তৃণমূল কংগ্রেস কোনও রাজনৈতিক দলই নয়। শেষ দশ বছরে দলটি একটা শক্তিশালী মাফিয়া নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছিল। আরও যা লিখলেন উত্তম দেব-
নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া জোটকে আঁকড়ে ধরতে চাইছেন। আরে, এই সেদিনও রাহুলকে তাচ্ছিল্য করে কথা বলতেন কালীঘাটের কলতলার এই মাসি। আর রাহুল ভাবছেন, মমতা ওকে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বড় উদ্ধার করে দেবে! গান্ধী পরিবারের এই ব্যাচেলর আহাম্মক (রাজনৈতিক জ্ঞানে) জানেন না, তৃণমূল দলটাই আর থাকবে না। পশ্চিমবঙ্গের প্রতি ১০জন সাধারণ জনগণের মধ্যে ৯জনই তৃণমূল কংগ্রেসকে তোলামূল ছাড়া অন্য নামে সম্বোধন করেন না। তৃণমূল কংগ্রেস কোনও রাজনৈতিক দলই নয়। শেষ দশ বছরে দলটি একটা শক্তিশালী মাফিয়া নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছিল। অভিষেক ব্যানার্জি ছিলেন এই নেটওয়ার্কের কিংপিন। এই নেটওয়ার্ককে সাপোর্ট দিতেন পুলিশের বড় বড় আধিকারিক ও আমলারা।
এই দলটায় টাকা দিয়ে দলীয় পদ এমনকি পুরসভা ও পঞ্চায়েতের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পদ কিনতে হয়। লোকসভা ও বিধানসভা আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়ন কিনতে হত তৃণমূলীদের। যে দর বেশি দিত, তার ভাগ্যেই টিকিট জুটত। অভিষেক মনোনয়ন ও পদ বন্টনকে নিলামে পরিণত করেছিলেন। অভিষেকের আড়কাঠি হিসেবে কাজ করত আইপ্যাকের লোকেরা। ৪ মে সন্ধ্যার পর থেকে তো তৃণমূলের লোকেরাই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। মনোজ তিওয়ারি নামে তৃণমূলের এক বিদায়ী বিধায়ক বলেছেন, এবারের নির্বাচনে তাঁকে ৫ কোটি টাকা দিয়ে মনোনয়ন কিনতে বলা হয়েছিল। তিনি অপারগ হওয়ায় টিকিট দেন নি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃণমূলে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ১ কোটি, ২ কোটি, ৩ কোটি, ৫ কোটি টাকা দিয়ে কিনে এমপি, এমএলএ, পুরসভার চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের সভাধিপতি, কর্মাধ্যক্ষ, দলের জেলা সভাপতি হও। তারপর তোলাবাজি করে পাঁচগুণ-সাতগুণ কামিয়ে তার ২৫ শতাংশ আবার ক্যামাক স্ট্রিটের শান্তিনিকেতনে ফিরিয়ে দাও। এই ‘ওপেন সিক্রেট’ এতদিন সবাই জানত। পাবলিক চার দেওয়ালের ভেতর চাপাস্বরে বলত। ৫ মে সকাল থেকে মানুষ ভয়মুক্ত হয়ে তারস্বরে বলছে। কাজেই এই তৃণমূল থুরি তোলামূল মাফিয়া পার্টিটা আর থাকবে না। দলটার ব্লক প্রেসিডেন্ট থেকে স্টেট প্রেসিডেন্ট- সবাই তোলাবাজি করে সম্পদশালী হয়েছে। দল আর ক্ষমতায় নেই। সবাই দলে দলে দলত্যাগ করে অন্য দলে ভিড়বে। যারা চোর-ছ্যাচ্চড়, তারা সবসময় শাসকদলের ছাতার নিচে আশ্রয় নেয়।
আমি, আশা করব, পশ্চিমবঙ্গে যে দল বিপুল জনাদেশ নিয়ে ক্ষমতায় আসতে চলেছে, তারা তৃণমূলের তোলাবাজদের দলে না নিয়ে জেলে ভরার ব্যবস্থা করবে। কোনও ‘স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করে এই দুর্নীতিবাজ তৃণমূল নেতাদের দ্রুত বিচার যদি সম্ভব হয়, নতুন সরকার ভেবে দেখতে পারে। অথবা কোনও তদন্ত কমিশন গঠন করে তৃণমূল আমলের সমস্ত ঘাপলা অনুসন্ধান করে দেখা যেতে পারে। জেলায় জেলায় , মহকুমায় মহকুমায় তো বটেই এমনকি ব্লকে ব্লকে যে যার মতো সামাজিক সম্পদ, সরকারি টাকা, নদীর বালি-পাথর, জমি লুটেপুটে খেয়েছে।
বোকা রাহুল যদি ভেবে থাকেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার অগ্নিকন্যা রূপে রাজপথে অবতীর্ণ হয়ে বাংলায় জনজোয়ার তুলবে, আর রাহুল তার কিছু বেনিফিট পাবেন, তবে রাহুল মূর্খের স্বর্গে বসে দিবাস্বপ্ন দেখছেন। ২০১১-র আগের মমতা আর ২০২৬-এর মমতা এক নয়। এই ১৫ বছরে শাসক মমতা কী জিনিস, বাংলার মানুষ তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। মমতা নিজে টাকা মারে নি, এই কথাটা দুনিয়ার সবথেকে বড় ঢপ। যারা এখনও বলে মমতার দল চোর কিন্তু মমতা সৎ, তাদের উদ্দেশে বলি, মমতার ভাই-ভাইপোরা যে মেরে সব ফাঁকা করে দিল, সেই দায় মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে নিতে হবে না?

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।
Feature image is representational.