লখনউয়ের মসনদে সগৌরবে প্রত্যাবর্তন বিজেপির, সেমিফাইনালে পাঁচে চার, চব্বিশের রসদ ঘরে তোলা সারা মোদীর


সেমিফাইনালে বিজেপির স্কোর পাঁচে চার! নিঃসন্দেহে চব্বিশের ওয়ার্মআপ শুক্রবার থেকেই শুরু করে দেবেন মোদী। কংগ্রেস বিধ্বস্ত। বিরোধীরা ছত্রভঙ্গ। ধারেকাছে মোদীর কোন‌ও কমপিটিটার আপাতত কিন্তু চোখে পড়ছে না।

বিশেষ প্রতিবেদন:লখন‌উয়ে রাজ্যপাট রক্ষার লড়াইটা যতটা না যোগীর ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল মোদীর। ভোট হয়েছে পাঁচ রাজ্যে। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ফিরতে না পারলে এতক্ষণে চ্যানেলে চ্যানেলে হেডলাইন হত – “মোদী ম্যাজিক ভ্যানিশ!” কে না জানে দিল্লির গোলায় জয়ের ফসল তুলতে গেলে উত্তরপ্রদেশে ভালো আবাদ জরুরি। ১৪ এবং ১৯-এ দিল্লি দখলের যুদ্ধে মোদীকে ঢেলে দিয়েছে ইউপি। ২৪-এর লড়াইয়ে নামার আগে পর্যাপ্ত রসদ সংগ্রহের জন্য মোদী-শাহের কাছে লখনউ বিজয় ছিল একপ্রকার মাস্ট। বৃহস্পতিবার সূর্য মাঝ আকাশে যাওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে যায় দিনটা লখনউয়ে যোগীর, দিল্লীতে মোদীর। উত্তরপ্রদেশে বিপুল জয় তো আছেই পাঁচ রাজ্যের ভোটে চারটিতেই চ্যাম্পিয়ন বিজেপি।

দিল্লিতে দলের সদর দফতরে বিজয়োৎসবে মোদী,শাহ এবং নাড্ডা সহ বিজেপির শীর্ষ নেতারা।

ইউপিতে অখিলেশ যাদবের ‌হয়ে প্রচারে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন- পাঁচ রাজ্যের ভোট হচ্ছে চব্বিশের ফাইনালে ওঠার সেমিফাইনাল। সেমিফাইনালে বিরোধীদের ভরাডুবির দেখার পর দেশের রাজনৈতিক মহল একটা কথাই বলছে- ফাইনালের ম্যাচটা একতরফা হয়ে যাবে না তো? অনেক প্রত্যাশা জাগিয়েও বিজেপি বাংলা দখলে ব্যর্থ হ‌ওয়ায় মোদী-শাহ-নাড্ডা খানিকটা চাপে ছিলেন তো বটেই। কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ জনিত বিপর্যয়। গঙ্গায় লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ। জ্বালানির ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি। জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য। কৃষি আইনের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন। উন্নাও, হাথরস এবং লখিমপুর-খেরি কান্ড। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাঠ বেল্টে জমি হারানোর শঙ্কা। সব মিলিয়ে সেমিফাইনালে যোগী আদিত্যনাথের ফিরে আসার লড়াইটা বড় সহজ ছিল না। ইউপির বিধানসভা ভোট এক‌ই সঙ্গে ছিল যোগী এবং মোদীর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের লড়াই। কঠিন লড়াইয়ে অনবদ্য এক বিজয় ছিনিয়ে আনলেই দুই নায়ক।

অখিলেশ যাদবের জন্য এইবার ‌জমি ছিল যথেষ্ট‌ই অনুকূল। বিশেষ করে কৃষি আইনের জেরে বরাবরের শক্ত গড় পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের জাঠ বেল্টে বিজেপির জমি হারানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হ‌ওয়ার পর। শেষ মুহুর্তে কৃষি আইন প্রত্যাহার করে মোদী ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করেন বটে কিন্তু অনেকের‌ই ধারণা ছিল ইউপির ভোটের আগে বিজেপির ক্ষতি যা হ‌ওয়ার হয়ে গিয়েছে। গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে এক শাসককে পরপর দুই বার লখনউয়ের মসনদে ফেরায় না উত্তরপ্রদেশের জনগণ। তাই একটা জোরালো প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার মুখে গোরক্ষপুরের মোহন্তকে যে পড়তে হয়েছিল তাতে কোন‌ও সন্দেহ নেই। বাতাসে জয়ের গন্ধ পেয়েই সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মুলায়ম পুত্র। আঁটঘাট বেঁধে যুদ্ধে নেমেও এই যাত্রায় আর জয়ের মুখ দেখা হল না অখিলেশের। সংখ্যালঘুরা হাত উপুড় করেই সাইকেলে ভোট দিয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটে সামান্য আঁচড় কাটতেও ব্যর্থ ওয়াইসির মিম। মিমের ঝুলিতে গিয়েছে মাত্র ০.৪৮ শতাংশ ভোট।

সংখ্যালঘুরা ঢেলে ভোট দিয়েও অখিলেশের খোয়াইশ পূর্ণ করতে ব্যর্থ। নিঃসন্দেহে সতেরোর তুলনায় সমাজবাদী পার্টির ফল অনেক ভাল। নিজের কেন্দ্রে অখিলেশ জিতেছেন‌ও অনেক ভোটে কিন্তু দিনের শেষে মুলায়মের টিপুকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে বিরোধী নেতা হয়েই। ভোটের আগে থেকেই সংবাদ মাধ্যমের একটি মহল হাওয়া তুলেছিল যোগী যায় যায়। লড়াই নিঃসন্দেহে কঠিন ছিল। ঘনিষ্ঠ মহলে সেই আভাস দিচ্ছিলেন বিজেপির নেতারাও। উত্তরপ্রদেশের মাটি কামড়ে পড়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। ইভিএম খোলার পর দেখা গেল মোদী-যোগীকে বিমুখ করে নি জনতা জনার্দন। এক্সিট পোলেই ইঙ্গিত ছিল লখনৌয়ের মসনদে যোগীই ফিরবেন। বৃহস্পতিবার দুপুরের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় এক্সিট পোলগুলির দেওয়া পূর্বাভাসের থেকেও অনেক মজবুত জয় ছিনিয়ে এনেছে বিজেপি। এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে বিজেপি ও তার শরিকেরা মিলে ২৭০ পার। ম্যাজিক ফিগার থেকে অনেক বেশি। প্রায় ৬৮ শতাংশ আসন বিজেপি ও তার মিত্রদের দখলে। সতেরোর বিধ্বংসী জয়ের তুলনায় আসন অনেকটাই কমেছে। কিন্তু ফিরে আসার কঠিনতম লড়াইয়ে এই ফল দিল্লির দীনদয়াল ভবনের ঝানু মাথাদের কাছেও অপ্রত্যাশিত।

উত্তরপ্রদেশে বিজেপি একাই পেয়েছে ৪১.৫১ শতাংশ ভোট। বিজেপির ‌জন্য সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হল আসন কমলেও ভোটের হার বেড়েছে পদ্মের। সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে ৩২ শতাংশ ভোট। উত্তরপ্রদেশ থেকে বোধ হয় কংগ্রেসের পাট চুকিয়ে‌ই দিল জনগণ। হাতের ঝুলিতে সাকুল্যে দুটি আসন। কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোটের হারের দিকে তাকালে তাজ্জব না হয়ে পারা যায় না। দেশের গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি দেশের বৃহত্তম রাজ্যে ভোট পেয়েছে মাত্র ২.৩৮ শতাংশ! ইউপিতে ফিনিশ মায়াবতী‌ও। বহেনজির বহুজনের আসন ‘এক’-এ এসে ঠেকেছে। মুলায়ম-অখিলেশের সঙ্গে মায়াবতীর সুসম্পর্কের কথা ইউপির ঘরে ঘরে জানা। অখিলেশ উত্তর দিকে গেলে বহেনজি দক্ষিণে যাবেন‌ই। দলিত ভোটের ১২.৭৯ শতাংশ টেনে নিয়ে মুলায়ম পুত্রকে পথে বসিয়ে আজ নিশ্চয় নিজের দুঃখ ভুলে আনন্দে মেতেছেন মায়াবতী।

সপাকে বুলডোজ করে ক্ষমতায় ফিরলেন যোগীই।

সব আশঙ্কাকে ফুৎকারে উড়িয়ে এমন বিরাট জয় কীভাবে ছিনিয়ে এনে মসনদে ফিরলেন যোগী আদিত্যনাথ? অযোধ্যায় রাম মন্দিরের নির্মাণ বিজেপির হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে অটুট রেখেছে নিশ্চয়। তদুপরি আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং যোগীর কঠোর হস্তে গুন্ডা-মাফিয়া দমনে সন্তুষ্ট মধ্যবিত্তরাও ঢেলে ভোট দিয়েছে পদ্মে। অখিলেশের আমলের মাফিয়ারাজের দুঃসহ স্মৃতি এখনও ফিকে হয়ে যায় নি ইউপির অধিকাংশ মানুষের মন থেকে। বিশেষ করে যোগীর রাজত্বেই নিজেদের অনেক বেশি সুরক্ষিত মনে করেছেন উত্তরপ্রদেশের মহিলারা। নারী সমাজের সমর্থন যে যোগীর ফিরে আসাকে অনেকটাই নিশ্চিত করেছে সে ব্যাপারে কোন‌ও সন্দেহ নেই। এমনকি রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীরাও চুপচাপ পদ্মে ছাপ দিয়েছেন বলে ইভিএম খোলার পর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।‌ বিজেপির নেতারা যদিও বলছেন সেসব তো আছেই কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হল ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুফল হাতছাড়া করতে চান নি ইউপির মানুষেরা। সুশাসনের পাশাপাশি উন্নয়ন‌ই যোগীর জয়ের রাস্তাকে সুপ্রশস্ত করেছে বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা।

অপ্রতিরোধ্য মোদী! চব্বিশে মোদীক বেগ দেওয়ার মতো প্রতিপক্ষ কোথায়?

সেমিফাইনালে পাঁচে চার বিজেপি। ইউপি সহ প্রত্যেকটি রাজ্যেই ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে পদ্ম শিবির। পাঞ্জাবে আপের অভাবনীয় উত্থানের বিপরীতে কংগ্রেসের শোচনীয় ফল জাতীয় রাজনীতিতে নতুন কোনও অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। তবে শুক্রবার থেকেই মোদী যে চব্বিশের ওয়ার্মআপ শুরু করে দেবেন তাতে কোন‌ও সন্দেহ নেই। ধারেকাছে মোদীর কোন‌ও কমপিটিটার আপাতত কিন্তু চোখে পড়ছে না।

Photo Credit- Official FB page of BJP.


Leave a Reply

Your email address will not be published.