শেখার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পড়ুয়ারা, ‘লার্নিং পোভার্টি’ তীব্র হচ্ছে দেশে, আমাদের দিবানিদ্রা কি ভাঙবে না ?


শেখাটা পড়ুয়াদের অধিকার। শেখানোটা শিক্ষকদের দায়িত্ব। অতিমারির অজুহাতে স্কুল বন্ধ। দেশের লক্ষ লক্ষ শিশু শেখার অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে লার্নিং পোভার্টি বা শেখার দারিদ্র চরমে পৌঁছেছে। আমরা সবাই ঘুমাচ্ছি। আর কত ঘুমাবো ? লিখলেন উত্তম দেব –

বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের একটা বড় অংশের ছেলেমেয়ে এখন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ালেখা করে। একটু সঙ্গতি থাকলেই কেউ আর এখন সন্তানকে সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে পাঠায় না। ঠিক‌ই করে। আমাদের পরিবারেও তাই। কারণ নিজের ছেলেমেয়েরা কোয়ালিটি এডুকেশন পাক এটা কে না চায় ? সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলিতে যাঁরা শিক্ষকতা করছেন তাঁদের মধ্যে ক’জনের ছেলেমেয়েই বা সরকারি বাংলা মাধ্যমে পড়ালেখা করছে ? একটা সমীক্ষা হয়ে যাক না।

এই দৃশ্য আবার ফিরিয়ে আনতেই হবে । এখন স্কুল বন্ধ। ক্লাস নেই। দেশের লক্ষ লক্ষ শিশু লার্নিং পোভার্টির কবলে।

এই যে আজকে প্রায় দুই বছর ধরে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। এর ফলে সবথেকে বেশি সর্বনাশ হচ্ছে স্কুলের পড়ুয়াদের। যেই স্কুলে মানুষের জীবনের ভিত তৈরি হয় সেই স্কুল নিয়ে যা অবহেলা চলছে তা আমরা মোটামুটি মেনে নিচ্ছি কেন জানেন ? কারণ আমরা যারা মধ্যবিত্ত তাদের বেশির ভাগের ছেলেমেয়ে সরকারি বাংলা মাধ্যম ত্যাগ করেছে। এমনকি যাঁরা সরকারি স্কুলে পড়ান তাঁরাও নিজেদের ছেলেমেয়েকে নিজেদের স্কুলে পড়তে পাঠান না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি অনলাইন ক্লাস একটা আপৎকালীন ব্যবস্থা মাত্র। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অফলাইন ক্লাস বা ক্লাসরুমে পাঠদানের কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু তারপরেও স্কুল না খোলা পর্যন্ত অনলাইন ক্লাস‌ই পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়াই একমাত্র উপায়। পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা পর্ষদ,শিক্ষা দফতর সততার সঙ্গে সমীক্ষা করে দেখুক না রাজ্যের বাংলা মাধ্যম সরকারি স্কুলগুলিতে অনলাইন পড়ালেখার পরিস্থিতিটা ঠিক কী। সেই সঙ্গে তারা বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির অনলাইন লার্নিং নিয়েও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করুক। তারপর দুটোর মধ্যে তুলনা বিচার করে দেখুক কোথায় কেমন পড়ালেখা চলছে। বিবেক নামক পদার্থটা একেবারে মরে না গিয়ে থাকলে শিক্ষা দফতরের বড় বড় মাথা যাঁরা আছেন, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসচিব- সব দেখেশুনে তাঁদের বিবেক দংশনে মরে যেতে ইচ্ছা করবে। যদি বিবেক থাকে তবেই।

ভারতে অতিমারিকালে লার্নিং পোভার্টি বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন বিশ্ব ব্যাঙ্কের গ্লোবাল এডুকেশন ডিরেক্টর জাইমে সাভেদ্রা।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের গ্লোবাল এডুকেশন ডিরেক্টর জাইমে সাভেদ্রা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ভারতে ‘ লার্নিং পোভার্টি ‘ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। লার্নিং প্রোভার্টি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা মৌলিক সমস্যা। শেখাটা পড়ুয়াদের অধিকার। শেখানোটা শিক্ষকদের দায়। অতিমারির বহু আগে থেকেই সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির পড়ুয়ারা লার্নিং পোভার্টি বা শেখার দারিদ্রের শিকার। রাজধানী কলকাতার কথা ছেড়েই দিলাম। রাজ্যের জেলা সদরগুলিতে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির পরিণতি আজ কী? শহরের স্কুলগুলিতে প্রত্যেক বছর পড়ুয়ার সংখ্যা কমছে। এমনকি নামি ও বনেদি স্কুলগুলিও ছাত্রছাত্রী পাচ্ছে না। পশ্চিমবঙ্গে এখন এমন অনেক বাংলা মাধ্যম হাইস্কুল খুঁজে পাওয়া যাবে যেসব স্কুলে মোট পড়ুয়ার সংখ্যা একশর‌ও নিচে। সরকার সার্ভে করলে ছাত্রছাত্রী শূন্য হতে চলা স্কুলের সংখ্যার একটা পরিস্কার চিত্র পাওয়া যেতে পারে। শহরাঞ্চলে সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা কমছে কেন ? কারণ স্কুলগুলি অভিভাবকদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। যাঁরা পড়াচ্ছেন তাঁরাই তো তাঁদের ছেলেমেয়েদের নিজেদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। দোকানদার যদি নিজের দোকানের মশলাপাতি নিজের বাড়ির হেঁসেলে না পাঠায়, জানতে পারলে খরিদ্দাররা আর সেই দোকান থেকে জিনিস কিনবে?

ফুলের মতো শিশু। ভবিষ্যতের নাগরিক। পড়ালেখার অভাবে ভিত দুর্বল হয়ে গেলে এরা দাঁড়াবে কীভাবে ?

বিশ্ব ব্যাঙ্কের গ্লোবাল এডুকেশন ডিরেক্টর অতিমারি কালে শিশুদের লার্নিং পোভার্টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। করোনার ভয়ে প্রায় দুই বছর হতে চলল স্কুল বন্ধ। লার্নিং পোভার্টি কোন জায়গায় পৌঁছাতে পারে তা বুঝতে বিশ্ব ব্যাঙ্কের এডুকেশন ডিরেক্টর হ‌ওয়ার প্রয়োজন নেই। চোখকান খোলা রাখা অভিভাবক মাত্রেই টের পাচ্ছেন তাঁদের বাচ্চাদের কী সর্বনাশটা হচ্ছে। আমাদের সবার ছেলেমেয়ে এক‌ই মাধ্যমে পড়ালেখা করলে এতদিনে আমাদের সুখনিদ্রা টুটে যেত। আমরা পথে নামতাম। সমাজের সকল শিশুর ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আসুন এবার আমরা সরব হ‌ই। মুখটা একটু খুলি। মাঝি কত ঘুমাইবা !

Photo Credit- careers360,GrapeSeed,one world center and twitter. Feature and others images are symbolic.


Leave a Reply

Your email address will not be published.