কী কথা তাঁহার সাথে?


মোদী-মমতা দীর্ঘ বাতচিতের পর মোদীর মন কি বাত‘ নিয়ে বড়‌ই ধন্ধে আছেন বঙ্গ বিজেপির নেতারা। লিখলেন নির্বাণ রায়-

তাঁরা ৪৫ মিনিট একান্তে কথা বলেছেন। তাঁরা- অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের এমন আলাপ বিরল নয়। কিন্তু সাক্ষাৎ যখন মোদীর সঙ্গে মমতার তখন রাজনৈতিক মহলে চর্চা তো খানিক হবেই। মাঝে ছোট্ট টেবিলে হলুদ গোলাপগুচ্ছ। দুই পাশে মমতা ও মোদী মুখোমুখি বসে আলোচনায় মগ্ন- এমন ছবি প্রধানমন্ত্রীর ট্যুইটার-ফেসবুক থেকে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়েছে। কিন্তু দোঁহে কথা কী হ‌ইল- এই নিয়েই সবার কৌতূহল।

অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই এস জগনমোহন রেড্ডি, তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক এমনকি তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর একান্ত আলাপের ছবি বেরোয়। কিন্তু সে’সব নিয়ে রাজনৈতিক মহলের তেমন আগ্রহ থাকে না। কিন্তু দিদির ব্যাপার‌ই আলাদা। এই সেদিনও সবার মনে হচ্ছিল, চব্বিশে মোদীকে দিল্লির মসনদ থেকে না তাড়িয়ে ঘুমোতে যাবেন না মমতা। রাজধানীতে তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বছরে কতবার‌ই যান। এর আগে যতবার গিয়েছেন, ক’বার মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো? মোদীর নাম শুনলেই গরম তেলে বেগুন পড়ার মতো ছ্যাৎ করে উঠতেন নয় কি মমতা? এই যাত্রায় চারদিন দিল্লিতে থাকবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। চারদিনে নাকি তিনবার মোদীর মুখোমুখি হবেন মমতা! একবার একান্ত সাক্ষাৎ হয়ে গিয়েছে শুক্রবার বিকেলে। সেটির মেয়াদ ছিল ৪৫ মিনিট। দ্বিতীয়বার শনিতে দোঁহে মুখোমুখি হয়েছেন ‘আজাদি কা অম্রুত মহোৎসব’ কর্মসূচিতে। তৃতীয়বার‌ রবিতে মমতা-মোদী দেখাসাক্ষাৎ হবে নীতি আয়োগের বৈঠকে। রাজধানীর সাংবাদিক মহল মনে করতে পারছে না, আগে কখনও মমতা-মোদীতে এমন যোগ ঘটেছে কিনা! রাজনৈতিক মহল‌ও তাজ্জব।

প্রধানমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে যোগ না দেওয়ার ব্যাপারে রেকর্ড করে ফেলেছেন দেশের যে মুখ্যমন্ত্রী তিনিই যদি ৪৫ মিনিটের একান্ত সাক্ষাৎ সহ চারদিনে তিনবার প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি হন তবে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন উঠবে না? চারদিনের দিল্লি সফরে মমতা সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। মমতা দেশের রাজধানীতে অথচ রাজধানীর সাংবাদিকদের থেকে দূরে- এটা অতীতে কবে হয়েছিল? এটা কি বিরলের মধ্যে বিরলতম ঘটনার স্বীকৃতি পাবে না? দেশের রাজধানীতে মমতার চারদিনের সফর। অথচ তৃণমূল সুপ্রিমোর তালিকায় কোনও উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। শনিবার উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন। উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদান থেকে বিরত থাকার কথা বহু আগেই ঘোষণা করে দিয়েছে তৃণমূল। মার্গারেট আলভা বিরোধী জোটের প্রার্থী। অনেক কোশিসের পরেও মমতার মন গলাতে ব্যর্থ মার্গারেট। চব্বিশে মোদীকে জবরদস্ত মোকাবিলা দেওয়াই যাঁর প্রধান লক্ষ্য দিল্লি সফরে তাঁর রাজনৈতিক গতিবিধি এমন থমকে গেল কেন?

এটা সত্যি, পাওনাগন্ডা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গের দাবির লিস্ট অনেক লম্বা। এই নিয়ে দেনদরবার করতেই নাকি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়া।‌ তৃণমূল তরফে এমনটাই দাবি। রাজ্যের ভাঁড়ারের অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিরোধিতা দূরে সরিয়ে কেন্দ্রের সঙ্গে বাতচিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে এই প্রথম বাস্তববোধের পরিচয় দিলেন। আর‌ও আগে দিলে তাঁর সরকার ও রাজ্যবাসীর জন্য ভাল হত। কিন্তু মোদীর সঙ্গে মমতার একান্ত বৈঠকের পেছনে আরও কোনও গুহ্য কারণ আছে কি? শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাম-কংগ্রেস শিবির থেকেই নয় এবার মমতা-মোদী বৈঠক নিয়ে তির্যক মন্তব্য ধেয়ে এসেছে বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায়ের দিক থেকেও। মোদীর কাছে সরাসরি ট্যুইট করে তথাগতের চ্যালেঞ্জ- প্রমাণ করুন মমতার সঙ্গে আপনার কোন‌ও সেটিং নেই। ঠোঁটকাটা তথাগত রায় ট্যুইটারে লিখেছেন- ”সেটিং নিয়ে জোর চর্চা চলছে কলকাতায়। এর অর্থ- মোদীজির সঙ্গে মমতার গোপন বোঝাপড়া। এই বোঝাপড়ার জেরে তৃণমূলের চোর অথবা বিজেপি কর্মীদের খুনিরা বেঁচে যাবে। দয়া করে প্রমাণ করুন, এ’রকম কোনও সেটিং নেই।”

আসলে মমতার সঙ্গে মোদীর অর্থাৎ তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক রসায়নটা ঠিক কী, এটা নিয়েই ধন্ধে রাজনৈতিক মহল। মমতার চারদিনের দিল্লি সফর এই ধন্ধটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বাম-কংগ্রেস শিবিরের স্পষ্ট অভিযোগ, দিদি-মোদী সেটিং আছে। মমতা এমন সময় মোদীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করলেন, যখন তাঁর সরকারের শিক্ষা দফতর কলঙ্কের কাদায় গলা পর্যন্ত ডুবে গেছে। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে। যিনি ছিলেন মমতার ক্যাবিনেটের নম্বর টু। আদালতের নির্দেশে এস‌এসসি নিয়োগ ঘোটালার সিবিআই তদন্ত চলছে। ইডির অভিযানে পার্থ কুপোকাত। পার্থর বান্ধবী অর্পিতার বাড়ি থেকে পর পর দুই দফায় নগদ পঞ্চাশ কোটি টাকা উদ্ধারের পর বেগতিক বুঝে নিজের রাজনৈতিক জীবনের দুঃসময়ের সাথীকে দল ও সরকার থেকে তাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তদন্তকারী সংস্থার অনুমান কমপক্ষে একশ কোটি টাকার ঘাপলা হয়েছে নিয়োগ নিয়ে। কার‌ও কার‌ও দাবি- টাকার অঙ্ক হাজার কোটিতে পৌঁছাবে। তদন্ত অবাধ ও আপন গতিতে চললে আরও ক’জন রাঘববোয়াল ইডি-সিবিআইয়ের জালে ওঠে, কে জানে! এহ বাহ্য, কয়লা, গরু এমনকি বালি-পাথর পাচার কান্ডেও তদন্তে নেমেছে ইডি-সিবিআই।

এইসব বিবিধ কারণেই বাম-কংগ্রেস শিবির প্রশ্ন তুলেছে- কী কথা হয়েছে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে? সংবাদ মাধ্যমে জল্পনা, কী কথা হয়েছে মোদী-মমতায়? সামাজিক মাধ্যমে চর্চা- কী কথা হয়েছে নিভৃতে দু’জনে? মজার ঘটনা হল, মোদী-মমতা বৈঠক নিয়ে সবথেকে বেশি আতান্তরে যদি কেউ পড়ে থাকে তবে তা মোদীর নিজের দল- ভাজপা। ভাজপার পশ্চিমবঙ্গ শাখা। মোদী-মমতা দীর্ঘ বাতচিতের পর মোদীর ‘মন কি বাত’ নিয়ে বড়‌ই ধন্ধে আছেন সুকান্ত মজুমদার-শুভেন্দু অধিকারীরা।

Photo Credit- Official FB page of PM Modi.


Leave a Reply

Your email address will not be published.