পুরবোর্ডে স্থান না পাওয়া তপনের সমর্থনে মারা পোস্টারে ছাপ্পাভোটের অভিযোগ! হাসছে বিরোধীরা


জলপাইগুড়ি : পুরভোটের ফল প্রকাশিত হয়েছিল ২ মার্চ। জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারপার্সন হিসেবে পাপিয়া পাল শপথ নিয়েছিলেন ১৬ মার্চ। আর বোর্ড গঠিত হল ৩০ মে। পুরবোর্ড তৈরি না হ‌ওয়ায় নাগরিক পরিষেবা শিকেয় উঠেছিল বলে বিরোধীদের অভিযোগ। শাসকদলের অন্দরমহলে প্রবল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণেই যে বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়ায় এতটা বিলম্ব ঘটল তা আর ধামাচাপা নেই। সোমবার তৃণমূল পরিচালিত জলপাইগুড়ি পুরসভার বোর্ড গঠিত‌ হল ঠিক‌ই কিন্তু তাতেও দলের ভেতরে অসন্তোষ চাপা থাকল না। চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিলে ঠাঁই পর্যন্ত হল না জলপাইগুড়ির পুর রাজনীতির অন্যতম মুখ তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তপন বন্দ্যোপাধ্যায় টাউন ব্লক তৃণমূলের সভাপতি। ভোটের আগে থেকেই জলপাইগুড়ি তৃণমূলের অন্দরে যে ক’জন নেতানেত্রী পুরপ্রধান পদের দাবিদার ছিলেন তাঁদের অন্যতম তপন। এহেন হেভিওয়েট নেতাকে যে পুরবোর্ড থেকেই ছিটকে দেওয়া হবে তেমন কোনও পূর্বাভাস ছিল না বাতাসে।

বোর্ডে সন্দীপ জায়গা পেলেও ছিটকে গেলেন তপন

পুরপ্রধান ও উপ পুরপ্রধান ছাড়াও তিন সদস্যকে নিয়ে জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিল। সোমবার সকালে চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিলের তিন সদস্যের নাম ঘোষণা করেন জেলা তৃণমূল সভানেত্রী মহুয়া গোপ। তালিকায় জায়গা পেয়েছেন পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সন্দীপ মাহাতো, তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর স্বরূপ মন্ডল এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর লোপামুদ্রা অধিকারী। জলপাইগুড়ির পুর প্রশাসনে তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই অভিজ্ঞ ও দক্ষ সন্দীপ মাহাতো। প্রশাসক বোর্ডে সৈকত চ্যাটার্জির সঙ্গে যুগ্মভাবে ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।‌ পুরপ্রধান পদের দাবিদারদের মধ্যে সন্দীপ‌ও একজন ছিলেন বলে জানা যায়। তপন বা সন্দীপ এমনকি সৈকত- জলপাইগুড়ি পুরসভায় তৃণমূলের তিন প্রধান নেতার কারোর‌ই চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসার সুযোগ হয় নি। পুরপ্রধান পদে পাপিয়া পালের নামেই শিলমোহর বসায় তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। ভাইস চেয়ারম্যান হন সৈকত। ভাইস-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব‌ হাতছাড়া হ‌ওয়ার পর থেকেই হতাশ শহর জলপাইগুড়ির পুর রাজনীতির অন্যতম দুই মুখ- সন্দীপ মাহাতো ও তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিলে সন্দীপের নাম থাকলেও জায়গা পেলেন না তপন। পুরবোর্ডে অভিজ্ঞ তপন বন্দ্যোপাধ্যায় জায়গা না পাওয়ায় তৃণমূলের ভেতরেই তীব্র গুঞ্জন। বিরোধীরা‌ও তাজ্জব।

অভিজ্ঞতার দাম পেলেন না তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

২০১৩ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। শহরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে তপনের ‌জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। ১৯৯০ থেকে কাউন্সিলর। পাঁচবার জিতেছেন। ৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত টানা চারবার। পনেরোতে ওয়ার্ডটি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ( জেনারেল ) হয়ে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী সঙ্গীতা। সঙ্গীতা‌ও বিজয়ী হন। ২০২২-এ ওয়ার্ডটি জেনারেল হলে ভোটে পঞ্চমবারের জন্য বিজয়ী হন তপন। তেরো থেকে পনেরো- জলপাইগুড়ি পুরসভার ভাইস-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব‌ও সামলেছেন তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।‌ পুরবোর্ডে তাঁকে রাখা হয় নি- এই খবর কানে যাওয়া মাত্রই ক্ষোভ উগড়ে দেন তপন। চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিলের তালিকা রাজ্য তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব দ্বারা অনুমোদনপ্রাপ্ত বলে দলের জেলা সভানেত্রীর দাবি। যদিও জেলা সভানেত্রীর দাবিকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেছেন তপন বন্দ্যোপাধ্যায়। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে তপন বলেন-” রাজ্য থেকে নামের কোনও তালিকা আদৌ পাঠানো হয়েছে কিনা তা নিয়েই আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ কাগজে দলের কোন সিল নেই। গোটা বিষয়টি দলের সুপ্রিমোর নজরে আনা হবে।”

ষড়যন্ত্র দেখছেন প্রাক্তন উপ পুরপ্রধান

টাউন ব্লক তৃণমূলের সভাপতি পদে থাকলেও‌ পুরসভাই তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধ্যানজ্ঞান। পুর প্রশাসনে জায়গা না পেয়ে তিনি যে ভীষণ‌ই হতাশ তা গোপন রাখেন নি তপন‌। তিনি বলেন-” কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি। এতদিন ধরে ‌দলের কাজ করে চেয়ারম্যান ইন কাউন্সিলে পর্যন্ত পদ পেলাম না। সঠিক মূল্যায়ণ হল না। ” তাঁকে ষড়যন্ত্র করে ‌বোর্ড থেকে ছিটকে ‌দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন এই অভিজ্ঞ সিভিক পলিটিশিয়ান। পুরসভায় যাতে ব্যবসা করে খাওয়া যায়, সেই রাস্তা নিষ্কন্টক রাখতেই তাঁকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তপন বন্দ্যোপাধ্যায়।

পোস্টারের দায় নিলেন না তপন

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে বোর্ড থেকে বাদ দেওয়ার ‌জের মঙ্গলবার‌ও লক্ষ্য করা যায়। টাউন ব্লক তৃণমূলের অন্দরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।‌ তপন পুরবোর্ড থেকে বাদ পড়ায় ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের নাগরিকদের মধ্যে‌ও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে শহর পোস্টারে ছেয়ে গেছে। পুরসভার প্রবেশপথের দুই পাশে পর্যন্ত পোস্টার পড়েছে। জলপাইগুড়ি নাগরিক সমাজের নামে পোস্টারগুলি মারা হয়েছে। পোস্টারগুলিতে লেখা রয়েছে- “তপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুর বোর্ডে রাখা হল না কেন পুর কর্তৃপক্ষ জবাব দেও।” এমনকি টাউন ব্লক তৃণমূলের সভাপতির সমর্থনে লেখা পোস্টারে তৃণমূল পরিচালিত পুর প্রশাসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পর্যন্ত অভিযোগ করা হয়েছে। পোস্টারে লেখা ‌হয়েছে- “পৌর বোর্ডে ক্ষমতালোভী, অর্থলোভী, ছাপ্পা ভোটের কান্ডারী পৌর প্রশাসক দূর হাটো।” পোস্টারের ভাষায় স্বাভাবিক ভাবেই শহরের রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সবার‌ই প্রশ্ন- এই অর্থলোভী, ক্ষমতালোভী এবং ছাপ্পা ভোটের কান্ডারীটি কে?

তাঁকে পুরবোর্ডে না রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে মারা পোস্টারের দায়িত্ব অবশ্য তপন বন্দ্যোপাধ্যায় নেন নি। তিনি বলেন-“এই ধরণের রাজনীতি আমি ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ করি না। কে করেছেন কেন করেছেন জানা নেই।” যে বা যারাই পোস্টার সাঁটিয়ে থাকুন না কেন, তাদের এই ধরণের কাজ থেকে বিরত হতে আবেদন জানিয়েছেন তপনবাবু। এদিকে জলপাইগুড়িতে পুরবোর্ডকে কেন্দ্র করে শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বেআব্রু হয়ে পড়ায় কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না বিরোধী শিবির।

ভিডিও-

Video and Photo- Reporter.


Leave a Reply

Your email address will not be published.