দিল্লির রুশ নীতি যাই হোক, ভারতের মন জুগিয়েই চলতে হবে পশ্চিমী দুনিয়াকে


রুশ-ইউক্রেন সংঘাতের জেরে ব্রিটেন সহ পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি টালমাটাল। ভারতকে চটালে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই পশ্চিমের।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের আশু সমাধানের কোনও ইঙ্গিত আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়া বিশেষ সুবিধা না করতে পারলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মারিয়াপোল নগরী এখন রুশ সেনাবাহিনীর দখলে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের দ্রুত নিষ্পত্তি ভারতের কাম্য। যদিও যুদ্ধ কবে থামবে কেউ জানে না। এই যুদ্ধ নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক ভাবে এক বেনজির বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলেছে ভারতকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ও ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক বড় বড় সংকট এসেছে কিন্তু ভারতকে কখনও এমন কূটনৈতিক অস্বস্তিতে পড়তে হয় নি। আবার রুশ-ইউক্রেন সংঘাত‌ই আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে ভারতের সামনে একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

চিনকে ঠেকাতে ভারতকে পাশে চাই আমেরিকার

স্বাধীনতার পর থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সবথেকে বিশ্বস্ত মিত্র। কমিউনিজমের পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পরেও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সখ্যতায় কখনোই দূরত্ব তৈরি হয় নি। এ’দিকে ঠান্ডাযুদ্ধের সময় আমেরিকার সঙ্গে ভারতের যে কূটনৈতিক শীতলতা ছিল তা ঘুচে গেছে কবেই। এখন ওয়াশিংটন প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ভারত। বিশেষ করে গত বাইশ বছরে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু তাতেও এতদিন পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারতের বিশেষ কোনও অসুবিধা হয় নি।

আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের মাপকাঠি ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা। এই দুই প্রেক্ষিতেই এশিয়ার দুই বৃহৎ প্রতিবেশী দেশ চিন ও ভারতকে আর কেউই অস্বীকার করার অবস্থায় নেই। এই মুহুর্তে চিন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ভারতের অবস্থান ষষ্ঠে। ২০২৪-এর মধ্যেই ভারত যুক্তরাজ্যকে ( ইউকে) টপকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। গত ষাট বছর ধরে চিন ও ভারতের সীমান্ত বিরোধ চলছে। এবং এই মুহুর্তে চিন-ভারত সম্পর্ক গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সবথেকে খারাপ। চিন সুপার পাওয়ার হতে চায়। মার্কিন অর্থনীতির উপর চিনের একটা বিপুল প্রভাব থাকার পরেও চিনের  এই রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা মোটেই বরদাস্ত করতে রাজি নয় আমেরিকা।‌ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চিনের প্রভাব খর্ব করতে ভারতকে প্রয়োজন ওয়াশিংটন প্রশাসনের। মাকিন পুঁজি বিনিয়োগের সবথেকে ঊর্বর জায়গা এখন ভারতের বাজার। চিন-মার্কিন সম্পর্কে যখন‌ই টানাপোড়েন বৃদ্ধি পায় তখনই চিন ছেড়ে ভারতে আশ্রয় খোঁজে আমেরিকার অনেক কোম্পানি। আসলে চিনের মতোই ভারতের বাজারকে‌ও আর উপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই পৃথিবীর কোনও ‌শক্তির।

প্রতিরক্ষায় রাশিয়া ভারতের বিশ্বস্ত সহযোগী

জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি- ভারতের মাথা ব্যথার দুই বড় কারণ। জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভারত স্বাবলম্বী নয়। ভারতের আমদানি খরচের একটা বিশাল অংশ চলে যায় ক্রুড ওয়েল সহ নানাবিধ জ্বালানি ক্রয়ের পেছনে। রাশিয়া থেকে ভারত জ্বালানি তেল, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনে। আরও অনেক দেশ থেকেই ভারতকে এই গুলো কিনতে হয়। রাশিয়া যখন  ভারতকে সস্তায় জ্বালানি বিক্রির প্রস্তাব দেয় আমেরিকার চাপ সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয় সাউথ ব্লকের পক্ষে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে‌ই এমন টানাপোড়েনের মধ্যে পড়তে হয়েছে ভারতকে। ভারতের সমর্থন আদায়ের জন্য নয়াদিল্লিকে সস্তায় তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। ভারত রাশিয়ার ইউক্রেন নীতিকে সমর্থন না করলেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে ভোলে নি। ইউক্রেনের বুচায় রুশ সেনার বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর একটা অভিযোগ উঠেছে। ভারত জাতিসংঘে কথিত বুচা গণহত্যার নিন্দা করলেও ‌রুশ-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব নিয়ে পশ্চিমী শক্তির মন জুগিয়ে চলতে রাজি নয়। যদিও ভারতকে রাশিয়ার থেকে দূরে সরিয়ে আনতে চেষ্টার ত্রুটি রাখছে না আমেরিকা ও তার পশ্চিমী মিত্ররা। ক্ষেত্র বিশেষে চাপ‌ও। যদিও সেই চাপ মোকাবিলা করার মতো শক্তি ‌ও সাহস এখন ভারতের আছে।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহু পুরোনো। যখন আমেরিকা অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে পাকিস্তানের কাছে সমরাস্ত্র বেচত তখন ভারতের প্রধানতম অস্ত্র জোগানদার ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ছাড়া ভারতের মতো শত্রু পরিবেষ্টিত একটি বৃহৎ দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা‌ই অচল। দুঃখের বিষয় হল ভারত মহাকাশ গবেষণায় যতটা সাফল্য লাভ করেছে প্রতিরক্ষা গবেষণায় ততটা নয়। উচ্চ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ভারতকে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা এমনকি ট্যাঙ্ক সাঁজোয়া যানের জন্য‌ও রাশিয়ার মুখাপেক্ষী থাকতে হয় ভারতকে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আমেরিকা‌ও ভারতকে বেচতে রাজি। কিন্তু ভারত সরকারকে তো দামের কথা‌ও মাথায় রাখতে হয়। ভারত রাশিয়ার থেকে অনেক সস্তায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে পারে কিন্তু আমেরিকান অস্ত্র বিক্রেতারা দরাদরিতে নারাজ।

প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ভারতকে স্বাবলম্বী হতে হবে

শুক্রবার‌ও মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন থেকে ভারতকে পরোক্ষে হুমকি দেওয়া হয়েছে। পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন,” ভারতের পাশাপাশি বাকি দেশগুলিকে আমাদের বার্তা- প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে তাদের রাশিয়া নির্ভরতা দেখতে চাই না আমরা। এই ব্যাপারে আমরা দেশগুলিকে স্পষ্ট ভাষায় নিরুৎসাহিত করতে চাই।” পেন্টাগনের এই প্রচ্ছন্ন হুমকিকে ভারতের উপর স্নায়ুর চাপ বাড়ানোর একটি মার্কিন কৌশল হিসেবেই দেখছে আন্তর্জাতিক মহল। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যত গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যায় সেই দিকে সকলের‌ই নজর। এই পরিস্থিতিতে আসল কথা হল ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতকে দলে টানতে উদগ্রীব আমেরিকা-রাশিয়া দুই পক্ষই।

দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী ও বরিস জনসন।

দু’দিনের ভারত সফর শেষে ফিরে গেলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। ভারতকে তোষামোদে নিজের যথাসাধ্য করেছেন বরিস। রুশ-ইউক্রেন সংঘাতের জেরে ব্রিটেন সহ পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি টালমাটাল। এই মুহুর্তে সাউথ ব্লকের রুশ নীতি যাই হোক ভারতের বিরোধিতায় নামলে যে তাদের নিজেদের‌ই ক্ষতি তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না পশ্চিমী কূটনীতিকদের। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির নির্মাণে দেশ স্বাবলম্বী হলে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ভারতের দাপট যে আরও বাড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

Photo Credit- Twitter of Narendra Modi. Feature photo is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published.