পলিটিক্যাল ডেস্ক: জল্পনাই সত্যি হল। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করল কেন্দ্রীয় সরকার। সোমবার বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার পদে দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ করা হয়েছে। শীঘ্রই তিনি তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।” বাংলাদেশে ভারতের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মাকে ইতিমধ্যেই বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করেছে সরকার। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ৭৫ বছরের দীনেশ ত্রিবেদী প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হবেন।
বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের ক্যাডার প্রণয় ভার্মার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। প্রণয়ের স্থলে কাকে ঢাকায় পাঠানো হবে, তা নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির রাজনৈতিক মহলে কিছুদিন ধরেই নানা জল্পনা চলছিল। বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে বিহারের প্রাক্তন রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খানকে পাঠানো হবে বলে মাঝে মিডিয়ায় শোরগোল উঠেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দীনেশ ত্রিবেদীর নামে সিলমোহর দিল কেন্দ্র। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর এই প্রথম কোনও পেশাদার কূটনীতিকের পরিবর্তে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে রাষ্ট্রদূত করে পাঠালো ভারত।
১৯৫০ সালের ৪ জুন দিল্লিতে দীনেশের জন্ম এক গুজরাটি পরিবারে। কর্মসূত্রে দীনেশ ত্রিবেদীর বাবা হীরালাল ত্রিবেদী কলকাতায় স্থানান্তরিত হন। হিমাচল প্রদেশের একটি বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়ালেখা শেষ করার পর দীনেশ ভর্তি হন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এখান থেকে কমার্সে স্নাতক হয়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করেন তিনি। কলকাতায় দীর্ঘ বসবাসের সূত্রে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলায় চোস্ত। বাঙালি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত এবং রবীন্দ্রনাথ-নজরুল পড়া দীনেশ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বিষয়েও যথেষ্ট অভিজ্ঞ।
আশির দশকে কংগ্রেসে যোগ দেওয়া দীনেশ ত্রিবেদী ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংয়ের জামানায় জনতা দলে যোগ দেন। ১৯৯০-৯৬ তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সাংসদ ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করার পর দীনেশ ত্রিবেদী মমতার দলে নাম লেখান ও তৃণমূলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০২-০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত হন। মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হন। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মমতার জায়গায় দীনেশ ত্রিবেদী কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হন কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই মমতার বিরাগভাজন হয়ে তাঁকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়।
২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে দীনেশ ত্রিবেদী ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে পরাজিত হন। মমতা পরে দীনেশকে রাজ্যসভায় পাঠালেও ততদিনে তৃণমূলের উপর থেকে দীনেশের মন উঠে যায়। রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ২০২১-এর ৬ মার্চ বিজেপিতে যোগদান করেন দীনেশ ত্রিবেদী। পশ্চিমবঙ্গে এখন বিধানসভা নির্বাচন চলছে। দ্বিতীয় দফা ভোটগ্রহণের ঠিক দু’দিন আগে দীনেশকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ করল ভারত সরকার।
২০২৪-এর ৫ অগাষ্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কুটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে। মুহাম্মদ ইউনূসের জামানায় ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। তবে বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিশাল বিজয় ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচক ফের ঊর্ধ্বমুখী। এই পরিস্থিতিতে বাংলা ভাষায় সড়গড় পশ্চিমবঙ্গের একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিককে ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত করে পাঠালো মোদী সরকার। বিষয়টিকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে দুই দেশের রাজনৈতিক মহল।
Feature image: NNDC.