কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রঙ ৪ মে দুপুর থেকেই গৈরিক। শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলার বিধানসভায় বিজেপি ২৯৪-এ ২০৭! দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় বিজেপি। শ্যামাপ্রসাদ ভারতীয় জনসংঘের স্রষ্টা। জনসংঘেরই উত্তরসূরি বিজেপি, ১৯৮০ সালের ৬ এপ্রিল যার জন্ম। ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে ২০২৬ সালের ৯ মে, বাংলা সন ১৪৩৩-এর পঁচিশে বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনের সকালে ১১টা বেজে ৩৫ মিনিট নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের যাত্রা শুরু। লোকারণ্য ব্রিগেডে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীকে শপথবাক্য পাঠ করালেন রাজ্যপাল আরএন রবি। শুভেন্দুর পরনে ছিল বাঙালির চিরন্তন সাদা ধুতি ও ঊর্ধ্বাঙ্গে গেরুয়া ফতুয়া। কপালে গেরুয়া তিলক।
ব্রিগেডে ইতিহাসের সাক্ষী থাকলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং যোগী আদিত্যনাথ সহ সবকটি বিজেপি ও এনডিএ শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সৃষ্টি হওয়ার পর এই প্রথম ঐতিহাসিক ব্রিগেড ময়দানে কোনও মুখ্যমন্ত্রী শপথ নিলেন। নতুন ইতিহাস রচিত হল, তাই ব্রিগেড ব্যতীত আর কোনও স্থান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শপথের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ভোটের প্রচারপর্বেই মোদী বুঝে গিয়েছিলেন, বাংলায় ঐতিহাসিক পরিবর্তন আসন্ন। প্রচারের মঞ্চ থেকেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, “বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ সমারোহে উপস্থিত থাকব আমি।”
শুভেন্দুর শপথ চাক্ষুষ করতে শুক্রবার রাত থেকেই দলে দলে বিজেপি কর্মীরা কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই হাওড়া-শিয়ালদহ স্টেশনে ব্রিগেডমুখী মানুষের ভিড়। সকাল হওয়ার পর কলকাতার সব পথ গিয়ে যেন মিলিত হল ব্রিগেডের মাঠে। সাধারণ মানুষ থেকে সেলিব্রিটি, সাধুসন্ত থেকে রাজনৈতিক কর্মী- লক্ষ লক্ষ মানুষের হর্ষোল্লাস ও জয়শ্রী রাম ধ্বনির গর্জনের মধ্যে শপথ পড়লেন শুভেন্দু অধিকারী, শনিবার সকাল ১১টা ৩৫ মিনিট থেকে যিনি বাঙালিহিন্দুর একমাত্র হোমল্যান্ডের অধিনায়ক।
শপথের পর রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে আলিঙ্গন করেন মোদী-শাহ। শুভেন্দুর হাতে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত তাঁরা। শুভেন্দুর গায়ে গেরুয়া উত্তরীয় পরিয়ে দেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। এদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু ও নিশীথ প্রামাণিক। ছয়জনকে নিয়ে শুভেন্দুর মন্ত্রিসভার যাত্রা শুরু। পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করা এখনও বাকি। আগামী সোমবার মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হবে বলে শোনা যাচ্ছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাঁচ মন্ত্রীর দফতর বণ্টন করেন নি রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণ সমারোহে ব্রিগেডের মঞ্চে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৯৭ বছরের মাখনলাল সরকারের চরণ ছুঁতে যান। শিলিগুড়ির বাসিন্দা মাখনলাল সরকার ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের একজন। তিনি আরএসএস-এর একনিষ্ঠ প্রচারক ছিলেন। শ্যামাপ্রসাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যোগ দিয়েছিলেন জনসংঘে।
১৯৫২ সালে যখন ‘এক দেশমে দো নিশান, দো বিধান নেহি চলেগা’ আওয়াজ তুলে ভারত কেশর শ্যামাপ্রসাদ কাশ্মীরে অভিযান চালিয়েছিলেন, তখন তরুণ মাখনলাল ছিলেন সেই অভিযানে শ্যামাপ্রসাদের একজন সঙ্গী। গ্রেফতার হয়ে কাশ্মীরের জেলে মৃত্যুবরণ করেন বাঙালি শ্যামাপ্রসাদ। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে মাখনলালবাবুকে সম্বর্ধনা প্রদান করে রাজ্য বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নবতিপর মাখনলাল সরকারের গায়ে শাল জড়িয়ে দেন। মাখনলালবাবুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
Feature image: NNDC.