অরুণ কুমার
পাহাড়ের কোলে তখন জীবনের শেষ প্রহর গুনছেন তিনি! শরীর ত্যাগের পথে, জীবনদীপ নিভু নিভু, অথচ মনশ্চক্ষে স্বপ্ন তখনও ধরা দিচ্ছে। ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর দার্জিলিঙের ঐতিহাসিক রায় ভিলায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভগিনী নিবেদিতা। তাঁর শেষ বাক্য— “The boat is sinking, but I can yet see the sunrise.” অর্থাৎ, ‘তরী ডুবছে, কিন্তু আমি এখনও সূর্যোদয় দেখতে পাচ্ছি।’ এ যেন নিজের জীবনাবসানের মুখেও একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের ঘোষণা!
১৮৬৭ সালের ২৮ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের ডানগ্যাননে জন্মগ্রহণ করেন মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। স্বামী বিবেকানন্দের সংস্পর্শে এসে ভারতীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে নতুনভাবে উপলব্ধি করেন তিনি। ১৮৯৮ সালে ভারতে আসার পর বিবেকানন্দ তাঁকে ‘নিবেদিতা’ নাম দেন।

নামটির অর্থ—নিবেদিতপ্রাণ। নারীশিক্ষার প্রসার, দরিদ্র মানুষের সেবা, মহামারির সময় জনকল্যাণমূলক কাজ, ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ এবং জাতীয়তাবোধের বিকাশে তাঁর ভূমিকা তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। জন্মসূত্রে ভারতীয় না হয়েও ভারতের মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণকে তিনি নিজের জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন।
১৯০৩ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে ভগিনী নিবেদিতা একাধিকবার দার্জিলিং এসেছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে তাঁর মোট অবস্থান প্রায় ২৪২ দিনের বলে উল্লেখ করা হয়। পাহাড়ের পরিবেশ ও নির্জনতা অসুস্থ শরীরে তাঁকে কিছুটা স্বস্তি দিত।
লেবং কার্ট রোডের ঐতিহাসিক রায় ভিলা তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাড়িটির মালিক ছিলেন দ্বারকানাথ রায়। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী অবলা বসুর সঙ্গে নিবেদিতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। অসুস্থতার সময় তাঁদের উদ্যোগেই রায় ভিলায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়।
১৯১১ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পাশে ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু, অবলা বসু, চিকিৎসক নীলরতন সরকার এবং বিজ্ঞানী বসীশ্বর সেনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
মৃত্যুর কয়েক দিন আগে, ৭ অক্টোবর, তিনি নিজের ইচ্ছাপত্র তৈরি করেন। নারীশিক্ষা এবং বাগবাজারে প্রতিষ্ঠিত তাঁর বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি চিন্তিত ছিলেন। ১৩ অক্টোবর, মাত্র ৪৩ বছর বয়সে, তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

নিবেদিতার শেষ কথার সূর্যোদয়কে কেবল মৃত্যুশয্যার আবেগ হিসেবে দেখলে তার তাৎপর্য সীমিত হয়ে যায়। এর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় নারীশিক্ষা, আত্মমর্যাদা, জাতীয় জাগরণ এবং পরাধীনতার অন্ধকার অতিক্রম করে ভারতবর্ষের স্বাধীন ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন।
তিনি স্বাধীন ভারত দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু ভারতীয় সমাজকে আত্মশক্তি সম্পর্কে সচেতন করতে তাঁর অবদান ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে কেবল স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী শিষ্যা হিসেবে দেখলে তাঁর শিক্ষাবিদ, লেখক, সমাজসেবী ও জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের পূর্ণ মূল্যায়ন হয় না।
দার্জিলিঙের রায় ভিলা আজও ভগিনী নিবেদিতার জীবন ইতিহাসের স্মারক। বর্তমানে এখানে রয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন নিবেদিতা এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার। এই ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ মানে শুধু স্থাপত্য রক্ষা নয়, তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এই মহীয়সীর চিন্তা, সংগ্রাম ও আদর্শকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

জন্মভূমি আয়ারল্যান্ড, কর্মভূমি ভারত—আত্মনিবেদনের মধ্য দিয়ে দুই ভূখণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে মানবতার ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। আমরা কি শুধু তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানাব, নাকি তাঁর আদর্শকে নিজেদের কর্মের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত করব? শয়নে-স্বপনে-জাগরণে ভারতের উত্থান ছাড়া আর কোনও চিন্তা ছিল না নিবেদিতার। ভারতের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করে তিনি ইংরেজ শাসকের রোষানলে পর্যন্ত পড়েছেন। ম্লেচ্ছ বিদেশিনী বলে তাঁকে কম উপেক্ষা, লাঞ্ছনা সইতে হয় নি আমাদের অচলায়তন সমাজের রক্ষণশীলদের কাছে। কিন্তু তাঁর মতো ভারতকে ভালবাসতে পারলাম কই আমরা?
Feature graphic: NNDC.