উত্তরবঙ্গেও ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর সংখ্যা কিন্তু কম নয়! জেনে নিন তাদের ইতিহাস


উত্তরবঙ্গের রাজপরিবারগুলিতে পাঁচ শতাব্দীর‌ও বেশি সময় ধরে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে। ঐতিহ্যবাহী সে’সব পুজোর বৃত্তান্ত অরুণ কুমারের কলমে—

শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের দোলা, শিউলির সুবাস আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ। বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো কেবল ধর্মীয় আচার নয়, শিকড়ের টান, পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক অনন্য উৎসব। কিন্তু উৎসবের আলোকমালার আড়ালে যে ইতিহাস নিঃশব্দে বেঁচে থাকে, তার খোঁজ আমরা কতটা রাখি?

কলকাতার বিখ্যাত পুজোগুলির বাইরে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ জনপদে ছড়িয়ে রয়েছে রাজপরিবারের আরাধনা, জমিদারবাড়ির সাবেকিয়ানা, প্রাচীন পারিবারিক পুজো এবং শতাব্দীপ্রাচীন সর্বজনীন দুর্গোৎসবের এক সমৃদ্ধ জগৎ। কোচবিহারের দেবীবাড়ি, জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ি, আলিপুরদুয়ারের নিউ টাউন দুর্গাবাড়ি, দার্জিলিংয়ের বাঙালি হিন্দু হল এবং কালিম্পংয়ের মিলনী ক্লাব— প্রতিটি পুজোর পিছনে রয়েছে সময়ের নিজস্ব সাক্ষ্য।

রায়গঞ্জের জমিদারবাড়ি থেকে বালুরঘাটের সাহাবাড়ি, মালদহের প্রাচীন দুর্গাবাড়ি—উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এই পুজোগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল রাজপ্রাসাদের দেওয়ালে লেখা থাকে না। কখনও তা বেঁচে থাকে প্রতিমার বিশেষ অবয়বে, কখনও পারিবারিক ভোগের রীতিতে, আবার কখনও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঢাকের তালে মিশে থাকা মানুষের আবেগে। এই ঐতিহ্যকে চিনতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে উত্তরবঙ্গের অতীতে।

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন দুর্গোৎসবের আলোচনা শুরু করতে হয় কোচবিহারের দেবীবাড়ির বড়দেবীর পুজো দিয়ে। কোচ রাজবংশের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই আরাধনা। কোচবিহার জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বড়দেবীর মন্দিরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ষোড়শ শতকের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজোপাখ্যানের মতো ঐতিহাসিক গ্রন্থেও এই ঐতিহ্যের উল্লেখ রয়েছে। তবে পুজোর সূচনা ও মেলার উৎপত্তি সম্পর্কে বিভিন্ন মত প্রচলিত থাকায় সব কাহিনিকে সমানভাবে প্রামাণ্য ইতিহাস বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

বড়দেবীর প্রতিমার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যই এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার বিন্যাস থেকে আলাদা এই প্রতিমায় দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের পরিবর্তে জয়া ও বিজয়ার উপস্থিতি দেখা যায়। দেবীর বাহন হিসেবেও সিংহের বদলে বাঘের ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

একসময় দেবীবাড়ির পুজোকে কেন্দ্র করে বসত ঐতিহ্যবাহী মেলা। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত মন্দিরসংলগ্ন কক্ষে রাজপরিবারের সিংহাসন, শয্যা, রাজদণ্ডসহ বিভিন্ন রাজকীয় স্মারক সাধারণ মানুষের দেখার জন্য প্রদর্শিত হতো। সময়ের সঙ্গে সেই প্রদর্শনের রীতি হারিয়ে গেলেও বড়দেবীর পুজো আজও কোচবিহারের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে, বদলেছে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু বড়দেবীকে ঘিরে মানুষের আবেগের মৃত্যু হয়নি। এই পুজো তাই শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, কোচবিহারের রাজকীয় অতীতের এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক দলিল।

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন রাজপরিবারের দুর্গাপুজোর কথা উঠলে জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতে হয়।ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, এই পুজোর সূচনা পাঁচ শতকেরও বেশি আগে। প্রচলিত পারিবারিক ইতিহাসে শিষ্য সিংহ ও বিশ্ব সিংহের নাম উঠে আসে। তাঁদের সঙ্গে কোচ রাজবংশ ও বৈকুণ্ঠপুরের রাজপরিবারের ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে।

বৈকুন্ঠপুর রাজবাড়ির দেবীর গায়ের রং গলানো সোনার মতো। পরনে বেনারসি, অলংকারে রাজকীয় আভিজাত্য। সাধারণ দুর্গাপ্রতিমার তুলনায় তাঁর সাজসজ্জা ও পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।

মহাসপ্তমী থেকে মহানবমী পর্যন্ত বিভিন্ন মাছ সহ বিশেষ ভোগ নিবেদনের রীতির কথাও সংবাদপ্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে পুজোর রীতি ও আয়োজনের বিবরণ বছরভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।

এই পুজোর ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক রয়েছে। একসময় যে রাজপরিবারের হাতে ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, আজ সেই রাজত্ব নেই। অথচ পারিবারিক উত্তরাধিকার ও সামাজিক শ্রদ্ধার বন্ধনে পুজোটি টিকে রয়েছে। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা আমাদের শেখায়, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; কিন্তু মানুষের বিশ্বাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে।

আলিপুরদুয়ারের নিউ টাউন দুর্গাবাড়ির পুজো উত্তরবঙ্গের দুর্গোৎসবের ইতিহাসে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ২০২৬ সালে এই পুজো ৮৯তম বছরে পদার্পণ করেছে বলে প্রকাশিত সংবাদে জানানো হয়েছে। সেই হিসাবে এর সূচনা ১৯৩০-এর দশকের শেষভাগে।

পুজোর ইতিহাসে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের সামাজিক পরিবেশের স্মৃতি। স্থানীয় পুজো কমিটির সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন এক বাঙালি মহকুমা শাসকের আমন্ত্রণে ব্রিটিশ পরিবারের সদস্যরাও এই পুজোয় অংশ নিতেন।

সেই সময় পুজোর উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রতিমা নির্মাণের নানা কাজে বর্তমানের মতো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। কোচবিহার ও সংলগ্ন অঞ্চল থেকে পুজোর সামগ্রী সংগ্রহ করতে হতো বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

আজও মন্দির প্রাঙ্গণে প্রতিমা নির্মাণ ও নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধি মেনে পুজোর আয়োজন করা হয়। এই পুজো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঔপনিবেশিক শাসনের জটিল সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও স্থানীয় উৎসব কখনও কখনও বিভিন্ন মানুষের মধ্যে পরিচয় ও যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

দার্জিলিংয়ের দুর্গাপুজোর ইতিহাস উত্তরবঙ্গের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নৃপেন্দ্র নারায়ণ বাঙালি হিন্দু হলের দুর্গাপুজো ১৯১৪ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ রয়েছে। ২০২৬ সালে সেই হিসাবে পুজোটি ১১২ বছরে পদার্পণ করছে।

পাহাড়ের কঠিন ভৌগোলিক পরিবেশ, পরিবর্তনশীল সামাজিক পরিস্থিতি এবং নানা জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের মধ্যে এই পুজো বাঙালি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

দার্জিলিংয়ের পরিচয় কেবল পাহাড়, চা-বাগান কিংবা পর্যটনে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে বাঙালি, নেপালি, লেপচা, ভুটিয়া-সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে। এই বহুত্বের মধ্যেই দুর্গাপুজো নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

পুজোর দিনগুলিতে প্রবাসী বাঙালির ঘরে ফেরার আবেগ, পুরনো বন্ধুদের পুনর্মিলন, প্রজন্মান্তরের পরিচয় এবং সামাজিক বন্ধনের পুনর্নবীকরণ—সব মিলিয়ে এই উৎসব ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

দার্জিলিংয়ের মতো পাহাড়ি শহরে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একটি উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিঃসন্দেহে সামাজিক নিষ্ঠা ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার পরিচয়।

উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজোর আলোচনায় কালিম্পংয়ের মিলনী ক্লাবের নাম বিশেষভাবে যুক্ত হওয়া উচিত। ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯২৮ সালে কালিম্পংয়ে প্রতিষ্ঠিত মিলনী ক্লাব প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছে। এ বছর তাদের পুজো ৯৮ বছরে পদার্পণ করেছে। ২০২৮ সালে এই পুজো শতবর্ষ পূর্ণ করবে।

এই তথ্যটি শুধু একটি পুজোর বয়সের হিসাব নয়; এর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি সমাজের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার পরিচয়। কালিম্পং এমন একটি জনপদ, যার ইতিহাসে পাহাড়ি জনজাতি, বাঙালি, তিব্বতি, নেপালি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ, বসতি ও সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই পরিবেশে মিলনী ক্লাবের মতো প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।

নব্বইয়ের দশক পেরিয়ে শতবর্ষের দিকে এগিয়ে চলা একটি পুজোর কাছে আগামী দুই বছর তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৮ সালের শতবর্ষকে সামনে রেখে ক্লাব কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, ইতিহাস গবেষক ও নাগরিক সমাজ যৌথভাবে একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ নিতে পারেন। পুরনো ছবি, পুজোর হিসাবের খাতা, স্মারক, প্রবীণ সদস্যদের সাক্ষাৎকার, প্রতিমার বিবর্তন এবং পুজোকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের স্মৃতি সংগ্রহ করে একটি নির্ভরযোগ্য আর্কাইভ তৈরি করা যেতে পারে।

মিলনী ক্লাবের ৯৮ বছরের ইতিহাস কালিম্পংয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ ও সংলগ্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো জমিদারবাড়ি ও পারিবারিক দুর্গাপুজো। রায়চৌধুরী পরিবারের পুজো এবং বাহিন জমিদারবাড়ির পুজো স্থানীয় ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। রায়চৌধুরী পরিবারের পুজোর বয়স প্রায় দেড়শো বছর বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ রয়েছে।

একসময় জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজো ছিল সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐশ্বর্য ও জনসমাগমের গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ঠাকুরদালান, সাবেকি প্রতিমা, পারিবারিক আচার এবং পুজোকে কেন্দ্র করে গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে এই উৎসব স্থানীয় জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে ছিল।

সময়ের পরিবর্তনে জমিদারি ব্যবস্থার অবসান হয়েছে। অনেক বনেদি বাড়ির আর্থিক সামর্থ্য কমেছে, পুরনো স্থাপত্য ক্ষয়ের মুখে পড়েছে, কোথাও উত্তরসূরিদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পুজো পরিচালনাও কঠিন হয়েছে। তবু কিছু পরিবার এখনও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

এই পুজোগুলির ইতিহাস সংগ্রহ করা জরুরি। কারণ, কোনও পরিবারের পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি, সামাজিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতি কিংবা স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি।

একটি পুরনো ঠাকুরদালান ভেঙে গেলে শুধু একটি বাড়ির স্থাপত্য হারায় না; হারিয়ে যেতে পারে একটি অঞ্চলের অতীতের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যও।

দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের সাহাবাড়ির দুর্গাপুজো উত্তরবঙ্গের প্রাচীন পারিবারিক পুজোগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এই পুজোর ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দীর কাছাকাছি। পরিবারের প্রচলিত ইতিহাসে প্রতিষ্ঠাতা বনমালী সাহা রায়ের নাম উঠে আসে। পূর্ববঙ্গের পাবনা অঞ্চল থেকে ব্যবসার সূত্রে বালুরঘাটে এসে তিনি এই পুজোর সূচনা করেছিলেন বলে পারিবারিক কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।

এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ প্রতিমার বিন্যাস। কার্তিক ও গণেশের অবস্থান প্রচলিত বিন্যাসের থেকে আলাদা হওয়ায় সাহাবাড়ির প্রতিমা স্বতন্ত্র পরিচিতি পেয়েছে। একটি পারিবারিক পুজো কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজস্ব রীতি ও পরিচয় বজায় রাখতে পারে, সাহাবাড়ির পুজো তার উদাহরণ।

অন্যদিকে, বালুরঘাটের গৌরী পালবাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। পঞ্চমুণ্ডির আসনে দেবীর আরাধনা এবং বিশেষ ভোগের রীতির কথা স্থানীয় ঐতিহ্যবিষয়ক আলোচনায় উঠে আসে। পান্তাভাত ও মাছের ভোগের মতো রীতির সঙ্গে এই অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতি ও নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার সম্পর্কও খতিয়ে দেখার মতো।

তবে এই পুজোগুলির নির্দিষ্ট সূচনাবর্ষ, আচার ও ভোগের ইতিহাস আরও নির্ভুলভাবে নথিবদ্ধ করতে পরিবারগুলির নিজস্ব দলিল, প্রবীণ সদস্যদের সাক্ষাৎকার এবং স্থানীয় ইতিহাসের প্রামাণ্য সূত্র সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন দুর্গোৎসবের তালিকায় মালদহের দুর্গাবাড়ির পুজো বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। মালদহ শহরের দুর্গাবাড়ি এলাকার এই পুজোর বয়স প্রায় সাড়ে তিনশো বছর। সেই হিসাবে এটি অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন দুর্গোৎসব।

এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কংসবণিক পরিবারের উত্তরাধিকার, স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত বিভিন্ন কাহিনি। মহানন্দা নদীর তীরবর্তী মালদহের ইতিহাসে বাণিজ্য, জনবসতি, নদীপথ এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুরনো মালদহের সামাজিক জীবন ও ধর্মীয় ঐতিহ্য সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই অংশ।

উপরের পুজোগুলিই উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ তালিকা নয়। কোচবিহারের দিনহাটার মহামায়া পুজো, বামনহাটের লাহিড়ী পরিবারের পুজো এবং বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলের পুরনো পারিবারিক দুর্গোৎসবও এই সাংস্কৃতিক মানচিত্রের অংশ।

একইভাবে, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহের বহু জনপদে এখনও এমন পুজো রয়েছে, যেগুলির ইতিহাস মূলত পারিবারিক স্মৃতি কিংবা স্থানীয় লোককথার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

কোনও পুজোর বয়স দুশো বছর, কোনওটির তিনশো, আবার কোনওটি শতবর্ষের কাছাকাছি— এমন দাবি শোনা যায়। কিন্তু কতগুলি পুজোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার নির্দিষ্ট সাল, প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় কিংবা প্রাচীন দলিল সহজে পাওয়া যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলার জন্য একটি সমন্বিত ঐতিহ্য-সমীক্ষা প্রয়োজন। স্থানীয় ইতিহাস গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রন্থাগার, সংবাদমাধ্যম, পুজো কমিটি ও প্রবীণ নাগরিকেরা একসঙ্গে উদ্যোগ নিলে হারিয়ে যেতে বসা বহু তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব।

লেখক পরিচিতি: অরুণ কুমার। প্রবীণ সাংবাদিক। সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত। ইকো ট্যুরিজম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্সের আনাচকানাচে নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com