কৈলাসে ফেরার পথে ডুয়ার্সে মায়ার বাঁধনে আটকে পড়লেন মহামায়া!


কৈলাসের পথে হিমালয় ডিঙোবার ঠিক আগেই ডুয়ার্সের মাটির মানুষের মায়ার বাঁধনে আটকা পড়ে মা দুর্গা যে’ভাবে হয়ে উঠলেন দেবী ভান্ডানী! লিখলেন অরুণ কুমার—

বাংলার আকাশে যখন বিসর্জনের বিষণ্ণ সুর, মণ্ডপে মণ্ডপে উমার বিদায়ের প্রস্তুতি, তখন উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে ছবিটা একেবারেই আলাদা। এখানে দশমীর বিদায় পেরিয়ে একাদশীর সকালে নতুন করে বেজে ওঠে ঢাক, কাঁসর ও শঙ্খ। মনে হয়, কৈলাসে ফেরার পথে দেবী দুর্গা আটকে গিয়েছেন হিমালয়ের পাদদেশে, তিস্তা-সংকোশের বিস্তীর্ণ জনপদে। এখানে তিনি শুধু দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী নন, তিনি ঘরের মেয়ে, কৃষিজীবী মানুষের আশ্রয়, শস্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক—মা ভান্ডানী।

উত্তরবঙ্গের ভান্ডানী পুজোর বিশেষত্ব শুধু দুর্গাপুজোর পরেও আরেক দফা উৎসবের আয়োজন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ডুয়ার্সের অরণ্যঘেরা জনজীবন, তিস্তা অববাহিকার কৃষিসংস্কৃতি, স্থানীয় লোকবিশ্বাস এবং প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয়।

রাজপ্রাসাদ ছেড়ে সাধারণ মানুষের উঠোনে উমা

ভান্ডানী পুজোকে ঘিরে প্রচলিত একটি লোককথায় উঠে আসে সামাজিক বৈষম্যের কথা। কথিত আছে, একসময় দুর্গাপুজো ছিল রাজা, জমিদার ও সমাজের বিত্তশালী মানুষের আয়োজন। সাধারণ দরিদ্র মানুষের কাছে সেই পুজোর জাঁকজমক ছিল দূরের দৃশ্য। দশমীর রাতে কৈলাসে ফেরার পথে দেবীকে তাঁরা অনুরোধ জানিয়েছিলেন, মা, তুমি কি শুধু রাজপ্রাসাদ আর জমিদারবাড়িরই দেবী? আমাদের মতো গরিব মানুষের উঠোনে কি তোমার স্থান নেই?

লোকবিশ্বাসে, ভক্তদের এই আকুল আবেদন উপেক্ষা করতে পারেননি উমা। তিনি থেকে গিয়েছিলেন তাঁদের কাছেই। আশীর্বাদ করেছিলেন কৃষিজীবী মানুষকে। সেই বিশ্বাস থেকেই দেবী হয়ে ওঠেন ভান্ডানী— শস্য, সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

এই লোককথার তাৎপর্য গভীর। এখানে দেবী কেবল অসুরদলনী নন, তিনি সামাজিক ব্যবধান অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের আপনজন। তাঁর কাছে রাজপ্রাসাদ ও দরিদ্র কৃষকের কুঁড়েঘরের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই।

প্রতিমায় অরণ্যের ছাপ, রূপে স্বাতন্ত্র্য

ভান্ডানী পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দেবীর প্রতিমার স্বতন্ত্র রূপ। প্রচলিত দুর্গামূর্তির দশটি হাতের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে দ্বিভুজা রূপে দেখা যায়। মহিষাসুরের পরিবর্তে কোনও কোনও প্রতিমায় দেবীর পায়ের কাছে থাকে ডোরাকাটা বাঘ। কোথাও আবার দুর্গার সঙ্গে তাঁর প্রচলিত পরিবারের পরিচিত বিন্যাসও অনুপস্থিত।

মা ভান্ডানী। দশভূজার লোকজ রূপ! দশমী শেষে একাদশী তিথিতে তিনি পূজিতা হন ডুয়ার্সের রাজবংশী সমাজের জনপদে। ছবি: এন‌এনডিসি।

এই বৈশিষ্ট্য সব অঞ্চলে বা সব প্রতিমায় একরকম নয়। স্থানীয় রীতি ও পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে প্রতিমার রূপে পার্থক্য দেখা যায়। তবে বাঘের উপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ডুয়ার্সের অরণ্য, বন্যপ্রাণী এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। ভান্ডানীর প্রতিমায় সেই আঞ্চলিক পরিবেশের প্রতিফলন খুঁজে পান অনেকেই।

তিস্তার তীরে উমার মনখারাপ

আর একটি লোককথা তিস্তা নদীর তীরবর্তী বার্নিশ গ্রামকে ঘিরে। কথিত আছে, বিসর্জনের পর এক দশমীর রাতে কাশবনের মধ্যে এক নারীকে একাকী বসে থাকতে দেখেন গ্রামবাসীরা। চারদিকে অন্ধকার, জঙ্গল এবং বাঘের আনাগোনা। পরদিন তাঁদের বিশ্বাস জন্মায়, কৈলাসে ফেরার আগে মন খারাপ করে তিস্তার তীরে বসে ছিলেন স্বয়ং দেবী দুর্গা।

এই কাহিনিতে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; সে যেন উমার সাময়িক আশ্রয়। নদী, কাশবন, অরণ্য আর জনপদের নিবিড় সম্পর্ক লোককথাটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র আঞ্চলিক পরিচয়। দেবীর আশীর্বাদে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও ফসলের প্রাচুর্যের বিশ্বাসও এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

কৃষিসংস্কৃতি ও একাদশীর মেলা

ভান্ডানী পুজোর সঙ্গে কৃষিজীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। ডুয়ার্স ও তিস্তা অববাহিকার মানুষের কাছে জমি, ফসল এবং প্রকৃতির অনুকূলতা জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন। তাই দেবীর আরাধনায় শস্য ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা বিশেষ গুরুত্ব পায়।

স্থানীয় রীতি অনুসারে, কোথাও কোথাও একাদশীর মূল পুজোর আগে দশমীতে কৃষকেরা লাঙল, কাস্তে, জোয়ালসহ কৃষিকাজের সরঞ্জাম পুজো করেন। এই আচারকে ‘যাত্রাপুজো’ বলা হয় কিছু অঞ্চলে। কৃষকের কাছে এই উপকরণগুলি শুধু কাজের সরঞ্জাম নয়, জীবিকা ও ভবিষ্যতের প্রতীক।

একাদশীর পুজোকে কেন্দ্র করে বার্নিশ-সহ তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন জনপদে বসে মেলা। পুজো, মানত, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা এবং গ্রামীণ কেনাকাটার মধ্য দিয়ে এই উৎসব সামাজিক মিলনক্ষেত্র হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয় জনজীবন, লোকসংস্কৃতি এবং পারস্পরিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এই মেলার গুরুত্বও কম নয়।

ভান্ডানী পুজোর আর একটি বিশেষ দিক হল, এর আকর্ষণ মূলত সাধারণ মানুষের ভক্তি ও অংশগ্রহণে। বিপুল আলোকসজ্জা, ব্যয়বহুল মণ্ডপ কিংবা রাজকীয় আড়ম্বর এখানে মুখ্য নয়। মুখ্য হল বিশ্বাস, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া লোকাচার এবং মায়ের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা।

বাংলার অন্য প্রান্তে যখন উমার বিদায়ে মন খারাপ, তখন উত্তরবঙ্গের এই জনপদে তিনি যেন আরও একদিন থেকে যান। লোককথার সেই অভিমানী উমা আজও মানুষের ভালোবাসায় বাঁধা পড়ে আছেন তিস্তা অববাহিকার মাটিতে।

উত্তরের ডুয়ার্সে তাই মহামায়া আজও আটকে গিয়েছেন। রাজপ্রাসাদে নয়, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। দশভুজা দুর্গা এখানে উমা, উমা এখানে ভান্ডানী—প্রান্তিক মানুষের আপন মা।

আজকের সমাজে ভান্ডানীর বার্তা

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেবী ভান্ডানীর লোককথা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। যে দেবী রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ছেড়ে সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় আটকে গিয়েছিলেন, তাঁর আরাধনার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর সামাজিক বার্তা— ঈশ্বরের কাছে মানুষের পরিচয় তার সম্পদে নয়, তার ভক্তি, ভালোবাসা ও মানবিকতায়।

যে সমাজে আজও অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েছে, কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্য মূল্য পেতে সংগ্রাম করেন, চা-বাগান ও বনবস্তির প্রান্তিক মানুষ জীবিকা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা খোঁজেন, সেখানে ভান্ডানীর আরাধনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা আলোর ঝলকানিতে নয়, মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। দেবীর সামনে মাথা নত করার পাশাপাশি ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, কৃষকের শ্রমকে সম্মান করা, নারীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করাও আমাদের সামাজিক কর্তব্য।

ডুয়ার্সের অরণ্য ও নদীঘেরা জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পুজো প্রকৃতির প্রতিও আমাদের দায়বদ্ধতার কথা বলে। যে মাটি আমাদের অন্ন জোগায়, যে নদী জনপদকে বাঁচিয়ে রাখে, যে অরণ্য এই ভূখণ্ডের পরিচয় বহন করে— তাদের রক্ষা করা আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব।

ভান্ডানীর লোককথায় উমা সাধারণ মানুষের আবেদনে থেকে গিয়েছিলেন। আজ সেই কাহিনি আমাদের কাছে এক প্রশ্ন রেখে যায়— আমরা কি আমাদের সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে থাকতে পারছি? আমরা কি উৎসবের আনন্দ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শিখেছি?

মা ভান্ডানীর আরাধনা তাই শুধু একটি আঞ্চলিক ধর্মীয় ঐতিহ্য নয়; এটি সাম্য, সহমর্মিতা, শ্রমের মর্যাদা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এক জীবন্ত শিক্ষা। উত্তরবঙ্গের মাটিতে মহামায়া আজও যেন সেই কথাই বলে চলেছেন— আমাকে মন্দিরে খুঁজো, মণ্ডপে খুঁজো, কিন্তু তার আগে খুঁজে নাও মানুষের হৃদয়ে। কারণ মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় আশ্রয়।

সেই আশ্রয়েই তিস্তা-সংকোশের ডুয়ার্সে উমা আজও থেকে গিয়েছেন। কৈলাসে ফেরার পথ তাঁর জানা, কিন্তু মানুষের ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করে যাওয়া যে বড় কঠিন!

ফিচার ইমেজ: এন‌এনডিসি।

লেখক পরিচিতি: অরুণ কুমার। প্রবীণ সাংবাদিক। সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত। ইকো ট্যুরিজম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্সের আনাচকানাচে নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com