পলিটিক্যাল ডেস্ক: মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ৮১-তে পা দেবেন। জন্মদিনের এক দিন আগে চতুর্থবারের জন্য ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন লুলা দ্য সিলভা। একজন ঝানু রাজনীতিবিদের জন্য এর চেয়ে ভাল বার্থডে গিফ্ট আর কী হতে পারে! ডোনাল্ড ট্রাম্পের আশায় ছাই ফেলে ক্ষমতার শীর্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন বামপন্থী লুলার। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম রাউন্ডের ভোটে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় রাউন্ডে জয় ছিনিয়ে আনলেন অশীতিপর লুলা দ্য সিলভা। দক্ষিণপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পর্যুদস্ত করে রাষ্ট্রপ্রধানের মসনদ ধরে রাখলেন লুলা।
বাইশে বাপকে ছাব্বিশে ছেলেকে হারালেন লুলা
দ্বিতীয় রাউন্ডের ভোটগণনা শেষ। বামপন্থী লুলা দ্য সিলভা পেয়েছেন ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট। ৪৮.২১ শতাংশ পেয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো। ৪৫ বছরের ফ্লাভিও ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জ়াইর বলসোনারোর পুত্র। কট্টর ডানপন্থী জ়াইর বলসোনারো লুলার এক নম্বর রাজনৈতিক শত্রু। ২০১৮-র নির্বাচনে লুলাকে হারিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন জ়াইর। অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সরানোর মামলায় ২০২৫-এর নভেম্বরে ট্রাম্পের বন্ধু ৭১ বছরের জ়াইর বলসোনারোকে ২৭ বছর ৩ মাসের কারাদন্ড দেয় ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট। চলতি বছরের মার্চে বলসোনারোকে নিজের বাড়িতেই গৃহবন্দি থাকার অনুমতি দেয় আদালত।
বিচারে কারাদন্ড হওয়ায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা হারিয়েছেন লুলার রাজনৈতিক শত্রু বলসোনারো। বন্ধু বলসোনারো শাস্তি পাওয়ায় খুব গোঁসা হয়েছিল ট্রাম্পের। প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভার উপর অনেক হম্বিতম্বি করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, এমনকি ভেনেজুয়েলার মতো সেনা পাঠিয়ে নির্বাচিত লুলাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কারাদন্ডিত জ়াইর বলসোনারো আইনি বাধায় ভোটে দাঁড়াতে না পারায় তাঁর ৪৫ বছর বয়স্ক ছেলে ফ্লাভিওকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেয় দক্ষিণপন্থী লিবারেল পার্টি (পার্টিদো লিবারেল)।
প্লেঅফ রাউন্ডে ৩.৫৮ শতাংশ ভোট বেশি পেয়ে কিস্তিমাৎ লুলার
৪ অক্টোবর প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে লুলা কিম্বা ফ্লাভিও— কেউই বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোটের গন্ডি পেরোতে পারেন নি। বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দক্ষিণপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারো ৪৭.০৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম স্থানে ছিলেন। বামপন্থী ওয়ার্কার্স পার্টির লুলা দ্য সিলভা ৪৫.১৬ শতাংশ ভোট পেয়ে সেকেন্ড পজিশনে। অগুস্তো কুরি ২.৮৯ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় এবং রেনান সান্তোস ২.২৪ শতাংশ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থান দখল করেন। ২.১৮ শতাংশ ভোট পেয়ে রোনালদো কাইয়াদো ছিলেন পঞ্চমে। বাকি ৭ প্রার্থীর মোট ভোট এক শতাংশেরও কম!

রবিবার (২৫ অক্টোবর) ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্লেঅফ রাউন্ডের ভোটগ্রহণ হয়। ভোট শেষে গণনা শুরু হতেই চমক! সব হিসেব উল্টে দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন প্রবীণ বামপন্থী নেতা লুলা দ্য সিলভা। শেষ পর্যন্ত ৪৪ লক্ষ ৩০ হাজার ১৯১ ভোটে ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে দিয়ে চতুর্থ বারের জন্য ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধান হতে চলেছেন লুলা। প্লেঅফ রাউন্ডে লুলা দ্য সিলভা পেয়েছেন ৬ কোটি ৪২ লক্ষ ৫৬ হাজার ২৩২ জন মানুষের ভোট। ফ্লাভিও বলসেনারো পেয়েছেন ৫ কোটি ৯৮ লক্ষ ২৬ হাজার ৪১ জন মানুষের ভোট। ফ্লাভিওর থেকে ৩.৫৮ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছেন লুলা। আগামী ৫ জানুয়ারি শপথ নিয়ে চতুর্থবারের জন্য দেশের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নেবেন ৮১ বছরের এই বামপন্থী নেতা।
শ্রমিক নেতা থেকে রাষ্ট্রের প্রধান
লুলার পুরো নাম লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের পারনামবুকো প্রদেশের গারানিউন্সে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে লুলার জন্ম। পেটের দায়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে কারখানায় শ্রমিকের কাজে যোগ দেওয়া লুলা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই শ্রমজীবী মানুষের দুঃখকষ্ট উপলব্ধি করেছিলেন। যে উপলব্ধি তাঁকে বামপন্থায় আকৃষ্ট করে এবং শ্রমিক আন্দোলনের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

সত্তরের দশকে সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান নেতা থেকে ১৯৮০ সালে ব্রাজিলের অন্যান্য শ্রমিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন— সামরিক শাসনে জেলখাটা লুলা দ্য সিলভার রাজনৈতিক জীবন সত্যিই বর্ণময়। পেলে-রোমারিওর দেশ ব্রাজিলের প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট তিনি। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০২ সালে। ২০০৬-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও বিজয়ী হয়ে টানা দুই দফায় ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন লুলা দ্য সিলভা।
দুর্নীতির অভিযোগে জেলে গিয়েও জনপ্রিয়তা হারান নি লুলা
২০১৭ সালে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন লুলা। ৫৮০ দিন কারাবন্দি থাকার পর ২০১৯ সালে মুক্তি পান। জেলে যাওয়ার কারণে ২০১৮-র প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা হারান। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট দুর্নীতির মামলায় লুলাকে নির্দোষ ঘোষণা করে দন্ডাদেশ বাতিলের নির্দেশ দেয়। কলঙ্কমুক্ত হয়ে ভোটে লড়ার অধিকার ফিরে পান লুলা দ্য সিলভা। ২০২২-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কট্টর দক্ষিণপন্থী জ়াইর বলসোনারোকে হারিয়ে তৃতীয়বারের জন্য যখন ব্রাজিলের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নিলেন লুলা, তখন তাঁর বয়স ৭৭ পেরিয়ে গেছে।
ব্রাজিলের রাজনীতিতে নজির গড়ে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন
২০২৬-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শক্ত পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন লুলা। বন্ধু প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জ়াইর বলসোনারোর বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে ব্রাজিলের পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যপণ্যের চড়া দাম এবং নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস নিয়ে বেশ বিপাকেই ছিল লুলার সরকার। অপরাধ দমনেও সাফল্য পাচ্ছিল না লুলার প্রশাসন। মাদক পাচার, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতি নিয়ে জনগণের দিক থেকে অসন্তোষ ছিল। কিন্তু তারপরেও অতি দক্ষিণপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে সংবেদনশীল বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভাকেই বেশি নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়েছে ব্রাজিলের জনগণের। তাই প্রথম রাউন্ডে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয় রাউন্ডে নাটকীয় কামব্যাক করলেন ৮১ বছরের লুলা— ব্রাজিলের রাজনৈতিক ইতিহাসে যা নতুন নজির গড়ল।

সামাজিক কল্যাণে সাফল্য, দারিদ্র হ্রাসে পদক্ষেপ এবং পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হওয়ার ডিভিডেন্ডই শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভাকে আরও চার বছরের জন্য ব্রাসিলিয়ার রাষ্ট্রপতির প্রাসাদে ফিরিয়ে আনল বলে মনে করছেন ব্রাজিলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
যে আশীতে মানুষ কাশীবাসী হন, সেই আশীতেই রাজনীতির যুদ্ধে ৪৫ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বীকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে হারিয়েই ছাড়লেন লুলা দ্য সিলভা। বুড়া হাড় যে ভেল্কিও দেখাতে পারে— লুলা প্রমাণ করলেন।
ফিচার ইমেজ: সংগৃহীত।