ইরানে সর্ষের ভেতরেই যে ভূত লুকিয়ে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ৪৭ বছর ধরে যে ‘রেজিম’ ইরানকে চালাচ্ছে, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন মোসাদের চর! আরও যা লিখেছেন উত্তম দেব-
২০২৫-এর জুনে ইরান-ইজরায়েলের মধ্যে যখন সামরিক সংঘাত চলছিল, তখন ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পগুলি লক্ষ্য করে জবরদস্ত হামলা চালিয়েছিল আমেরিকা। সেই সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তারা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের ঠিকানা জানেন, চাইলেই তাঁকে খতম করে দিতে পারতেন। পঁচিশে এগার দিনের সংঘাত চলাকালে খামেনেইকে হত্যার উদ্দেশ্যে ইজরায়েল জোরদার কোনও প্রচেষ্টা চালিয়েছিল কিনা স্পষ্ট নয়। তবে সে যাত্রা নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন খামেনেই। এবার পয়লা রাতেই বিড়াল মেরে দিল আমেরিকা-ইজরায়েল। যুদ্ধের শুরুতেই একটা দেশের সর্বোচ্চ নেতা প্রতিপক্ষের হাতে নিহত! পৃথিবীতে যুদ্ধের ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির নেই।
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ যে অবশ্যম্ভাবী, এটা সবাই জানত। গত কয়েক সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের যাবতীয় প্রস্তুতি সেরে ফেলেছিলেন ট্রাম্প। বাচাল ট্রাম্প বাগাড়ম্বর না করে কোনও পদক্ষেপ করেন না। তিনি রীতিমতো বলেকয়েই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন। তেহরানকে একাধিকবার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আমেরিকা-ইজরায়েলের কাছ থেকে বড় ধরণের হামলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল ইরানও। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) ভোরে ইরানের উপর আমেরিকা-ইজরায়েলের প্রচন্ড বিমান-মিসাইল ও ড্রোন হামলাকে তাই আর যাই বলা চলুক, অতর্কিত বলা চলে না।
ইজরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমেরিকার বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে যখন রাজধানী তেহরান সহ ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমানগুলি এগিয়ে আসছিল, তখনও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অন্ধকারে। শনিবার সকালে তেহরানের কোন সুরক্ষিত কম্পাউন্ডে ঠিক কটার সময় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই তাঁর সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন, সেই খবর মোসাদ ও সিআইএ-র গোয়েন্দাদের কানে আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। তেহরানের আকাশে পৌঁছে নিখুঁত নিশানায় বোমা ফেলতে শুরু করে ইজরায়েল-আমেরিকার বিমানগুলি। মোট ২০০টি বিমান শনিবার ভোরের অভিযানে ব্যবহার করেছিল ইজরায়েল-আমেরিকা।
ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেই ইরানের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে সম্পূর্ণ অকেজো করে দেয় ইজরায়েলের বিমান বাহিনী। চিনের কাছ থেকে পাওয়া ইরানের রাডার ব্যবস্থা ইজরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলি চিহ্নিত করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। চিনের প্রযুক্তিতে তৈরি রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়, আরও একবার তা প্রমাণিত। ইরানের বিমানবাহিনী পাল্টা আক্রমণে অক্ষম। গুলি ছোঁড়ার আগেই ইরানের অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানগুলি ইজরায়েল-আমেরিকার বিমান আক্রমণে অকেজো। শনিবার ভোরে পয়লা দফা বিমান হামলার সময়েই ইরানের আকাশের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে ইজরায়েল-আমেরিকা।

খামেনেই যে কম্পাউন্ডে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধান সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন, সেই কম্পাউন্ড লক্ষ্য করে তিরিশটি বোমা ফেলে ইজরায়েলের একাধিক যুদ্ধবিমান। কম্পাউন্ডটি মাটিতে মিশে যায়। খামেইনি সহ উপস্থিত অন্যান্যরা কেউই নিরাপদ স্থানে পালানোর সুযোগ পান নি। এই হামলাতেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হন। মারা যান তাঁর মেয়ে, জামাই ও নাতনিও। বাঁচতে পারেন নি ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ, আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদুল রহিম মৌসাভি এবং খামেনেইয়ের নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলি শামখানিও। একই স্থানে একই বিমান হামলায় ইরান হারায় সর্বোচ্চ নেতা সহ চারজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাকে! রবিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যমে ট্রুথ সোশ্যালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে এখনও পর্যন্ত ইরানের ৪৮ জন শীর্ষ পর্যায়ের নেতা নিহত হয়েছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইজরায়েলের যৌথ অভিযান তিন দিনে গড়িয়েছে। অভিযান চার সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত যুদ্ধের যা গতিপ্রকৃতি, তাতে একটি ব্যাপার পরিষ্কার, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমান বাহিনী বলতে কার্যত কিছু নেই। ইরানের আকাশ পুরোপুরি আমেরিকা-ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। যুদ্ধ বিলম্বিত হলে বিনা প্রতিরোধে গাজার মতোই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে ইরান। ইরানের ধর্মাশ্রিত শাসনব্যবস্থায় সর্বেসর্বা ছিলেন ৮৬ বছরের আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই। তাঁর পদটিকে বলা হয় সর্বোচ্চ নেতা। ইরানের ধর্ম, সমাজ, শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতিতে শেষ কথা বলেন এই পদে আসীন ব্যক্তি। টানা ৩৮ বছর সর্বোচ্চ নেতার পদে ছিলেন খামেনেই। সেই খামেনেইকেই রক্ষা করতে পারে নি ইরান! খামেনেই কোথায় কখন থাকেন, কখন কী করেন; কড়া সুরক্ষা বলয় ভেদ করে তা জেনে ফেলেছিল মোসাদ ও সিআইএ।
ইরানে সর্ষের ভেতরেই যে ভূত লুকিয়ে, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ৪৭ বছর ধরে যে ‘রেজিম’ ইরানকে চালাচ্ছে, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন মোসাদের চর! দেশটির সেনাবাহিনী, বিভিন্ন নিরাপত্তা এজেন্সি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, পুলিশ এমনকি সরকারের শীর্ষস্তরে পর্যন্ত মোসাদের জাল বিস্তৃত। বহু বছর ধরেই ইরানের অভ্যন্তরে মোসাদের জাল বিস্তৃত। অনেক গুপ্তচরকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়েও দেশকে মোসাদের প্রভাবমুক্ত রাখতে ব্যর্থ ইরান সরকার। এখনও পর্যন্ত ইরানের শীর্ষতম পরমাণু বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহ সহ কমপক্ষে ১০ জন ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছে মোসাদ। আসলে তেহরানের থিয়োক্রেটিক রেজিমকে বাইরে থেকে দেখতে যতটা লৌহদৃঢ় বলে মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে তেহরানে গিয়ে ২০২৪-এর ৩১ জুলাই শেষরাতে নিহত হন হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া। তেহরানের সবথেকে সুরক্ষিত অঞ্চলে নিজের আবাসনে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিলেন হানিয়া। হামাস প্রধানকে দূর নিয়ন্ত্রিত বোমার সাহায্য তাঁর শয়নকক্ষেই উড়িয়ে করে দেয় মোসাদ! দূর নিয়ন্ত্রিত ‘এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস’টি দুই মাস আগেই ইসমাইল হানিয়ার আবাসনের গেস্ট রুমে ফিট করে এসেছিল মোসাদের লোকেরা। তেহরানে ইসমাইল হানিয়ার জানাযায় অংশ নিয়ে অশ্রুপাত করতে দেখা গিয়েছিল সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইকে। দেড় বছরের মাথায় তেহরানে নিজের সুরক্ষিত বাসভবনে ইজরায়েলের ফেলা বোমায় নিহত হলেন খামেনিই নিজেই।
খামেনেইয়ের উত্তরসূরী বাছাইয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছে ইরানের মোল্লাতন্ত্র। অন্তর্বর্তীকালীন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ৬৭ বছর বয়সী ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফিকে মনোনীত করেছে ইরানের ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’। তবে ভবিষ্যতে আরাফিই পাকাপাকিভাবে সর্বোচ্চ নেতার পদে বসবেন কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নেতার তালিকায় খামেনেইয়ের পুত্র ৫৬ বছরের মোজতবা খামেনেইও রয়েছেন। এঁরা কেউই ধারে-ভারে, ভাবমূর্তিতে সদ্য নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নন। ইরানের ক্ষমতাসীন মোল্লাতন্ত্র ও শাসকগোষ্ঠী বহুদিন ধরেই একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত। খামেনেই নিজের প্রতাপ ও জনপ্রিয়তার দ্বারা সব গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। তাঁর অবর্তমানে যিনিই সর্বোচ্চ নেতার পদে বসবেন, তাঁর পক্ষে বহুধাবিভক্ত ধর্মগুরুদের ঐক্যবদ্ধ রাখার কাজটি বড় সহজ হবে না, যখন কিনা ইরানের বিশাল সংখ্যক জনগণ মোল্লাতন্ত্রের প্রতি চরম বিরক্ত ও এই মুহূর্তেই এই ব্যবস্থার অবসান চান।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরে বহু ইরানির যেমন চোখ অশ্রুসিক্ত, তেমনি অসংখ্য ইরানি আনন্দিত। খামেনেই খতম- এই খবর শোনা মাত্রই ইরানের ভেতরে হর্ষোল্লাসে মেতে উঠেছেন বহু মানুষ। যুদ্ধ চলছে। যখন-তখন মাথার উপর বোমা পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ, গোয়েন্দা বাহিনী ও নিরাপত্তা এজেন্সির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে ইরানি জনগণের উচ্ছ্বাস প্রকাশের ঘটনা সহজ ব্যাপার নয়। মনে রাখতে ইরান জুড়ে প্রবল গণবিক্ষোভে নিহতদের রক্তের দাগ এখনও শুকোয় নি। বিক্ষোভ দমনে চরম নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছে মোল্লাদের রেজিম। নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি বলে একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৯৭৯-র ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে ইরানের রেজিমকে সাম্প্রতিক সময়েই সবথেকে দুর্বল বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল।
চলতি যুদ্ধ রেজিম চেঞ্জের মধ্য দিয়ে শেষ হবে কিনা, তা এখনও জোর দিয়ে বলার সময় আসে নি। তবে যুদ্ধ ইতিমধ্যেই ইরানের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। যুদ্ধ শেষে মোল্লাতন্ত্র কোনওভাবে টিকে থাকলেও তা যে আরও বেশি দুর্বল ও বিধ্বস্ত হয়ে পড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।
Feature graphic is representational and designed by NNDC.