নেতাজি নামটা হিমালয়ের থেকেও উঁচু, সুভাষকে টেনে নীচে নামানো কোনও ইতরের পক্ষে সম্ভব নয়


উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ভাটিয়াদের চাইতে কোনও অংশে কম ভালবাসেন না। এই কথাটা নগেন্দ্র রায় যেন মাথায় রাখেন। লিখলেন উত্তম দেব

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকেও কোন‌ও ভারতবাসীর পক্ষে অপমান করা সম্ভব! বাঙালির হৃদয়ে নেতাজির নামে আলাদা একটা আবেগ কাজ করে সত্যি কিন্তু ভারতের সব প্রদেশের মানুষই সুভাষ বোসকে অন্য যে কোনও জাতীয় নেতার তুলনায় অনেক বেশি শ্রদ্ধা-সম্মান করেন। শুধু খন্ডিত ভারত নয়, ভারতীয় উপমহাদেশেই নেতাজি সম্মানিত। ইম্ফল থেকে পোরবন্দর- যে দেশপ্রেমিকের নামে জয়ধ্বনি ওঠে, তাঁকেই রোজ অপমানিত হতে হচ্ছে বাংলায়।

নিঃসন্দেহে বাঙালির একটা বড় অংশের কাছে নেতাজি ঈশ্বরের তুল্য। তবে সুভাষচন্দ্র বসুর রাজনৈতিক মত-পথ ও কর্মকান্ডের সঙ্গে সকলকেই সহমত হতে হবে, এমন দাবি কেউ করেন না। কিন্তু তা বলে নেতাজির মতো দেশপ্রেমিক সম্পর্কে কুৎসা, অপবাদ, মিথ্যা রটনা এবং চরম নিন্দনীয় ভাষায় অপমান সহ্য করে যেতে হবে? এই পশ্চিমবঙ্গের কোনও একটি অংশে কিছু মানুষ হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো মুখ দিয়ে অনর্গল নেতাজির বিরুদ্ধে কুকথা উদগিরণ করে যাবে, আমরা দুঃস্বপ্নেও কোনও দিন ভাবি নি।

কোচবিহার রাজ্যের শেষ মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুরকে নেতাজির কল্পিত শত্রু বানিয়ে দিয়ে নিজের সমর্থক-অনুগামীদের উস্কে দিয়েছেন গ্রেটার কোচবিহার ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা নগেন্দ্র রায়, যিনি তাঁর ভক্তবৃন্দের কাছে অনন্ত মহারাজ নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপি তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছে। দেশের সংবিধানের নামে শপথবদ্ধ একজন সাংসদ নেতাজির বাপান্ত করেছেন! চ্যানেলে চ্যানেলে তা প্রচারিত হয়েছে। কী অশালীন ভাষা! কী বিশ্রী শব্দচয়ন! কী তাচ্ছিল্য! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাঁকে দেশনায়ক বলে ডেকেছেন, আমরা যাঁকে প্রাণ ঢেলে ভালবাসি, তাঁর সম্পর্কে কুৎসিততম মন্তব্য করে নগেন্দ্র রায় শুধু পার পেয়েই যান নি, নগেন্দ্রর প্ররোচনায় ওনার উগ্র সমর্থকেরা সমস্ত সীমারেখা ছাড়িয়ে গেছে।

সামাজিক মাধ্যমে নেতাজিকে এমন কদর্য ভাষায়, এমন কুৎসিত ছবি দিয়ে অপমান করা হচ্ছে, যা দেখা মাত্রই শুধু বাঙালি নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কোনও সুস্থ, স্বাভাবিক, দেশপ্রেমিক ভারতীয় নাগরিকের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যাবে। ঠিক কোন হীন উদ্দেশ্যে অনন্ত মহারাজ ও তাঁর দলের সদস্যরা নেতাজিকে কালিমালিপ্ত করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন, আমরা তা জানি না। কিন্তু এর পরিণাম তাদের জন্য শুভ হবে না। আষাঢ়ে গপ্পো সাজিয়ে নেতাজিকে কোচবিহারের মহারাজা ও রাজ পরিবারের কল্পিত শত্রু বানিয়ে কোনও অশুভ শক্তি কিছু মাত্র রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে পারবে না।

আমাদের প্রিয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। বিদ্রোহী সুভাষ চির-উন্নত শির! ফাইল ফটো।

উত্তরবঙ্গ ও অসমের রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ভাটিয়াদের চাইতে কোনও অংশে কম ভালবাসেন না। কোচবিহারের রাজনৈতিক ইতিহাস তার প্রমাণ। এই অঞ্চলের ভাটিয়াদের‌ও কোচবিহারের মহারাজাদের প্রতি শ্রদ্ধার কোনও কমতি নেই। উত্তরবঙ্গের কোন মানুষটা কোচবিহারের মহারাজাদের, কোচবিহারের রাজপরিবারকে অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা করেছে? কোচবিহারের মহারাজারা ভারতের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন অবিচ্ছেদ্য অংশ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

কোচবিহারের মহারাজাদের অতীত গৌরবোজ্জ্বল। শুক্লধ্বজ চিলারায়ের বীরত্ব আমাদের মুগ্ধ করে। বাঙালিদের সঙ্গে কোচ রাজাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। ব্রাহ্ম সমাজের নেতা কলকাতার কেশব সেনের কন্যা সুনীতি দেবী কোচবিহারের মহারানি হয়েছিলেন। জনকল্যাণমূলক কাজের দ্বারা কলকাতার মেয়ে সুনীতি দেবী কোচবিহারবাসীর হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপবাহাদুরের আমন্ত্রণে প্রখ্যাত দার্শনিক আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেছিলেন। কোচবিহারের রাজসভা গুণিজনদের সমাদর করত। কোচবিহারের শেষ মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ উদারমনা ও প্রজাবৎসল ছিলেন।

মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ বাহাদুর। কোচবিহারের শেষ মহারাজা, যিনি ১৯৪৯ সালের ২৮ আগস্ট চুক্তি স্বাক্ষর করে রাজ্যকে ভারত সরকারের হাতে তুলে দেন।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, কোচবিহার ছিল ৫৬৫ টা প্রিন্সলি স্টেট বা দেশীয় রাজ্যের একটি। এদের করদ রাজ্য‌‌ও বলা হত। লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা (The Subsidiary Alliance) নীতি (১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত) স্বীকার করে নিয়ে দেশীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশদের বশ্যতা স্বীকার করে চলতে হত। যে রাজারা ব্রিটিশদের বশ্যতা মানেন নি, তাঁদের যুদ্ধে হেরে রাজ্যহারা হতে হয়েছিল। ক্লাস সেভেনের ছাত্রছাত্রীও এইসব ইতিহাস জানে। নগেন রায় ও তাঁর দামড়া অনুগামীরা জানেন না দেখে আশ্চর্য হচ্ছি। কোচবিহারের রাজাদের জন্য ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় ১৩ টি তোপ সেলামি বরাদ্দ করেছিলেন। বাকি সব দেশীয় রাজাদের মতো কোচবিহারের রাজারাও ব্রিটিশ সম্রাটের ‘প্যারামাউন্টসি’ বা সর্বাধিপত্য মেনে নিয়েছিলেন। তাঁরা ছিলেন ব্রিটিশদের একান্ত অনুগত। কষ্ট হলেও এই তিক্ত সত্য মানতে হবে।

যুদ্ধবিগ্রহ বাধলে দেশীয় রাজাদের অর্থবল, সৈন্যবল নিয়ে ইংরেজ শক্তির পাশে দাঁড়াতে হত। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোচবিহার সহ অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য‌ই সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রিটিশকে অর্থ, রসদ ও সৈন্য জোগান দিয়েছিল। মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ স্বয়ং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়ে লড়াই করতে তাদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। একজন ব্রিটিশ অনুগত দেশীয় রাজা হিসেবে ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়াতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সেই বাধ্যবাধকতা ছিল না। নগেন রায় ও তাঁর অনুগামীরা যেন এই কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে নেন।

বাঙালি সুভাষ চির বিদ্রোহী। সুভাষচন্দ্র বসু একপ্রকার না পড়েই আইসিএসে চতুর্থ হয়েছিলেন! এমন‌ই ছিল তাঁর মেধা। শুধুমাত্র বাবার মন রক্ষায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিলেতে গিয়ে আইসিএস পরীক্ষায় বসেছিলেন তিনি। ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে যে আইসিএস ক্যাডার হ‌ওয়ার জন্য ধনীর দুলালেরা কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করত। সেরা র‍্যাঙ্ক করে সেই আইসিএস পাশ করেও লোভনীয় চাকরির মুখে লাথি মেরে স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন সুভাষ। দেশে ফিরে মোটা বেতনে ব্রিটিশের গোলামি না করে সামান্য বেতনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার
চাকরি নিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসনের ‘গভর্নমেন্ট প্লিডার’ জানকীনাথ বসুর অবাধ্য পুত্রটি।

ওরে অর্বাচীন মূর্খের দল, কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতাটি পড়েছিস? ফেসবুকে ভুলভাল, গালগল্প না লিখে পড়ে নিস। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মূর্ত প্রতীক হলেন সুভাষ। বিদ্রোহী সুভাষ চির-উন্নত শির! মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভূপবাহাদুরের প্রতি যথেষ্ট সম্মান রেখেই বলছি একজন ব্রিটিশ অনুগত রাজার সঙ্গে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের একজন মহানায়কের মহাকাব্যিক জীবনের কোন‌ও তুলনা চলে?

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় রাজ্যগুলির ওপর ব্রিটিশ প্যারামাউন্টসি বিলুপ্ত হয়। অন্যান্য দেশীয় রাজ্যগুলির মতো কোচবিহার‌ও Instrument of Accession এবং Merger Agreement-এ স্বাক্ষর করে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৪৯ সালের ২৮ আগস্ট কোচবিহারের শেষ মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ভারত সরকারের সঙ্গে এই দুই চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সাথে সাথেই কোচবিহারে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মেই দুনিয়া থেকে রাজা-মহারাজারা হারিয়ে গেছেন। কোচ রাজবংশ‌ও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯৪৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘সি’ ক্যাটাগরির রাজ্য হিসেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা শাসিত হ‌ওয়ার পর ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কোচবিহার একটি জেলা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। এর বাইরে আর কোনও ইতিহাস নেই। বাকিটা গালগল্প।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ- কার‌ও সম্পর্কেই কুৎসা, অপপ্রচার, অসম্মানজনক মন্তব্য কাম্য নয়। কেউ আগুন নিয়ে খেলবেন না। বিদ্বেষের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলে কার‌ও ঘর‌ই কিন্তু রক্ষা পাবে না। আর প্রশাসন যেন মূক, বধির ও অন্ধ হয়ে বসে না থেকে রাজধর্ম যথাযথ পালন করে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এক শ্রেণির ইতর কদর্য, কুৎসিত সব পোস্ট সমানে করে চলেছে। অভিযোগ‌ও হচ্ছে। পুলিশ নীরব কেন? জনতাকে বলা হয় জনার্দন। তারা কিন্তু বোকা নন।

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com