্যার্থীদের এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে না হয় তা দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের। যাঁরা বাবার মাথায় জল ঢালতে যাবেন তাঁদের নিজেদের‌ও বিপদ থেকে সাবধান থাকতে হবে।

Feature image source- Reporter.


Leave a Reply

Your email address will not be published.