নির্মল মাজির মমতাই 'মা সারদা' তত্ত্ব, বিবৃতি দিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানাল রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন - nagariknewz.com

নির্মল মাজির মমতাই ‘মা সারদা’ তত্ত্ব, বিবৃতি দিয়ে তীব্র ক্ষোভ জানাল রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন


স্পষ্ট জানাল মঠ ও মিশন- শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর মর্যাদাহানি করেছেন চাটুকার নির্মল মাজি।

ডেস্ক রিপোর্ট : শ্রীশ্রী মা সারদাই কালীঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রূপে জন্ম নিয়েছেন- দিন কয়েক আগে প্রকাশ্য সভায় এই দাবি করে গোটা বাঙালিজাতিকেই টাস্কি খাইয়ে ছেড়েছিলেন তৃণমূল নেতা নির্মল মাজি। নির্মলের বক্তব্যের সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট হ‌ওয়া মাত্র‌ই ভাইরাল এবং নেটাগরিক মহলে খিল্লির সুনামি বয়ে যায়। কেউ শুনে কানে আঙুল দিয়েছেন তো কেউ তেড়ে খিস্তি। কেউ কেউ এমনও বলেছেন, পাপিষ্ঠটার এই কথা কর্ণকুহরে ঢোকানোর চেয়ে তো রোদ্দুর রায়ের‌ কাঁচা খিস্তি শোনাও ‘ফার বেটার’। খুব সঙ্গত কারণেই নির্মলের কথায় চরম ক্ষুব্ধ দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অগণিত শিষ্য-ভক্ত-অনুরাগী। তাঁদের কাছে শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী‌ নিত্য পূজিতা, পরমারাধ্যা জগজ্জননী। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, মঠের বাইরের যে কোনও ঘটনাতেই সাধারণতঃ নীরবতা অবলম্বন করে থাকে। এবার কিন্তু নির্মল মাজির বক্তব্যের বিরুদ্ধে রীতিমতো কড়া প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে পারল না রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার‌ দুপুরে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও বিবৃতি মারফত নির্মল মাজির শ্রীশ্রী মা সারদা সম্পর্কিত বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা ও নিন্দা করলেন মঠ ও মিশনের সাধারণ সম্পাদক স্বামী সুবীরানন্দজি মহারাজ।

নির্মল মাজির বক্তব্যের ভাইরাল ভিডিও।

কী বলেছিলেন নির্মল মাজি?

মঠ ও মিশনের সাধারণ সম্পাদকের বিবৃতি শোনার আগে আর‌‌ও একবার উলুবেড়িয়া উত্তরের তৃণমূল বিধায়ক ও তৃণমূলের বিতর্কিত চিকিৎসক নেতার শ্রী শ্রী মা সারদা সম্পর্কিত বক্তব্যটি শোনা যাক। গত সোমবার একটি সভায় নির্মল, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তেল মেরে আকাশে চড়াতে গিয়ে বলে বসেন, আরে মা সারদাই তো কালীঘাটের কালীক্ষেত্রে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে মমতা হয়ে জন্ম নিয়েছেন। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে নির্মল মাজি অবলীলায় বলতে থাকেন- “সারদা মা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে বিবেকানন্দের কিছু সতীর্থ,বন্ধুদের কাছে, মহারাজদের কাছে বলেছিলেন, যেই রাস্তা দিয়ে খাল পেরিয়ে কালীঘাটে যাই…। ওই হরিশ চ্যাটার্জি দিয়ে। দিদি যেখানে থাকেন। সেই রাস্তাটা ধরেই সারদা মা যেতেন। এখনও ঘাটটা আছে। কী বলেছিলেন দক্ষিণেশ্বরে? বলেছিলেন- আমার মৃত্যুর এতদিন পরে আমি কালীঘাটের কালীক্ষেত্রে ফের জন্ম নেব আমি । মনুষ্য জন্ম নেব। এবং আমি ত্যাগ, তিতিক্ষা, সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে‌ও জড়িয়ে যাব।” এখানেই না থেমে নির্মল মাজি বলে চলেন- “পরিসংখ্যান এবং সংখ্যাতত্ত্বের সব হিসেব নিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, সারদা মায়ের মৃত্যু এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মের সময়কাল অঙ্কটা ঠিক মিলিয়ে দিয়েছে। তিনিই মা সারদা। তিনিই ফ্রোরেন্স নাইটিঙ্গেল। তিনিই সিস্টার নিবেদিতা। তিনিই খড়ের দুর্গা। অষ্টমী -নবমীর সন্ধিক্ষণে যাঁর জন্ম হয় তিনিই কিন্তু নবরুপে উন্মোচিত ‌হন যুগে যুগে, দেশে দেশে, কালে কালে।”

কী বললেন স্বামী সুবীরানন্দ?

নির্মল উবাচের ঠিক তিনদিন পর মুখ খুলল রামকৃষ্ণ মিশন। নির্মলের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ভক্ত-শিষ্যদের অসংখ্য মেল এবং মেসেজ তাঁদের কাছে এসেছে বলে ভিডিও বিবৃতিতে জানিয়েছেন মঠ ও মিশনের সাধারণ সম্পাদক স্বামী সুবীরানন্দজি মহারাজ। মা সারদাকে নিয়ে তৃণমূল বিধায়কের বক্তব্যে মঠ ও মিশনের ভক্ত-শিষ্য-অনুরাগীরা ভীষণ ক্ষুব্ধ ও বিচলিত বলে স্পষ্টত‌ই জানিয়েছেন সুবীরানন্দজি। স্বামী সুবীরানন্দজি বলেন, ” শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী‌ সম্পর্কে মঠের সমস্ত সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী এবং অগণিত ভক্তের মনে যে ভাবমূর্তি আছে, ওই নেতার বক্তব্যে তাতে নিদারুণ আঘাত লেগেছে।”

শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী সম্পর্কিত নির্মল মাজির দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যে, কাল্পনিক এবং আজগুবি বলে খারিজ করে দিয়েছে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কর্তৃপক্ষ। সুবীরানন্দ বলেন, শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী‌ সম্পর্কে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন এবং অন্যান্য প্রকাশনী সংস্থা থেকে যে কয়টি প্রামাণ্য গ্রন্থ এ যাবৎ প্রকাশিত হয়েছে তার কোনোটিতেই নির্মল মাজির দেওয়া তথ্যের উল্লেখ নেই। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সাধারণ সম্পাদক আর‌ও বলেন, ” আমাদের দীর্ঘ সাধু জীবনে শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর সান্নিধ্য লাভ করা অনেক সন্ন্যাসী ও গৃহীভক্তের সংস্পর্শে আমরা এসেছি, তাঁদের কারও মুখেই এই ধরণের কোন‌ও সংবাদ শুনি নি।” স্বামী সুবীরানন্দজি মহারাজের প্রশ্ন- তাহলে ওই নেতা কোথা থেকে এই অদ্ভুত তত্ত্ব পেলেন এবং কী করে তা প্রকাশ্য সভায় বললেন?

শ্রীশ্রী মা সারদা: স্বামী বিবেকানন্দ যাঁকে আদ্যাশক্তি রূপে অভিহিত করেছিলেন।

ভিডিও সম্প্রচারে সুবীরানন্দ বলেন, শ্রীশ্রী মা সারদা দেবী শুধু একজন মহীয়সী নারীই নন, তিনি সীতা, রাধারাণী এবং বিষ্ণুপ্রিয়া দেবীর পর্যায়ের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। যাঁরা যুগে যুগে অবতারদের লীলা সঙ্গিনী রূপেই শুধু এসে থাকেন। স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে আদ্যাশক্তি ও রামকৃষ্ণ সংঘের সংঘজননী রূপে অভিহিত করেছেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে একাধারে দেবী ও আপন জননী রূপে নিত্যপূজা করে থাকেন এবং সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে তাঁর কাছে আশীর্বাদ ও শক্তি প্রার্থনা করে থাকেন।”

শ্রীশ্রী মা সারদার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একাসনে টেনে এনে নির্মল মাজি মা সারদার মর্যাদাহানি করেছেন বলে বিবৃতিতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন সুবীরানন্দ। তিনি বলেন, “মঠ ও মিশনের সকল সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী এবং অসংখ্য ভক্ত-শিষ্য-অনুরাগীবৃন্দ অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে মনে করছে যে, ওই নেতা তাঁর এই বক্তব্য দ্বারা আমাদের পরম আরাধ্য শ্রীশ্রী মা সারদা দেবীর মর্যাদাহানি করেছেন।”

নির্মল নিয়ে অস্বস্তিতে তৃণমূল

নির্মল মাজির বক্তব্যে বাংলা জুড়ে ঢিঢি পড়ে গেলেও তৃণমূল নেতৃত্ব কিন্তু তিনদিন বেশ নির্বিকারই ছিলেন। গোপনে কোন‌ও কোন‌ও তৃণমূল নেতা নির্মলের কথায় উষ্মা প্রকাশ করলেও রামকৃষ্ণ মিশন মুখ খোলার আগে পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে নির্মল মাজির বক্তব্যের নিন্দা জানায় নি তৃণমূল কংগ্রেস। যাঁকে মা সারদার অবতার বলে নির্মলের সদম্ভ দাবি সেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়‌ও নীরব। সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের ভেতরে নির্মল মাজির সময়টা খুব একটা ভাল যাচ্ছে না। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের রোগী কল্যাণ সমিতির সভাপতি পদ থেকে নির্মলকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফের দিদির গুডবুকে নাম তুলতেই দিদিকে নির্মলের এমন বেনজির তৈলমর্দন বলে মনে করছে তৃণমূলের অন্দরের কেউ কেউ। বৃহস্পতিবার রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন নীরবতা ভেঙে নির্মল মাজির বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করার পর অস্বস্তিতে রাজ্যের শাসক দল।

মঠ ও মিশনের ভিডিও বিবৃতি-

Video Credit- Youtube channel of Ramakrishna Math & Mission.


Leave a Reply

Your email address will not be published.