পশ্চিমবঙ্গ সহ দেশের অধিকাংশ রাজ্য থেকেই বিধান পরিষদ তুলে দেওয়া হয়েছে। বিধান পরিষদ কী এবং কীভাবে গঠিত হয়, আপনাকে জানাচ্ছে আমাদের প্রতিবেদন—
উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার এবং কর্নাটক— এই চার রাজ্যে বিধান পরিষদের ২৮ টি আসনে ভোট হয়েছে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর)। গণনা হয়েছে বুধবার (২৮ অক্টোবর)। ফল ঘোষণাও শেষ। বাংলার মানুষ লোকসভা, বিধানসভা ও রাজ্যসভার সঙ্গে পরিচিত হলেও বিধান পরিষদ নামটার সঙ্গে তেমন পরিচিত নন। কারণ পশ্চিমবঙ্গে বিধান পরিষদ বলে কিছু নেই। বিধান পরিষদ ঠিক কী?

আসলে বিধান পরিষদ হল রাজ্য আইনসভার উচ্চকক্ষ। কেন্দ্রীয় আইনসভা বা সংসদের উচ্চকক্ষ যেমন রাজ্যসভা। তবে উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা যেমন সংসদের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, বিধান পরিষদের বেলায় তেমন নয়। রাজ্যের আইনসভায় বিধান পরিষদ থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। বিধান পরিষদ গঠনের সংস্থান সম্পূর্ণ সাংবিধানিক হলেও ঐচ্ছিক। অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞই বিধান পরিষদকে বাহুল্য বলে মনে করেন। বর্তমানে ভারতের মাত্র ছয়টি রাজ্যে বিধান পরিষদ রয়েছে।
রাজ্যগুলি হল—
- উত্তরপ্রদেশ
- বিহার
- মহারাষ্ট্র
- কর্নাটক
- অন্ধ্রপ্রদেশ
- তেলেঙ্গানা
পশ্চিমবঙ্গে কবে বিলুপ্ত হয়েছিল বিধান পরিষদ?
পশ্চিমবঙ্গের আইনসভায় বিধানসভার পাশাপাশি উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদ ছিল। ১৯৫২ সালে রাজ্যে প্রথম বিধান পরিষদ গঠন করা হয়। এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৫১ জন। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পালা বদল হয়। কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে সিপিএম সহ বাম দলগুলির নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট সরকার। যুক্তফ্রন্ট সরকার বিধান পরিষদ চালু রাখার পক্ষে ছিল না। ১৯৬৯-এর মধ্যবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে জিতে ফের যুক্তফ্রন্ট রাজ্যে সরকার গঠন করে।

দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার বিধান পরিষদ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৬৯ সালের ২১ মার্চ রাজ্য বিধানসভায় বিধান পরিষদ বিলুপ্ত করার বিলটি পাশ হয়। পরে বিলটি দেশের সংসদেও গৃহীত হলে ‘দ্য ওয়েস্টবেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল (অ্যাবোলিউশন) অ্যাক্ট-১৯৬৯’ আইনের বলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিধান পরিষদ বিলুপ্ত হয়। আইনটি ঊনসত্তরের ১ আগস্ট কার্যকর হয়, ওই দিন থেকেই বাংলায় বিধান পরিষদ বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কীভাবে বিধান পরিষদ গঠন কিম্বা বিলুপ্ত হয়?
কোনও রাজ্য সরকার চাইলেই একক সিদ্ধান্তে বিধান পরিষদ গঠন করতে বা বিলুপ্ত করতে পারে না। এর জন্য সংবিধানের ১৬৯ অনুচ্ছেদে নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে।
- প্রথমে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভায় এই বিষয়ে বিল আনতে হয়। সেই বিল পাশ করাতে হয়। বিলটি পাশের জন্য বিধানসভার মোট সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন দরকার।
- বিধানসভায় পাশ হয়ে গেলেই বিলটি আইনে পরিণত হয় না। এরপর বিলটি দেশের সংসদে উত্থাপিত হয়। বিলটি সংসদে পাশ হলেই তা আইনে পরিণত হয়।
- সেই আইন লাগু হলেই বিধান পরিষদ গঠন বা বিলোপের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া পুরোপুরি সম্পন্ন হয়।
রাজ্য আইনসভার উচ্চকক্ষ বিধান পরিষদের সদস্যরা সরাসরি সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত হন না। সংবিধানের ৭১ অনুচ্ছেদে বিধান পরিষদের সদস্য নির্বাচন করার পাঁচ ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
- ১) স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার প্রতিনিধিদের ভোটে: বিধান পরিষদের এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন পুরসভা, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত সহ অন্যান্য স্বশাসিত সংস্থার প্রতিনিধিদের ভোটে।
- ২) স্নাতক নির্বাচকমন্ডলীর ভোটে: এক-দ্বাদশাংশ সদস্য নির্বাচিত হন যোগ্যতাসম্পন্ন স্নাতক ও স্নাতকোত্তরদের ভোটে। সাধারণত সংশ্লিষ্ট নির্বাচকমন্ডলীতে নাম নথিভুক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়।
- ৩) শিক্ষক নির্বাচকমন্ডলীর ভোটে: এক-দ্বাদশাংশ সদস্য নির্বাচিত হন নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নির্বাচকমন্ডলীর ভোটে। এই নির্বাচকমন্ডলীতে নাম তুলতে হলে নির্দিষ্ট সময় ধরে সরকার অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।
- ৪) বিধায়কদের ভোটে: প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের ভোটে।
- ৫) রাজ্যপাল মনোনীত সদস্য: অবশিষ্ট এক-ষষ্ঠাংশ সদস্যকে রাজ্যপাল স্বয়ং মনোনীত করেন। সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সমবায় আন্দোলন ও সমাজসেবার মতো ক্ষেত্রে বিশেষ জ্ঞান বা বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের বিধান পরিষলে মনোনীত করার রেওয়াজ আছে।
বিধান পরিষদের সদস্যসংখ্যার সীমা
বিধান পরিষদের সদস্যসংখ্যা বেঁধে দিয়েছে সংবিধান। সংবিধান অনুযায়ী কোনও রাজ্যের বিধান পরিষদের মোট সদস্যসংখ্যা সংশ্লিষ্ট রাজ্যের বিধানসভার মোট সদস্যসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না। আবার কোনও বিধান পরিষদের সদস্যসংখ্যা কোনও অবস্থাতেই চল্লিশের কম হবে না।
অধিকাংশ রাজ্য বিধান পরিষদ তুলে দিয়েছে কেন?
বিধান পরিষদকে সাদা হাতি বলে মনে করার পেছনে অনেক যুক্তি আছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ভারতের সংসদে রাজ্যসভা রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। কিন্তু রাজ্যের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা নেই। রাজ্যের আইনসভা এককক্ষের হলে কোনও ক্ষতি নেই। বরং আইন প্রণয়নে জটিলতা হ্রাস পায়। সবথেকে বড় কথা, বিধান পরিষদ চালাতে সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। সাধারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন, এমন প্রতিনিধিদের পেছনে অর্থ ব্যয় করাটাকে অনেকেই অপচয় বলে মনে করেন। এই কারণেই অধিকাংশ রাজ্য বিধান পরিষদের পাট চুকিয়ে দিয়েছে।
রাজ্যে বিধান পরিষদ ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন মমতা
২০২১ সালে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় ফেরার পর তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে বিধান পরিষদ ফিরিয়ে আনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। মমতার ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক উঠেছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, চাটুকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতেই কি এই রাজ্যে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বিধান পরিষদ আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন মমতা? যদিও বিধান পরিষদ গঠনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করার আর ফুসরত পায় নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।
AI generated feature graphic is representational.