মৃত যোগেন সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে, তবে চটি চেটে বেঁচে থাকতে দুর্নাম কুড়িয়ে গেলেন


১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের দাহারপাড়া গ্রামে যোগেন চৌধুরীর জন্ম। বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন জমিদার। শৈশবে আঁকার প্রেরণা পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে। ভাল আল্পনা দিতেন জননী। মায়ের আল্পনা দেখতে দেখতেই আঁকে আগ্রহী হয়ে ওঠেন শিশু যোগেন। দেশভাগের পর আর‌ও অনেক বাঙালিহিন্দুর মতোই সব হারিয়ে এক কাপড়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন যোগেন চৌধুরীর পিতৃদেব। উদ্বাস্তু জীবনে দারিদ্রের জ্বালা সয়েছেন। কিন্তু দুঃখ-কষ্ট যোগেনের শিল্পীমনকে ঘায়েল করতে পারে নি। কৈশোরে বাড়ির দেওয়াল এঁকে ভরিয়ে দিতেন। কলকাতার গর্ভনমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্ট থেকে ডিগ্রি নিয়ে হাওড়া জিলা স্কুলে অঙ্কন শিক্ষকের চাকরি নিয়েছিলেন যোগেন।

১৯৬২ সালে রাজ্য সরকারের হ্যান্ডলুম বোর্ডের ডিজাইনার হিসেবে যোগ দেন। পঁয়ষট্টিতে চিত্রশিল্পের নগরী প্যারিসে গমন আর্টে উচ্চশিক্ষার জন্য। ফিরে এসে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটর পদে যোগদান। যোগেনের ছবিতে ভারতীয় ও ইউরোপীয় স্টাইলের মিশ্রণ ঘটেছিল। ব্যঙ্গাত্মক ছবি আঁকায় পারদর্শী ছিলেন। সমাজ ও রাজনীতির জগতের বিচ্যুতিগুলি ক্যানভাসে তুলে ধরতেন। কিংবদন্তী স্প্যানিস চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসোর দ্বারা ভীষণ প্রভাবিত ছিলেন। পিকাসোর মতোই বিদ্রূপাত্মক ছবি আঁকায় দক্ষ হয়ে উঠেছিল যোগেনের হাত।

ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার ইতিহাসে যোগেন চৌধুরীর নাম টিকে থাকবে তাঁর নিজের সৃষ্টির জোরেই। জীবনে স্বীকৃতি কম পান নি। রাষ্ট্র তাঁকে পদ্মভূষণ দিয়েছে। ফ্রান্স থেকে পেয়েছেন ‘প্রিক্স দে লা জঁ পেন্তুর’ সম্মান। ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার‌ও পেয়েছেন। ২০০৮-০৯ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জুটে যান যোগেন। সে সময় সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আবহে বাংলার আর‌ও অনেক বিদ্বজ্জন মমতার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০১১-র পর অনেকের‌ই মমতার প্রতি মোহভঙ্গ ঘটে। অনেক বুদ্ধিজীবী-বিদ্বজ্জন একে একে মমতাকে ত্যাগ করেন। কিন্তু যোগেন চৌধুরী ছেড়ে যান নি।

তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুদিন। মমতাকে ঘিরে যোগেন চৌধুরী এবং শুভাপ্রসন্ন সহ অন্যান্য বিদ্বজ্জনেরা। ফাইল ফটো।

মমতার প্রতি অচলা ভক্তির বড় পুরস্কার পেয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী। ২০১৪ সালে যোগেনকে রাজ্যসভায় পাঠান মমতা। ২০২০ পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন। তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনে আরজি করের ইন্টার্নি অভয়ার খুন-ধর্ষণ হোক আর নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি— কোন‌ও ইস্যুতেই শিল্পী যোগেন চৌধুরীকে মুখ খুলতে দেখা যায় নি। এমনকি প্রকাশ্যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতার সুরে সুর মিলিয়ে ‘ক্যা ক্যা, ছি ছি’ ডাক পেড়ে লোক হাসাতেও লজ্জা লাগে নি যোগেনের।

চিত্রকর যোগেন চৌধুরীর মৃত্যুতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শোকপ্রকাশ। শুভেন্দু অধিকারীর ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেল থেকে।

৪-মে রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন মমতা। এরপরেও যোগেন তৃণমূলে যুক্ত ছিলেন কি ছিলেন না, জানা যায় নি। তবে  আর‌ পাঁচজন মমতার প্রসাদভোজী বিদ্বজ্জনের মতোই যোগেন‌ও চুপ মেরে গিয়েছিলেন। প্রয়াত যোগেন চৌধুরী সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন যোগেন চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন, তেমনি শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য‌ও।

টাকার লোভে হোক আর যশের মোহে পড়ে শিল্পীরা রাজনীতিতে নাম লেখান বটে, কিন্তু আখেরে রাজনীতি তাঁদের সুনাম না বাড়িয়ে দুর্নামের ভাগী করে। যোগেন চৌধুরী তার প্রমাণ।

Feature image: NNDC.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com