কেকের‌ অকাল-আকস্মিক মৃত্যু দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু বাঙালি এমন আত্মধিক্কারে মাতল কেন?


কিংবদন্তি জাদুকর পিসি সরকারের মঞ্চে মৃত্যুর পর জাপানিরা কি আত্মধিক্কারে মেতে উঠেছিল? পিসি সরকারের মৃত্যুর জন্য কি বাঙালিরা জাপানিদের ধিক্কার দিয়েছিল? লিখলেন উত্তম দেব-

পৃথিবীটাই একটা মঞ্চ। একদিন সেই মঞ্চ ছেড়ে সবাইকেই বিদেয় নিতে হয়। পৃথিবী নামক বিরাট মঞ্চটার ভেতরে ছোট ছোট অসংখ্য মঞ্চ আছে। এই সব মঞ্চে বৃহৎ জীবনের খন্ড খন্ড মুহুর্তগুলিকে সুরে-ছন্দে-অভিনয়ে তুলে ধরেন শিল্পীরা। মঞ্চ জীবনের কথাই বলে। আবার মঞ্চে জীবনের কথা বলতে বলতেই জীবনের মঞ্চ ছেড়ে চিরকালের জন্য মহাকালের অনন্ত গ্রিনরুমে ফিরে যান শিল্পীদের কেউ কেউ। মঞ্চে মঞ্চনায়কের জীবনাবসান নতুন কোনও ঘটনা নয়। কেকে বা কৃষ্ণকুমার কুন্নাথের মৃত্যু ঠিক মঞ্চে হয় নি। মঞ্চ থেকে হোটেলে ফিরে গিয়েই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যখন তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য গাড়িতে তোলা হয় ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।‌ কেকের দেহটা হাসপাতালে পৌঁছায় কেকে নয়।

কেকে হৃদরোগে মারা গেছেন, বাঙালি তাঁকে মারে নি

ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। ঘটে যাওয়ার পর খুব বেশি কিছু আর করার থাকে না হাতে। যদিও কোন‌ও রোগ‌ই হঠাৎ আসে না। ভেতরে ভেতরে তার জাল বোনা পর্বটা চলে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ টের পায় না। ময়নাতদন্তের পর কেকের হার্টের যা হাল হকিকতের খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে একটা বিষয় পরিস্কার তিনি নিজের হৃদযন্ত্রের যত্ন নেন নি বা নেওয়ার সময় পান নি।

সাদা চর্বিতে ঢেকে যাওয়া ফ্যাটি হার্ট। ৭৫-৮০ শতাংশ ব্লকেজ! ভালভগুলি শক্ত হয়ে যাওয়া। কেকের হার্ট অ্যাটাকটা দু’মাস আগেও হতে পারত। অথবা দু’মাস পরে। কেকে নিজের বাড়িতেও আক্রান্ত হতে পারতেন। আবার মাঝ আকাশে ফ্লাইটের ভেতরেও।‌ কিন্তু ঘটনা এটাই- তাঁর হার্ট ব্লক হল ৩১ মে রাতে নজরুল মঞ্চ থেকে অনুষ্ঠান সেরে হোটেলে ফেরার পর। এবং ‌দুর্ভাগ্য, তাঁকে বাঁচানো গেল না।‌ বাচাঁনোর মতো সময় পাওয়া গেল না। অথবা বলা ভাল, কেকের চিকিৎসা করার‌ই সময় পাওয়া গেল না। ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের অনেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরেও বাঁচানো যায় না।‌ হয়তো কেকে অনুষ্ঠান চলাকালেই অসুস্থতা বোধ করছিলেন। কিন্তু সুরে মগ্ন থাকায় বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন নি সুরসাধক। নিঃসন্দেহে সেদিন ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড়ে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল নজরুল মঞ্চে। হলের ভেতরে-বাইরে থিকথিকে ভিড়। দরজাগুলি বন্ধ করার‌ও সুযোগ পাওয়া যায় নি। বাতানুকুল যন্ত্র ঠিকমতো কাজ করে নি। চড়া আলোর নিচে চরম গরম ও অস্বস্তিকর আর্দ্রতায় সাত হাজার দর্শকের হর্ষোল্লাসের মধ্যে একের পর এক গান গাওয়ার সময় একজন গায়কের ধমনী দিয়ে রক্ত সঞ্চালন কত দ্রুত গতিতে হতে পারে তা চিকিৎসকেরা ভাল বলতে পারবেন।‌ এখন গান গাইতে গাইতে নাচতেও হয় গায়কদের। কৃষ্ণকুমার কুন্নাথকেও নাচতে দেখা গেছে। আর্টারিতে ৮০ শতাংশ ব্লকেজ রয়েছে এমন মানুষকে ধরাশায়ী করার জন্য উল্লেখিত পরিবেশ ও কাজগুলি যথেষ্ট।

কিংবদন্তি জাদুকর পিসি ( প্রতুলচন্দ্র সরকার ) সরকার।

বিদেশের মঞ্চে ঘরের ছেলের মৃত্যুর কথা ভুলে গেল বাঙালি!

কেকের আকস্মিক অকাল প্রয়াণে সবাই শোকে বিহ্বল। মুকেশ, মহম্মদ রফি, কিশোরকুমারের আকস্মিক মৃত্যুর পরেও এমন হয়েছিল। এই তিন কিংবদন্তি সঙ্গীতকারের‌ আকস্মিক মৃত্যুর কারণও হৃদরোগ। মঞ্চে অনুষ্ঠান করতে করতেই অথবা অনুষ্ঠান সদ্য শেষ করার পর শিল্পীর মৃত্যুর ঘটনা পৃথিবীতে নতুন নয়। ১৯৭১-এর ৬ জানুয়ারি জাপানের হোক্কাইডোর আশাইকাওয়া শহরে জাদুসম্রাট পিসি সরকারের‌ই ( যাঁকে বলা হত ওয়ার্ল্ড’স গ্রেটেস্ট ম্যাজিশিয়ান) যে এমন মৃত্যুই হয়েছিল বাঙালি কি তা ভুলে গেছে? শনিবার একটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বলিউডের আরেক বিখ্যাত গায়ক বাঙালি অভিজিতের কথার মধ্যে যথেষ্টই সারবত্তা আছে। অভিজিৎ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন- অনুষ্ঠান শেষ করে হোটেলে ( ১৯৭৬সালে আমেরিকার মিশিগান প্রদেশের ডেট্রয়েট শহরে ) ফেরার পর মৃত্যু হয়েছিল মুকেশের‌ও। মঞ্চে পিসি সরকারের আকস্মিক মৃত্যুর জন্য কি কেউ জাপানিদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিল? তোলে নি। ডেট্রয়েটে শো করতে গিয়ে নীতিন মুকেশের মৃত্যুর জন্য‌ও কি কেউ আমেরিকানদের গালমন্দ করেছিল? করে নি। তবে কেকের মৃত্যুর জন্য বাঙালি দোষী সাব্যস্ত হবে কেন?

বাঙালি কি আত্মধিক্কৃত জাতিতে পরিণত হল?

অদ্ভুত ব্যাপার হল কেকের মৃত্যুর পর বাঙালি নিজেই নিজেকে খিস্তি দিয়ে ভূত বানাচ্ছে। নিজের স্বজাতি শিল্পীকে পারলে রাস্তায় ফেলে গণধোলাই দেয় বাঙালি। আয়োজকদের তরফ থেকে যথেষ্ট গাফিলতি ছিল। মানলাম।‌ এই ভ্যাপসা গরমে কলেজ কর্তৃপক্ষের সোস্যাল করতে যাওয়াই ঠিক হয় নি।‌ পশ্চিমবঙ্গে কলেজ ফেস্টগুলি সচরাচর হয়ে থাকে শীতকালে। কলেজের সোস্যালে ছেলেমেয়েদের নিয়ন্ত্রণে রাখা রীতিমতো একটা অসাধ্য কাজ। এবং সেটা আজ থেকে নয়। খোলা মাঠে হলে তবু ভিড় সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু কলেজ সোস্যালে নামকরা কোন‌ও শিল্পীর অনুষ্ঠান অডিটোরিয়ামে করতে যাওয়াটা রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ। কেকের অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাঠগড়ায় তোলা যেতেই পারে। তোলা হচ্ছেও। কিন্তু তাই বলে একটা জাতি এইভাবে আত্মপীড়নে, আত্মধিক্কারে নেমে যাবে? কিংবদন্তি জাদুকর পিসি সরকার মঞ্চে মৃত্যু বরণের পর জাপানিরা আত্মপীড়নে, আত্মধিক্কারে নামল না। মুকেশ মারা যাওয়ার পর আমেরিকান আয়োজকরা আত্মসমালোচনা করল না। কিন্তু কেকের দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর বাঙালির নাকি দেশে আর মুখ দেখানোর জো নেই। ঘটার দরকার নেই- কিন্তু বাঙালি কোনও শিল্পীর মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠান মঞ্চে কিম্বা অনুষ্ঠানের পরে মৃত্যু হলে কি মারাঠিরা এইভাবে নিজেদের কপাল চাপড়াতো?

বাঙালি বিশ্বনাগরিক হয়েছে কিন্তু বাঙালি হয় নি

কলকাতায় কেকের অনুষ্ঠানের আগে করা রূপঙ্কর বাগচীর ভিডিওটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, কোনও সন্দেহ নেই। তার চেয়েও বড় কথা রূপঙ্করের নিজের ও বাঙালি শিল্পী সমাজের হীনমন্যতা প্রকাশ পেয়েছে এতে। ভুলভাল, বেহিসেবি কথা বলে নিজের স্বজাতি গায়কদের বিড়ম্বনায় ফেলে দিয়েছেন রূপঙ্কর। কিন্তু রূপঙ্করের ভিডিও তো কেকের হার্ট অ্যাটাকের কারণ নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে কার‌ও সমালোচনা, তা যত‌ই অবান্তর হোক না কেন, অন্যায় তো নয়। তার জন্য একটা লোককে, স্বজাতি সহনাগরিককে ভার্চুয়াল লিঞ্চিং-এর মুখোমুখি করে দেওয়া যায়? বিকৃত মস্তিষ্ক এক ইউটিউবারের অশ্রাব্য খিস্তি‌ও সমর্থন করা যায়? বাঙালি উদার হয়েছে। বিশ্বনাগরিক হয়েছে। কিন্তু বাঙালি বাঙালি হয়ে ওঠে নি। নাকি এমন খ্যাপামিই প্রকৃত বাঙালিয়ানা?

Photo sources- Collected.


Leave a Reply

Your email address will not be published.