ডেস্ক রিপোর্ট: ভোটের ফল প্রকাশের প্রায় চল্লিশ দিন পর সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়েই বিস্ফোরক অনুব্রত মণ্ডল। দিদির কেষ্ট! এক সময় যাঁর কথায় বীরভূম জেলায় বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। ৪-মের পর থেকে বোলপুরের নীচুপট্টির বাড়িতেই দিনের অধিকাংশ সময় ঘাঁপটি মেরে থাকেন অনুব্রত। বিকেল হলে এক-দেড় ঘন্টার জন্য বোলপুর তৃণমূলের শুনসান দফতরে গিয়ে বসেন, তারপর বাড়ি ফিরে আবার দোরে খিল এঁটে শুয়ে পড়েন।

ভোটের ফল ঘোষণার এত দিন পর কেষ্ট মুখ খুলতেই বোঝা গেল, তিনিও ভাইপোর উপর বড়ই রুষ্ট! খুব সম্ভবত তৃণমূলে এখন পিসি ও উপাসনা চৌধুরী ছাড়া আর কেউ ভাইপোর ফেভারে নেই। এমনকি সাংসদ সায়নী ঘোষ পর্যন্ত নাকি অভিষেককে ছেড়ে ঋতব্রতর ভালো তৃণমূলে নাম লেখাতে উদগ্রীব! সংবাদ মাধ্যমের সামনে আইপ্যাককে যাচ্ছেতাই গালমন্দ করেছেন অনুব্রত মণ্ডল। তৃণমূলে আইপ্যাক মানেই অভিষেক, অভিষেক মানেই আইপ্যাক। এই আইপ্যাককেই রীতিমতো তোলাবাজ বলে উল্লেখ করেছেন অনুব্রত।
মমতাকে একা দেখে খারাপ লাগছে
আইপ্যাকের সঙ্গে শলাপরামর্শ করে দল চালিয়েছেন অভিষেক। আর এই অভিষেকের হাতে দল তুলে দেওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেও যথেষ্ট অসন্তুষ্ট কেষ্ট মন্ডল। যে কেষ্টর মাথায় ছিল দিদির দুই হাত, সেই কেষ্ট আজ সাংবাদিকদের বলছেন, “দেখুন মমতা ব্যানার্জি একা হয়েছেন। খারাপ লাগছে। কারণ, মমতা ব্যানার্জিকে ভালবাসতাম। আমি কেন, অনেকজনই ভালবাসত। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি শেষ দিকে কার পাল্লায় পড়ল, আমরা বুঝতে পারলাম না!”
শুধু টাকা তুলে বেড়াত আইপ্যাক
অনুব্রতর কথা থেকে পরিষ্কার, তিনি আগে মমতাকে ভালবাসতেন কিন্তু এখন বাসেন না। কেন এখন আর মমতাকে তিনি মমতাকে আর ভালবাসেন না, তা খোলসা করতে বাকি রাখেন নি অনুব্রত মণ্ডল। অনুব্রত চাঁচাছোলা ভাষায় জানিয়েছেন, দলের সর্বনাশের জন্য আইপ্যাক দায়ী। অনুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘আজ ভরাডুবি হল আইপ্যাকের জন্য। মিসগাইড করল আইপ্যাক। দুনিয়ার লোকের কাছ থেকে টাকা তুলল আইপ্যাক। এমন কোনও লোকের কাছে নাই যে টাকা তোলে নাই। পঞ্চায়েত ইলেকশনে টাকা তুলেছে। মিউনিসিপ্যালিটি ইলেকশনে টাকা তুলেছে।” এমনকি দলের ভেতরে পদ পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়েও আইপ্যাকের লোকেরা টাকা তুলেছে বলে অভিযোগ করেন অনুব্রত। অনুব্রত মণ্ডল বলেন, ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে পৃথক দল গঠনের পর থেকে আমাদের মতো রাখাল-বাগালেরাই তৃণমূলকে দাঁড় করিয়েছে। কোনও আইপ্যাক ছিল না।
জেগে ঘুমিয়ে ছিলেন মমতা
আইপ্যাকের এইসব কুকীর্তির কথা দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এমনকি অভিষেক-মমতাও জানতেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন অনুব্রত মণ্ডল। বীরভূম জেলা তৃণমূলের প্রাক্তন সভাপতি বলেন, “এইবার কেউ যদি জেগে ঘুমায়, আপনি কী করবেন। জেগে ঘুমালে দলের তো এই অবস্থাই হবে। দল সংগঠন দিয়ে চলে। আইপ্যাক দিয়ে কি দল চলে!” অনুব্রতর ইশারায় স্পষ্ট, আইপ্যাক ও অভিষেকের যৌথ উদ্যোগে দলের ভেতরে তোলাবাজির খবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানতেন কিন্তু থামানোর চেষ্টা করেন নি।
এবারের ভোটে দল আমাকে দায়িত্ব দেয় নি
গরু পাচার মামলায় ইডি-সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন তিহাড় জেলে ছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। জামিন পেয়ে ঘরে ফিরে আসার পর তাঁকে আর আগের মতো গুরুত্ব দেয় নি তৃণমূল। এবারের বিধানসভা নির্বাচনেও অনুব্রত মণ্ডলকে সেভাবে প্রচারে দেখা যায় নি। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশেই যে তাঁকে এবার ভোটের দায়িত্ব দেওয়া হয় নি, সাংবাদিকদের কাছে তা স্বীকার করেছেন অনুব্রত মণ্ডল। অনুব্রত বলেন, “এবারে যেমন আমাকে ভোটের দায়িত্ব দেয় নি। কোর কমিটির মিটিংয়ে বলেছে, কোনও এমএলএ ডাকলে আপনি যাবেন। তা আগ বাড়িয়ে আমার ভোট করতে যাওয়ার দরকার কী আছে? ওই জন্য আমি এবার সে রকম ভোট করি নাই।”
কংগ্রেসকে চটানোটা দলের ভুল হয়েছে
২০১১ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এসে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ও কংগ্রেসের সংগঠন ভাঙা দলের উচিত হয় নি বলে মনে করেন অনুব্রত মণ্ডল। তিনি বলেন, “এগারো সালে যখন পার্টি পাওয়ারে আসে তখন আইপ্যাক ছিল না। কংগ্রেসের সঙ্গে অ্যালায়েন্স করে ক্ষমতায় এসেছিলাম। কংগ্রেসকে চটানোটা আমাদের ভুল হয়েছে। কিন্তু কে কার কথা শোনে!” কংগ্রেসের দূরে ঠেলে দেওয়ার জন্য সুপ্রিমো মমতার দিকেই যে অনুব্রত অভিযোগের আঙুল তুললেন, তা অনুব্রতর কথাতেই স্পষ্ট। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের ৫৪ জন বিধায়ক বিধানসভায় পৃথক পরিষদীয় দল গঠন করায় দোষের কিছু দেখছেন না অনুব্রত মণ্ডল। অনুব্রত বলেন, “তাঁরা বিজেপিতে না গিয়ে আলাদা একটা ফ্রন্ট গড়েছে। তাঁরা অন্যায় করে নি। খারাপ তো কাজ করে নি কিছু।”
সম্মান না পেলে দল করব না
সাংবাদিকেরা অনুব্রত মণ্ডলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে অনুব্রত মণ্ডলের ঝটতি উত্তর- “সম্মান পেলে দল করব। সম্মান না পেলে চুপচাপ বসে থাকব। দল করব না।” কংগ্রেস বা বিজেপিতে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে অনুব্রত বলেন, “কংগ্রেস বা বিজেপিতে যাওয়ার এখনও চিন্তাভাবনা করি নি। এখনও পর্যন্ত পিঠে তৃণমূলের স্ট্যাম্পটাই লেখা আছে।” জেল থেকে ফেরার পর থেকেই তিনি এক প্রকার রাজনৈতিক সন্ন্যাসে আছেন বলে দাবি করে কেষ্ট জানান, “জেল থেকে আসার পর রাজনীতি করা বন্ধ করে দিয়েছি। দিদিও জানে। সবাই জানে, রাজনীতি করা বন্ধ করে দিয়েছি।”
Feature graphic is representational and AI generated.