কুণাল চুপ করিয়াও হ‌ইলেন না চুপ! কুণালের মনের কথা কে বুঝিতে পারে


‘সেন্সর্ড’ কুণাল যে গুগলিটি ছুঁড়লেন সেটি কাদের স্ট্যাম্প লক্ষ্য করে? বিশেষ প্রতিবেদনে রইল আরও অনেক প্রসঙ্গ-

কুণাল ঘোষের মুখে লাগাম পড়াল তৃণমূল। কুণাল এক‌ই সঙ্গে তৃণমূলের মুখপাত্র ও রাজ্য তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক। শুক্রবার পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ হতেই স্বভাবসিদ্ধ বাচনভঙ্গিতে পার্থকে ধুইয়ে ছাড়েন কুণাল। পার্থের প্রতি কুণালের উষ্মা নতুন নয়। শুধু পার্থ চট্টোপাধ্যায় কেন তৃণমূলের আর কার কার প্রতি ঝানু সাংবাদিক কুণাল ঘোষের মনের গভীরে ক্ষোভ ও ক্রোধ লুকিয়ে আছে, এই নিয়ে মহা আতান্তরে মনে হয় গোটা তৃণমূল দলটাই। ইডি-র হাতে গ্রেফতার হ‌ওয়ার পর থেকেই পার্থকে বাক্যবাণে জর্জরিত করছেন কুণাল। তখনও পার্থর ওপর থেকে দল ও সরকারের ছায়া সরে যায় নি। কিন্তু তাতে কুণালকে ‘দাবায়া’ রাখা যায় নি। এখন পার্থর আম ও ছালা দুই-ই আপাতত গেছে কিন্তু শুক্রবার পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রেসিডেন্সি জেলের ফটক পেরোনোর আগেই কুণাল যে ভাষায় প্রাক্তন সতীর্থকে আপ্যায়ন করেছেন, তাতে দলের মুখপাত্রের মুখ খোলা রাখার আর ঝুঁকি নেন নি তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব।

কুণালরে দাবায়া রাখা যাবে?

কিন্তু কুণাল ঘোষকে কি এইভাবে ‘দাবায়া’ রাখা সম্ভব? শুক্রবার কুণাল জমিয়ে পার্থকে ধোলাই করলেন। শনিবার‌ই কুণালকে সেন্সর করল দল। রবিবার কুণাল দলের বাধ্যছেলে হয়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজিরা দিলেন বটে কিন্তু পকেট থেকে বোরোলিনের টিউব বের করে যে গুগলিটি ঝানু কুণাল ঝাড়লেন, তা নিয়েই দিনভর চর্চা চলল রাজনৈতিক মহলে। শুক্রবার পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ইডি হেফাজতের মেয়াদ শেষ হয়। জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়ে দু’জনকেই ১৪ দিনের জেল হেফাজতে পাঠায় আদালত। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের জেল হেফাজতের নির্দেশ হয়েছে- এই সংবাদ শ্রবণ করা মাত্রই সাংবাদিকদের কুণাল ঘোষ বলেন- “পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে ঢুকে দেখুন, কেমন লাগে!” কুণাল আরও বলেন-“আমি মাথা উঁচু করে বলছি, আমি কোনও অপরাধ করি নি। আশা করব, আমি যেমন নাগরিক হিসেবে বন্দিজীবনের প্রত্যেকটি নিয়ম মেনেছি, পার্থের ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম প্রযোজ্য হোক। কারা দফতর যেন সে রকমই করে। তাঁকে কোন‌ও জেল হাসপাতালে নয়, সেলে রাখতে হবে। আমাকেও সেলে রাখা হয়েছিল। আমার সঙ্গে তখন থেকে বহু কর্মী ও বন্দির যোগাযোগ রয়েছে। আমি খবর পাব।” তৃণমূল মুখপাত্র ও রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের চেয়ারে বসে এই মন্তব্য করার পরেও কুণালের দাবি ছিল- দলের মুখপাত্র হিসেবে নয় ব্যক্তিগতভাবেই নিজের মতামত জানাচ্ছেন তিনি। শুক্রবার কুণাল আরও যা বলেছিলেন- “আমার জেল জীবনে আমি যখন বলেছিলাম, চক্রান্ত তখন এই পার্থ এবং আর‌ও কেউ কেউ বলেছিলেন, আমি নাকি পাগল! অপরাধ করিনি বলায় এই পার্থ আমাকে দলবিরোধী বলেছিলেন। অথচ এই পার্থ‌ই তখন থেকে অপা, অমুক-তমুক করে বেড়াচ্ছেন। এখন দেখুন কেমন লাগে।”

কুণালের কথায় রুষ্ট তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা

শুক্রবার মিডিয়ায় কুণাল ঘোষের এই বক্তব্য প্রচারিত হ‌তেই তৃণমূলের অন্দরে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। তৃণমূল থেকে পার্থের নাম কাটা গেলেও এখনও দলে তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখানোর লোক নেহাত কম নয়। খোদ দলনেত্রী‌ও যে পার্থের ওপর ভীষণ রুষ্ট, তেমন প্রমাণ এখনও মেলে নি। দলের প্রবীণেরা এখনও আড়ালে-আবডালে পার্থের জন্য আহা-উঁহু করেন বলে শোনা যায়। দ্বিতীয় দফার তল্লাশিতে অর্পিতার ফ্ল্যাট থেকে ক্যাশ ২৮ কোটি উদ্ধার না হলে এবং অভিষেক চেপে না ধরলে পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে তৃণমূল এভাবে ঝেড়ে ফেলতো না বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। পার্থ সম্পর্কে কুণালের সর্বশেষ মন্তব্য তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা ভালভাবে নেন নি বলেই খবর। তাঁদের চাপেই দ‌ল কুণালের মুখ বন্ধ করার পদক্ষেপ নেয়। মমতা ও অভিষেকের সম্মতি ছাড়া কুণালের উপর এমন শাস্তি নেমে আসতে পারে না বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কুণাল ঘোষকে পার্থ চট্টোপাধ্যায় সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ে মুখে কুলুপ আঁটতে শনিবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কুণাল চুপ করলেন আবার চুপ করলেন‌ও না

রবিবার সাংবাদিকেরা এই নিয়ে প্রশ্ন করলে কুণাল ঘোষ জবাব দেন- “দলের পক্ষ থেকে আমায় জানানো হয়েছে, আমি যেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিষয়ে মুখ না খুলি। আমি দলের কঠিন দিনের সৈনিক। এখন দল যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।‌” কুণাল ঘোষ আরও বলেন- “পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে একটিও শব্দও আর বলব না আমি। দলের মুখপাত্র বা সদস্য হিসেবে নয়, একদম ব্যক্তিগতভাবে আমি মন্তব্য করেছিলাম। কিন্তু আজ একটি শব্দও পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে বলব না। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, ওর সম্বন্ধে আমার কোনও বক্তব্য নেই। পার্থ চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে কোনও উত্তরও দেব না আমি।” এই অব্দি বলে কুণাল ক্ষান্তি দিলে আর বিশেষ জলঘোলা হত না। কিন্তু মানুষটার নাম যখন কুণাল ঘোষ, ঘটনায় তখন ‘টুইস্ট’ তো থাকবেই।‌ এরপরেই পকেট থেকে বোরোলিনের একটি টিউব বের করে এনে কুণাল বলেন- “আর সেই সঙ্গে আমি খুব নিশ্চিতভাবে আগাগোড়া বোরোলিন মেখে চলি। জীবনের ওঠাপড়া আমার গায়ে লাগে না। আমার মন বলছে, তৃণমূলকে আমি ভালবাসি। আমি তৃণমূল করি। কিন্তু আমি বোরোলিন নিয়ে চলি। জীবনের ওঠাপড়া আমার গায়ে লাগে না।”

কাদের দিকে গুগলি দিলেন কুণাল?

কুণালের এই গুগলি নিয়েই এখন গবেষণা চলছে রাজনৈতিক মহলে। কুণাল ঘোষ তৃণমূলের রাজ্য সম্পাদকের পাশাপাশি দলের মুখপাত্র। তিনি বলেন ভাল। কুণালের সমালোচকরাও তাঁর বাচনশৈলীতে মুগ্ধ। চ্যানেলগুলির রাজনৈতিক বিতর্কসভার সান্ধ্য আসরে বহু কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁকে ঝোড়ো ব্যাটিং করে দলকে উতরে দিতে দেখা যায়। নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়ে পার্থ জেলে যাওয়ায় তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে বড়সড় চোট লেগেছে। পার্থের সারা অঙ্গে এখন কলঙ্কের কালি। এই পার্থকে নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত দিতে গিয়ে দলে কোনঠাসা হ‌ওয়ার বিষয়টিকে কুণালের মতো দাপুটে মানুষ যে মন থেকে মেনে নিতে পারেন নি কুণালের ‘বোরোলিন’ গুগলিই তার প্রমাণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বোরোলিনের জনপ্রিয় বিজ্ঞাপণের ভাষাকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে কুণাল কি দলের নেতৃত্বকে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি জীবনে অনেক ঝড়ঝাপ্টা সামলানো পোড়খাওয়া মানুষ, এইসব মামুলি শাসনে তাঁর কিছুই যায়‌আসে না?

দলের অনেক নেতাকেই মাফ করতে পারেন নি কুণাল

সারদা মামলায় শাসকদলের তরফে সবথেকে দীর্ঘ জেলযন্ত্রণা যদি কেউ ভোগ করে থাকেন, তবে তিনি কুণাল ঘোষ ছাড়া আর কেউ নন। সারদা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তদের মধ্যে সুদীপ্ত সেন ও দেবযানী মুখোপাধ্যায়ের পর কুণাল‌কেই সবথেকে বেশি দিন কারাবাসে থাকতে হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৩ নভেম্বর কুণালকে গ্রেফতার করে বিধাননগর কমিশনারেট। ২০১৬-র ৭ অক্টোবর কুণাল জেল থেকে জামিনে মুক্ত হন। সারদা মামলায় জড়িয়ে গিয়ে প্রায় তিন বছর জেলের ঘানি টানতে হয়েছে কুণাল ঘোষকে। কুণালকে গ্রেফতার করা হয়েছিল রাজ্য সরকারের নির্দেশে। সিবিআই-এর হাতে সারদা স্ক্যামের তদন্তভার যাওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায় কুণালের নামে মামলা দিয়েছিল রাজ্য পুলিশ। গ্রেফতার হ‌ওয়ার সময় কুণাল ঘোষ ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ। কুণাল এখনও মনে করেন, দলের শীর্ষ নেতারাই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে সেদিন তাঁকে ‘বলির পাঁঠা’ বানিয়েছিলেন। গ্রেফতার হ‌ওয়ার সাথে সাথেই কুণালকে দল থেকে বহিষ্কার করে তৃণমূল।

কুণালের মনে কী আছে?

জেলযন্ত্রণার তিক্তস্মৃতি কুণাল এখনও ভুলতে পারেন নি। কুণালের দাবি- তিনি নিজের মামলার খরচ নিজেই জুটিয়েছেন এবং মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। জেলে কুণালকে থাকতে হয়েছে সাধারণ কয়েদীদের মতোই। কারাবাস দুর্বিষহ হয়ে ওঠায় প্রেসিডেন্সি জেলে ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করেছিলেন কুণাল ঘোষ। বরাত জোরে বেঁচে গিয়েছেন। যে দল তাঁকে জেলে ঠেলে দিয়ে প্রাণে মারার চক্রান্ত করেছিল বলে কুণালের অভিযোগ, সেই দলে কেন ফিরে গেলেন দুঁদে সাংবাদিক? এই প্রশ্ন অনেকের‌ই। এন‌আর‌এস মেডিকেল কলেজের বিশিষ্ট অধ্যাপকের ছেলে কুণাল বরাবরই বোহেমিয়ান। মিডিয়া জগতের ‘ফুট সোলজার’ থেকে একেবারে ‘টপে’ কুণাল উঠেছিলেন নিজের কলমের জোরেই। কুণাল ঘোষের দাবি- তিনি বিনা অপরাধে সারদা মামলায় জেল খেটেছেন। শুধু পার্থ চট্টোপাধ্যায়‌ই নয় মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী সহ আরও অনেককেই নিজের পরিণতির জন্য দায়ী বলে মনে করেন কুণাল ঘোষ। কেউ কেউ মনে করেন, কুণাল যে ‘রোল প্লে’ করছেন, তার অন্তরালে কুণালের অন্য বড় ‘মিশন’ আছে। কুণালের মনের কথা কে বুঝিতে পারে!

Feature image is representational. Image source- Official Facebook page of Kunal Ghosh.


Leave a Reply

Your email address will not be published.