বিপ্লবী রাসবিহারী বসু: স্বজাতির কাছে উপেক্ষাই যাঁর প্রাপ্তি ! - nagariknewz.com

বিপ্লবী রাসবিহারী বসু: স্বজাতির কাছে উপেক্ষাই যাঁর প্রাপ্তি !


অথচ কী অনুপম দেশপ্রেম ! কী অনবদ্য বৈপ্লবিক জীবন ! কী অসামান্য ত্যাগ-তিতিক্ষা-সংগ্রাম ! আজাদ হিন্দ ফৌজের সলতে পাকিয়ে প্রদীপ সাজিয়ে যোগ্য সুভাষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনিই। আজ তাঁর প্রয়াণদিবস। বিপ্লবী রাসবিহারী বসুকে শ্রদ্ধাঞ্জলি-

ব্রিটিশের গোয়েন্দারা যদি ছিলেন বুনো ওল তবে তিনি ছিলেন বাঘা তেঁতুল। খোদ  বড়লাটের গালে চাটি মেরে আবার পুলিশকে ঘাটে ঘাটে ঘোল খাইয়ে শেষে সাগর পাড়ি দিয়ে বরাবরের মতো পগারপার – জীবনে আর কোনও দিন যাঁর টিকির নাগাল পায় নি ইংরেজ সেই বাঙালি বিপ্লবীর আজ মৃত্যুদিন। তিনি রাসবিহারী বসু। ১৯১৫ সালের ১২ মে দুপুর দুটোয় খিদিরপুর বন্দরের ৬ নম্বর ডকে অপেক্ষমান জাপানি জাহাজ ‘ সানুকিমারু ‘তে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই মাতৃভূমির মাটির সঙ্গে রাসুর ( স্বজন- সহযোদ্ধাদের কাছে এই নামেই পরিচিত ছিলেন রাসবিহারী বসু ) সম্পর্ক চিরজীবনের জন্য শেষ।  কিন্তু আমৃত্যু মাতৃভূমির মুক্তির জন্য নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন রাসবিহারী। কলকাতা থেকে ৫০০৪ কিলোমিটার দূরে দূরপ্রাচ্যের দেশ জাপানের সঙ্গে ভারতের জাতীয় আন্দোলনের যে যোগসূত্র ইতিহাস গেঁথে দিয়েছে তার ঋত্বিক পুরুষ রাসবিহারী বসু।

দেশত্যাগের সময় রাসবিহারী বসুর বয়স ছিল ঊনত্রিশ। ১৮৮৬র ২৫ মে বর্ধমানের সুবলদহে রাসবিহারীর জন্ম । যৌবনে প্রবেশের আগেই রাসুর মনে দেশাত্মবোধের উন্মেষ। আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার যখন বিচার চলছে তখনই বাংলা ছেড়ে দেরাদুনে আশ্রয় নেন রাসবিহারী। মেধাবী ছাত্র । তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সব দিকে নজর। পকেটে ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে আনা মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি। মনে বাসনা বিপ্লবী হ‌ওয়ার। পুলিশের চোখে ধুলো দিতে দেরাদুনে ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে বড়বাবুর চাকরি নেন রাসবিহারী। দেরাদুনে থাকতে থাকতেই বিপ্লবী বাঘাযতীনের দল যুগান্তরের সঙ্গে জুটে যান তিনি। বাঙালি যেখানে বিপ্লব সেখানে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে  ইউনাইটেড প্রভিন্স ( বর্তমান উত্তরপ্রদেশ ) ও পাঞ্জাব জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী যে সশস্ত্র আন্দোলন দানা বেঁধেছিল তার পেছনে ছিল একাধিক বাঙালির ইন্ধন ও অংশগ্রহণ।

বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের উপর বোমা নিহ্মেপের ঘটনা তৈলচিত্রে।

বাঙালির আন্দোলনের ঠ্যালায় বঙ্গভঙ্গ রদ করলেও বিদ্রোহী জাতটাকে শিক্ষা দিতে ১৯১২ তে রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নিল ইংরেজ সরকার। রাজধানী স্থানান্তর উপলক্ষে জশম না করলে কি চলে।‌ ১৯১২ র ২৩ ডিসেম্বর দিল্লিতে জমকালো সমারোহ।হাতির পিঠে চেপে বর্নাঢ্য  শোভাযাত্রা করে দরবার অভিমুখে চলেছেন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ , পাশে বড়লাটের ব‌উ। জুলুস  লালকেল্লার কাছাকাছি আসতেই বোমা পড়ল ভাইসরয়ের হাতি লক্ষ্য করে।  বাঙালি বসন্তকুমার বিশ্বাসের  ছোঁড়া বোমা  লক্ষ্যভ্রষ্ট না হলে সেদিন‌ই  পঞ্চভূতে মিলিয়ে যেত হার্ডিঞ্জের প্রাণবায়ু। হাতির পিঠ থেকে গড়িয়ে পড়েও জানে বাঁচলেন সস্ত্রীক বড়লাট। মরল কেবল বড়লাটের ছত্রধর এক ভারতীয় ভৃত্য । খোদ ভাইসরয়ের ঘাড়ের ওপর বোমা ! ইংরেজ সিংহের তো প্রেস্টিজ পাংচার। একজন নারীর বেশে বড়লাটের দিকে বোমা ছুঁড়েছিলেন বসন্ত বিশ্বাস। গোটা পরিকল্পনার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন দেরাদুন ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বাঙালি বড়বাবু। নাম রাসবিহারী বসু । ২৩ ডিসেম্বর সকালে দিল্লিতে বড়লাটের ওপর বোমা পড়ল। ২৪ তারিখ বিকেলে ঘটনার প্রতিবাদে দেরাদুনে রাজভক্ত প্রজাদের সভা। সভায়  অ্যানার্কিস্টদের প্রাণ খুলে গালমন্দ করে বক্তৃতা দিলেন কে ? না ফরেস্ট অফিসের হেডক্লার্ক রাসবিহারীবাবু। 

বড়লাটকে বোমা মেরে‌ দেরাদুনে বড়লাটের নাকের ডগাতেই দিব্যি ঘোরাফেরা করেছেন রাসবিহারী । দেড় বছর পর বড়লাটের গোয়েন্দাদের যখন বুদ্ধি খুলল তখন পাখি হাওয়া । ১৯১২ র ২৩ ডিসেম্বর থেকে ১৯১৫র ১২ মে – পাখিকে আর খাঁচায় পুড়তে পারে নি পুলিশ। যাকে বলে ঘোল খাইয়ে ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই ইংরেজদের তাবৎ ইন্টেলিজেন্স উইংসকে ঘোল খাইয়ে জাপানে পালিয়ে যান রাসবিহারী বসু। ফেরারি অবস্থাতেই, পুলিশ যখন কুকুরের মতো সর্বত্র তাঁর গন্ধ শুঁকে বেড়াচ্ছে, বিপ্লবের জাল বুনে চলছিলেন রাসবিহারী। ঐতিহাসিক হিন্দু-জার্মান মিউটিনি বা ‘ গদর ‘ বিদ্রোহ সংগঠিত করার পেছনে যাঁদের মস্তিষ্ক কাজ করেছিল তাঁদের অন্যতম  রাসবিহারী বসু। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে হিন্দু-জার্মান মিউটিনি একটা বিরাট বিয়োগান্তক অধ্যায়। এতে জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেশের ভেতরের বিপ্লবীদের পাশাপাশি ইউরোপ-আমেরিকার প্রবাসী ভারতীয়দের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক স্তরে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের দেশ থেকে উৎখাতের বিরাট চেষ্টা করা হয়েছিল।  হিন্দু-জার্মান মিউটিনি অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হলে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস অন্য রকম ভাবে লেখা হত।

সহধর্মিণী তোশিকোর সঙ্গে রাসবিহারী বসু।

হিন্দু-জার্মানান মিউটিনি বা গদর বিদ্রোহ শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হ‌ওয়ার পর হয় ধরা পড়ে শহিদ হ‌ওয়া নয় পালিয়ে যাওয়া ছাড়া রাসবিহারী বসুর সামনে তৃতীয় কোনও রাস্তা খোলা ছিল না। দেশত্যাগ‌ই মনস্থ করলেন রাসবিহারী। দলনেতা যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সহ অন্যান্য সহযোদ্ধাদের‌ও ইচ্ছাও ছিল অনুরূপ। হয়তো  ইতিহাসের‌ও অভিপ্রায় আলাদা কিছু ছিল না । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয় পরিচয়ে প্রিয়নাথ ঠাকুরের নামে পাসপোর্ট করিয়ে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ১৯১৫র ১২ মে দুপুরে কলকাতার খিদিরপুর বন্দরে জাপানি জাহাজে চড়ে বসেন তিনি। সেদিন রাত এগারোটা নাগাদ জাপানি জাহাজ ‘ সানুকি মারু ‘ খিদিরপুর ডক থেকে নোঙর তোলে । গঙ্গা বেয়ে জাহাজ চলছে। একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে রাতের কলকাতার আলো। ডেকে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো প্রিয় মাতৃভূমিকে দেখছেন বীর সন্তান। মহাবিপ্লবীর দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা। জাহাজ ভ্রমণকালে আরও একবার আবেগ সংবরণ করতে পারেন নি সহযোদ্ধাদের প্রিয় ‘ রাসুদা ‘। জাপানি জাহাজ তখন আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের আশপাশ দিয়ে যাচ্ছে । দূর থেকে পোর্ট ব্লেয়ারের আলো দেখে হাত দু’খানি জড়ো হয়ে আপনা থেকেই যেন কপাল স্পর্শ করে রাসবিহারীর। সেলুলার জেলে বন্দী সহবিপ্লবীদের কথা মনে হতেই ফের অশ্রুসিক্ত হল চক্ষুদ্বয়।

জাপানে দুই বিপ্লবী নায়ক এক মঞ্চে : নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও রাসবিহারী বসু।

দেশের কাজে দেশ ছেড়ে আর ঘরে ফিরে আসে নি দুই বাঙালি। দুই বোস। এক বোসের উপাখ্যান লিখতে বসে আরেক বোসকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। জাপানে বসে রাসবিহারী যে মালা গেঁথেছেন বিদায় বেলায় সেই মালাই তুলে দিয়ে যান সুভাষের হাতে।  মালাটির নাম ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’। জাপানকে কেন্দ্র করে পূর্ব এশিয়া জুড়ে ঝড়ের গতিতে ইন্ডিয়ান ডায়াস্পোরার ভেতরে যে অনবদ্য অভ্যুত্থান নেতাজি গড়ে তুলেছিলেন তার  সলতে পাকিয়ে দিয়ে গেছেন অন্য  কেউ নন সুভাষের স্বজাতি রাসবিহারী ১৯৪৫ এর ২১ জানুয়ারি মহান বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর জীবনদীপ নির্বাপিত হ। জাপান রাসবিহারী বসুকে যে সম্মান দিয়েছে তাঁর জন্মভূমি কি তাঁকে সেই সম্মান দিয়েছে ? বাঙালি বিপ্লবীদের স্বীকৃতি দিতে স্বাধীন ভারতের দিল্লিশ্বরদের কুন্ঠার শুরু কিন্তু সাতচল্লিশের ১৫ই অগাস্ট সকাল থেকেই।

Photo sources- Archives.

  


Leave a Reply

Your email address will not be published.