বিল্ডিং ইমপ্লোশান: গগনচুম্বী বহুতলকে মুহুর্তে মিশিয়ে দেয় মাটিতে - nagariknewz.com

বিল্ডিং ইমপ্লোশান: গগনচুম্বী বহুতলকে মুহুর্তে মিশিয়ে দেয় মাটিতে


বিল্ডিং ইমপ্লোশান পদ্ধতি কীভাবে ধুলোয় মিলিয়ে দেয় আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা- এই নিয়েই ছোট্ট প্রতিবেদন-

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নয়ডার টুইন টাওয়ার রবিবার দুপুরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বেশ দক্ষতার সঙ্গেই। ৩২ ও ২৯ তলার দুটি ইমারত নির্মাণে বিধি মানা হয় নি- এই ছিল অভিযোগ। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর হার মানতে হয় নির্মাণকারী সংস্থাকে। কুতুব মিনারের চেয়েও উঁচু এই দুই যমজ গগনচুম্বী অট্টালিকা ধ্বংসে যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হল তা নিয়ে পরিবেশবিদদের ঘোরতর আপত্তি থাকলেও বিশ্বজুড়ে এটাই বিশাল বিশাল বহুতল, টাওয়ার ধ্বংসের স্বীকৃত ও নিরাপদ পদ্ধতি। চার-পাঁচ তলার ছোট ভবন ধীরেসুস্থে বুলডোজার দিয়ে, শত শত শ্রমিক লাগিয়ে হাতুড়ি পিটিয়ে ভেঙে ফেলা সম্ভব হলেও বিশ-বাইশ তলার বড় অ্যাপার্টমেন্ট মুহুর্তে গুঁড়িয়ে দিতে যে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়, তার নাম ‘এক্সপ্লোসিভ ডিমোলিশন’ বা ‘বিল্ডিং ইমপ্লোশান’।

ডাইনে-বায়ে বা সামনে-পেছনে নয় নিজের ভিত্তি বরাবর ভেঙে পড়ে ইমারত।

পরিকাঠামো নিজের ভিত বরাবর ভেঙে পড়ে

পৃথিবীর ঘন বসতিপূর্ণ মহানগরীগুলিতে উঁচু ইমারত নিরাপদে ধ্বংস করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আশেপাশে থাকে অসংখ্য আর‌ও বহুতল এমনকি একটি ইমারতের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে আর‌ও কয়েকটি ইমারত। এই পরিস্থিতিতে যে ভবনটি ধ্বংস করতে হবে তার আশেপাশে অন্য কোন‌ও ভবনের ক্ষতিসাধন করা চলবে না। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই ভবনটিতে এমনভাবে বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়, যাতে গোটা পরিকাঠামোটি লম্বালম্বি নিজের ভিত বরাবর ভেঙে পড়ে।

ইমারত ধ্বংসের ব্যয়বহুল পদ্ধতি

আধুনিক নগর সভ্যতার আরেক নাম কংক্রিটের জঙ্গল। প্রত্যেক বছর পৃথিবী জুড়ে অনেক অট্টালিকা কারণে-অকারণে ভেঙে ফেলতে হয়। কয়েকশত থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিশাল বিশাল টাওয়ার গুঁড়িয়ে দেওয়ার খরচ‌ও বড় কম নয়। যেমন নয়ডার টুইন টাওয়ার বিস্ফোরক দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে খরচ হয়েছে প্রায় কুড়ি কোটি টাকা। যে পয়েন্টগুলি একটি বহুতল পরিকাঠামোকে ভিত থেকে শীর্ষ পর্যন্ত ধরে রাখে সেইসব সরিয়ে নিলে পরিকাঠামোটি ধ্বসে পড়তে সময় লাগে না। ‘বিল্ডিং ইমপ্লোশান’ পদ্ধতিতে ঠিক এই কাজটিই করা হয়। প্রত্যেকটি সাপোর্ট পয়েন্টে বিস্ফোরক পাতা হয়। বিস্ফোরণের সাথে সাথেই উপরের তল নিচের তলের উপর ভেঙে পড়তে থাকে। পরিকাঠামোর উপরের অংশ যত ভারী হবে ততোধিক শক্তিতে তা নিচের অংশে ভেঙে পড়বে। আসলে বিস্ফোরণ শুধু পরিকাঠামোর সাপোর্ট পয়েন্টগুলিকে স্থানচ্যুত করার কাজটি করে। বিশাল পরিকাঠামোটির ভর‌ই পরিকাঠামোটিকে হুরমুড়িয়ে নিচের দিকে টেনে নামায়।

নয়ডার টুইন টাওয়ার: ধ্বংসর আগে।

সহজ নয় ডিমোলিশন ব্লাস্টারদের কাজ

বড় বড় বহুতল ভবন বিস্ফোরক দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য পৃথিবীতে একাধিক পেশাদারী সংস্থা আছে। নয়ডার যমজ অট্টালিকা ধ্বংস করেছে মুম্বাইয়ের ‘এডিফিস ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে একটি সংস্থা। যদিও তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘জেট ডিমোলিশন’ নামে আরও একটি সংস্থার কাছ থেকে। স্থাপত্য নির্মাণের মতো স্থাপত্য ধ্বংস‌ও একটা ইঞ্জিনিয়ারিং। তাই কোনও বহুতল ‘এক্সপ্লোসিভ ডিমোলিশনের’ আগে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনায় কোন‌ও খুঁত থাকলে ধ্বংসযজ্ঞ সুষ্ঠু হবে না এমনকি বিপর্যয় পর্যন্ত ঘটতে পারে। ‘ডিমোলিশন ব্লাস্টাররা’ পরিকাঠামোর আয়তন এবং চরিত্র বুঝে অনেক হিসেব-নিকেশ করে বিস্ফোরকের পরিমাণ এবং ধরণ নির্ধারণ করেন। কোন কোন পয়েন্টে কী পরিমাণ বিস্ফোরক রাখলে পরিকাঠামোটির জোড়াগুলি এক‌ই সময়ে নিজের ওপর ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়বে তা ঠিক করতে হয় বিশেষজ্ঞদের। পুরো কাজটি ঠিকভাবে সারা হলে ধ্বংসস্থল থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাওয়া কংক্রিট ও ইস্পাতের স্তুপ সরানো ছাড়া আর কোনও কাজ থাকে না স্থানীয় কর্পোরেশনের। এখন কোন‌ও বিরাট বহুতল ধ্বংস করার আগে ভবনটির একটি থ্রি-ডি কম্পিউটার মডেল বানিয়ে‌‌ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নেন ডিমোলিশন ব্লাস্টাররা।

নয়ডার টুইন টাওয়ার: বিস্ফোরণ শুরু হওয়ার মুহুর্তে।

বারোটি ব্রাহ্মস মিশাইলের বিস্ফোরক!

বহুতল অট্টালিকাগুলি গুঁড়িয়ে দিতে পরিকাঠামোর চরিত্র বুঝে বিভিন্ন ধরণের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। পরিকাঠামোর উচ্চতা, কলামের সংখ্যা এবং কলামগুলির ঘনত্ব বুঝে বিস্ফোরকের পরিমাণ ঠিক করেন‌ ব্লাস্টাররা। কংক্রিটের কলাম হলে পরিকাঠামো গুঁড়িয়ে দিতে সাধারণ ডিনামাইট‌ বা এই জাতীয় বিস্ফোরকই যথেষ্ট। পুরোপুরি ইস্পাতের কলাম হলে ‘আরডিএক্স’ গোত্রের বিস্ফোরক জরুরী। নয়ডার টুইন টাওয়ার গুঁড়িয়ে দিতে ৩ হাজার ৭০০ কিলোগ্রাম বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে ডিমোলিশন টিম। যা তিনটি অগ্নি-ভি মিশাইলের ওয়ারহেডে বহনকারী বিস্ফোরকের সমান। যা দিয়ে চারটি পৃথ্বী ও বারোটি ব্রাহ্মস মিশাইলের বিস্ফোরক হয়ে যায়। নয়ডার জোড়া অট্টালিকা ধ্বংসে ডিনামাইট গোত্রের বিভিন্ন বিস্ফোরকের পাশাপাশি আরডিএক্স‌ও ব্যবহার করা হয়েছে। ড্রিল করে মোট ৯ হাজার ৬৪০টি গর্তে বিস্ফোরক ঠাসা হয়েছিল। সবকটি গর্তের গভীরতার যোগফল ২ হাজার ৬৩৪ মিলিমিটার।

ব্লাস্টিং ক্যাপ: যার মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

যে’ভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়

ডিনামাইট গোত্রের বিস্ফোরক হোক কি আরডিএক্স- বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য প্রবল শক তৈরি করা প্রয়োজন। ভবন ধ্বংস করার সময় মজুত বিস্ফোরকের সঙ্গে একটি লম্বা তার বা ফিউস ( ভেতরে অতি সামান্য পরিমাণে বিস্ফোরক বা প্রাইমার চার্জ থাকে ) দ্বারা একটি ব্লাস্টিং ক্যাপ যন্ত্র জুড়তে হয়। ব্লাস্টিং ক্যাপ যন্ত্রের বাটনে চাপ দেওয়া মাত্রই ফিউসের ভেতরে থাকা প্রাইমার চার্জ জ্বলে ওঠে এবং তারবাহিত শিখা বিস্ফারকে পৌঁছানো মাত্র‌ই ফাটতে শুরু করে। এখন প্রথাগত ফিউসের বদলে ইলেক্ট্রিকাল ডিটোনেটরের সাহায্যেও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ডিটোনেটর থেকে বের হ‌ওয়া বৈদ্যুতিক তারের অন্য প্রান্ত প্রাইমার চার্জের সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রাইমার চার্জ আবার যুক্ত থাকে অট্টালিকায় মজুত মূল বিস্ফোরকের সঙ্গে। ব্যাটারি থেকে তারে বিদ্যুত সঞ্চালন করা মাত্রই তার গরম হয়ে ওঠে। তার বাহিত তাপ প্রাইমার চার্জে থাকা দাহ্যবস্তুকে জ্বালিয়ে তুললে তা সংলগ্ন মূল বিস্ফোরককে ফাটতে সাহায্য করে। ব্লাস্টিং ক্যাপে চাপ দেওয়ার পর নয়ডার ৩২ ও ২৯ তলা দুটি হাইরাইজ ধ্বংস হতে সময় লেগেছে মাত্র নয় সেকেন্ড! একটা একশতলা বাড়ি ধ্বংস করতেও এর চেয়ে বেশি সময় লাগে না।

আশেপাশের সবকিছুই অক্ষত থাকে

বিল্ডিং ইমপ্লোশান নিঃসন্দেহে ব্যয় সাপেক্ষ। কিন্তু এর সবথেকে বড় গ্রহণযোগ্যতা- এতে আশেপাশের কোনও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বিস্ফোরণের সময় সংলগ্ন এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আশেপাশের বহুতলগুলি‌ও ফাঁকা করে দেয় প্রশাসন। এমনকি কুকুর-বিড়ালের মতো প্রাণীও যাতে সেই সময় ওই চত্বরে ঢুকে না পড়ে সেই নজরদারি‌ও চালানো হয়। তবে ধ্বংসস্তূপে টন টন ধুলো থেকে সৃষ্ট মেঘ দীর্ঘ সময় আশেপাশের বাতাসে ভাসতে থাকে। যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলেই মনে করেন চিকিৎসকেরা।

জোড়া ইমারত ধ্বংসের ভিডিও-

Photo and Video sources- Twitter.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *