বাঙালি এখন মমতা ডকট্রিনের অধীন! ‘দল তো করিই বদলের জন্য’, লজ্জা কীসের?


বাঙালি আগে দিন বদলের স্বপ্ন দেখত। এখন দল বদলের। রাম,বাম,অতিবাম- সবাইকে এক ঘাটে জল খাওয়াচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুগ্রহ বিলিয়ে আনুগত্য ক্রয়- এটাই মমতা ডকট্রিন। মমতা ডকট্রিনে মজে বাঙালির কাছে দল পাল্টানো এখন জলভাত।লিখলেন উত্তম দেব-

পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে সবথেকে বেশি সংশয়ে ভোগেন যে দলের নেতারা তার নাম তৃণমূল। এই দলের কেন্দ্রীয় কমিটি কখন ভাঙা হবে কিম্বা রাজ্য কমিটি কখন গড়া হবে। কার কখন পদ প্রাপ্তি ঘটবে কিম্বা কার কখন পদচ্যুতি ঘটবে। কে কখন যোগ দিবে অথবা কে কখন বিয়োগ হবে। কার কখন বৃহস্পতি তুঙ্গে উঠবে অথবা কার ঘাড়ে কখন শনি চাপবে,তা একজন ছাড়া আর কেউ জানে না। যেই একজন জানেন তিনিও চান‌ না তাঁর দলে এই সব নিয়ে অযথা মাথা ব্যথা আর কার‌ও থাকুক। ৩৪ বছর একটি রেজিমেন্টেড দলের শাসন দেখেছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। গত এগারো বছর ধরে বাঙালি ‌দেখছে একটি মাত্র ব্যক্তি সব দলকে কীভাবে তালগোল পাকিয়ে দিতে সক্ষম।

আই অ্যাম দ্য পার্টি

রাজনীতি সচেতন বাঙালির নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে এখন কার্যত কোন‌ও রাজনৈতিক ‌দল নেই। তৃণমূল কংগ্রেস নামক দলটির নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা নিজেও জানেন তিনি ও তাঁর দল সমার্থক। এবং তিনি তা চান‌ও। দলে তিনি বলেন বাকিরা সবাই শোনে। তিনি যখন যেটা খুশি করেন বাকিরা সবাই দেখে এবং অতঃপর তাঁদের একমাত্র যেটা করণীয় থাকে সেটা হল ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হাততালি মারা। মমতাকে মিহি গলায় প্রশ্ন করার সাহস পর্যন্ত তৃণমূলে কার‌ও নেই। সেই চেষ্টা করলে সুপ্রিমো কীভাবে তা কঠোর হস্তে দমন করেন সম্প্রতি তা টের পেয়েছেন ভাইপো অভিষেক। অভিষেক ব্যানার্জিকে বলা হয় তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড। ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নিয়ে আওয়াজ তুলে দলের মধ্যে হাওয়া গরম করতে গিয়ে খোদ সেকেন্ড ইন কমান্ডের‌ই যখন বেলুন ‌চুপসে যাওয়ার দশা তখন ট্যাঁ ফোঁ করার সাহস আর কে দেখায়।

আই অ্যাম দ্য পার্টি! তৃণমূলই মমতা,মমতাই তৃণমূল। ফাইল ফটো

ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই বলেছিলেন ‘আই অ্যাম দ্য স্টেট’-আমিই রাষ্ট্র। বিধানসভা ভোট এলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন- ২৯৪টা আসনে আমিই প্রার্থী। আমাকে ভোট দাও। লোকসভা নির্বাচন এলে বলেন- ৪২টা আসনে আমিই দাঁড়িয়েছি। আমাকে ভোট দাও। লোকসভা-বিধানসভা থেকে পুরসভা-পঞ্চায়েত- তৃণমূলের একমাত্র মুখ মমতা। মমতা কখন কী নির্দেশ দেবেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের লোকেরাও তা আঁচ করতে পারেন না। দলের মধ্যে কাকে তুলবেন আর কাকে ফেলবেন- ঠিক করার একমাত্র মালিক তিনিই। দলের বাইরে কার সঙ্গে দোস্তি করবেন আর কার সঙ্গে কুস্তি- সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অথরিটি মমতা। বাকিরা সাক্ষী গোপাল।

অনুগ্রহ বিতরণে অকৃপণ মমতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাতে যা ভাবেন সকালে তা কার্যকর করেন। তিনি যখন যা ভাবেন তা একাই ভাবেন। তাঁর ভাবনা দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির সঙ্গে বিনিময় করার প্রয়োজন মনে করেন না মমতা। দল এবং প্রশাসন চালানোয় এটা মমতার একদম নিজস্ব স্টাইল। এত দ্রুত এবং অবাধ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ইন্দিরা গান্ধীর‌ও ছিল না। ডঃ বিধানচন্দ্র রায়, সিদ্ধার্থশংকর রায় এবং জ্যোতি বসু- বাংলার এই তিন মুখ্যমন্ত্রী‌ও দাপটে প্রশাসন সামলেছেন কিন্তু দলের ভেতরে তাঁরাই শেষ কথা ছিলেন না। বিধান রায়ের আমলে কংগ্রেসের সংগঠনের রাশ ছিল অতুল্য ঘোষের হাতে। সিদ্ধার্থশংকর রায়ের আমলে প্রদেশ কংগ্রেস ছিল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে বিদীর্ণ এবং দলের উপর কোন‌ও নিয়ন্ত্রণ‌ই ছিল না মুখ্যমন্ত্রীর। যতদিন প্রমোদ দাশগুপ্ত ছিলেন আলিমুদ্দিনের মোজাফফর আহমদ ভবনে জ্যোতিবাবুর কোন‌ও প্রভাব‌ই খাটে নি। পিডিজি যাওয়ার‌ পরে দলে জ্যেতি বসুর কর্তৃত্ব নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি পেয়েছিল কিন্তু বহুক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সিদ্ধান্ত নিত সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলী। দল এবং প্রশাসন – উভয় স্থলেই মমতা কিন্তু একমেবাদ্বিতীয়ম। একদা তৃণমূলের সংগঠনে মুকুল রায়ের পৃথক একটা প্রভাব ছিল বটে কিন্তু সেসব এখন অতীতের স্মৃতি মাত্র।

একটা কথা মানতেই হবে অনুগ্রহ বিতরণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অকৃপণ। এবং এই কাজে তিনি অতীতের রাজা-বাদশাহদের‌ও ছাপিয়ে গেছেন। অনুগ্রহ বিলোতে আপন-পর, শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ করেন না মমতা। তৃণমূল সুপ্রিমো একটা সত্য খুব ভালো বুঝেছেন- বর্তমান বাঙালি সমাজের অধিকাংশ মানুষই মূলতঃ প্রসাদজীবী। তাই অনুগ্রহ বিলিয়ে আনুগত্য ক্রয় মমতার একটা বড় কৌশল। এবং এতে বেশ সফল তিনি। নির্বেদ রায়, ওমপ্রকাশ মিশ্র, মানস ভুঁইয়া, ঋতব্রত ব্যানার্জি, বাবুল সুপ্রিয় এবং সর্বশেষ সংযোজন জয়প্রকাশ মজুমদার- টিভি চ্যানেলগুলির সান্ধ্য আসরে তাঁকে বাক্যবাণে বিদ্ধ করেই যাঁরা সেলিব্রেটি হয়ে উঠেছিলেন দেখুন একে একে তাঁদের কী সুন্দর পোষ মানিয়ে ছেড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাইপলাইনে আরও কে কে আছেন কে জানে!

তৃণমূলে রোজই নবীনবরণ

মমতা গালমন্দ বড় একটা গায়ে মাখেন না। মাখলে নির্বেদ-ওমপ্রকাশ-জয়প্রকাশদের ঘরে ডেকে এনে চেয়ার দিতেন না। মমতা জানেন, পারিতোষিক পেলে নিন্দুকের মুখ আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। কংগ্রেস, বাম, বিজেপি- কার ঘর ভাঙতে বাকি রেখেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো? রাম,বাম,অতিবাম- সবাইকে ঘেঁটে ঘ বানিয়ে দিয়েছেন তিনি। বাঙালি আগে বড় মুখ করে আদর্শের রাজনীতির বড়াই করত। বিহার-ইউপির আয়ারাম-গয়ারাম কালচারকে বিদ্রুপে ভরিয়ে দিয়ে আত্মশ্লাঘা অনুভব করত। আর আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সর্বাধিক চর্চিত শব্দ ‘দলবদলু’। আদর্শবাদী বাঙালি এখন দল করেই বদলের জন্য। উন্নয়নের খাতিরে দল বদলে লজ্জা কীসের?

তৃণমূলের বড় মাপের নেতারাও জানেন না আজ তাঁদের দলে নতুন কে জয়েন করবে। রোজ‌ই নবীনবরণ লেগে রয়েছে তৃণমূলে। শুনেছি তৃণমূলের পুরোনো নেতারা আজকাল বেশ ভয়ে থাকেন কোন নতুনের আগমনে তাঁদের পদটি যায় ফস্কে। রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাঁদের প্রথম কাজ নতুন ক’জনের হাতে দলের ঝান্ডা তুলে দিতে হবে ব্যাজার মুখে সেই লিস্টটি চেক করা।

কার‌ও দিকে ফিশফ্রাইয়ের প্লেট এগিয়ে দিতে মমতার যতটা সময় লাগে তার চেয়েও কম সময়ে মমতা একজনকে পদাভিষিক্ত করতে পারেন অথবা আরেকজনের পদ কেড়ে নিতে। কারণ তৃণমূল সুপ্রিমো ভালোই জানেন তাঁর দলে পোস্ট একটাই। বাকিসব ল্যাম্পপোস্ট। ল্যাম্পপোস্টদের কাজ- একটি পোস্টকেই আলোকিত করে যাওয়া। পশ্চিমবঙ্গে এখন একটাই রাজনৈতিক মতবাদ- মমতাবাদ !

Feature photo is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published.