কলকাতার শুধু কলকাতাই বলি কেন, সারা পশ্চিমবঙ্গে থিম পুজোকে ঘিরে যেভাবে ‘ক্রাউড’ টানতে উন্মাদনা তৈরি করাই ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাতে এই রকম একটা (চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোয় পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা) বড় দুর্ঘটনা ঘটা ছিল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কোনও একটি স্থানে ভিড়ের পরিমাণ যদি সেই স্থানের আয়তনের তুলনায় অনেক বেশি হয়, তবে পদপিষ্টের ঘটনা যে কোনও অসাবধান মুহূর্তে ঘটে যেতেই পারে। মেলা-খেলা, পুজোয়, যে কোনও ধর্মের উপাসনালয়ে এর আগে যত স্ট্যাম্পিডের বড় ঘটনা ঘটেছে, অধিকাংশের পিছনেই একই কারণ কাজ করেছে।
গণউন্মাদনা তৈরি করা সহজ। কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান হোক আর রাজনৈতিক সভা— অসংখ্য মানুষ যখন এক সঙ্গে ভাবোন্মত্ত হয়ে ওঠে, তখন অনেক ধরণের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। অধিকাংশ সময় ঝুঁকিগুলি এড়ানো সম্ভব হয়। কখনও কখনও ঘটে। আর ঘটলে পরেই একটা ‘চোরবাগান’ দৃশ্যমান হয়।
একটা কথা মনে রাখা দরকার, ঈশ্বর-আল্লা-গড, রক্ষা কেউই করেন না। রক্ষা করতে হয় নিজেকেই। ‘ক্রাউড’ ডেকে আনলে ক্রাউড কন্ট্রোলের ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে এবং প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথা হলে দুর্ঘটনা ঘটবেই। উপরওয়ালা রক্ষা করবেন না।
কলকাতার অলি-গলিতে বড় বড় পুজো। তিন মাস আগে থেকে তার বড় বড় প্রচার, হোর্ডিং, বিজ্ঞাপন, মিডিয়ায় প্রতিবেদন। এখন হয়েছে রিলস। পঞ্চমীর রাত থেকেই জোয়ারের মতো জনতা মন্ডপের অপ্রশস্ত প্রবেশপথে ধাক্কা মারতে শুরু করে। ভিড় নিয়ে পুজোকমিটির পান্ডাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়— মিডিয়া, সোস্যাল মিডিয়া তাতে ইন্ধন দেয়।
কয়েক বছর আগে কলকাতার এক ক্লাব বিশাল এক দুর্গাপ্রতিমা বানিয়ে, বিশ্বের সবথেকে বড় দুর্গা— এইসব তিন মাস আগে থেকে প্রচার করে এমন হাইপ তুলেছিল যে এই রকম সপ্তমীর রাতেই পদপিষ্ট হয়ে বহু মানুষের মরার উপক্রম হয়েছিল। যথা সময়ে পুলিশের যথোচিত পদক্ষেপের কারণে হয় নি। পুলিশ পুজো মানে মন্ডপে জনসমাগম বন্ধ করে দিয়েছিল। বন্ধ মানে বন্ধই— চারদিন কাউকে সেই পুজোর ধারেকাছে ঘেঁষতে দেয় নি পুলিশ।
এখন পুলিশ এমন একটা পেশা— সামনে এগিয়ে গেলেও লোকের কাছে শালা, পিছিয়ে গেলেও লোকের কাছে শালা! পুলিশ যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনও পুজোর উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, জনগণই পুলিশের বাপ-মা উদ্ধার করে দেবে।
মা দুর্গা শক্তির আধার। শক্তির উপাসক বাঙালিহিন্দু তার সমস্ত উদ্যম, সমস্ত শক্তি দুর্গাপুজোয় আড়ম্বর করতে গিয়েই শেষ করে দেয়। অথচ দুগ্গা দুগ্গা বলে এই উদ্যম, এই শক্তিকেই বাঙালি জাতির কল্যাণে সম্পদ সৃষ্টিতে, সম্পদ বৃদ্ধিতে সংহত করতে পারলে জগজ্জননী মনে হয় আরও বেশি প্রসন্ন হতেন।
বিবেক যদি না জাগে, সকল পুজোই বৃথা।চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পর আমাদের সকলের টনক নড়লেই কেবল ভবিষ্যতে এই ধরণের ট্র্যাজেডি এড়াতে পারব। প্রশ্ন একটাই— চোরবাগানের ট্র্যাজেডি কি আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারবে?
AI generated feature graphic is representational.