না ঘরকা, না ঘাটকা

না ঘরকা, না ঘাটকা


উচ্চশিক্ষা, দুর্ধর্ষ মেধা, চোখ ধাঁধানো রেজাল্ট কিম্বা উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের সঙ্গে স্বভাব-চরিত্রের বিশেষ কোনও সম্পর্ক আছে বলে প্রমাণিত হয় নি। ডিগ্রি, ক্ষমতা, বিত্ত কিম্বা উচ্চ সামাজিক অবস্থান কি ভেতরের মানুষটাকে পাল্টায়? পাল্টায় না। বরং ক্ষেত্র বিশেষে অহংবোধকে আরও বাড়িয়ে দেয়। লঙ্কাধিপতির বিদ্যা-বুদ্ধি-মেধা, বিত্ত-বৈভব এবং ক্ষমতা কম ছিল না। কিন্তু অতি দর্প তাঁর বিনাশের কারণ হয়েছিল। অপরাধীর ধনী-দরিদ্র, অভিজাত-অনভিজাত, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ হয় না।

পেশীশক্তিতে নারী পুরুষের তুলনায় দুর্বল হতে পারে কিন্তু নারী পুরুষের তুলনায় কম অপরাধমনস্ক- এখনও পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে তা প্রমাণিত হয় নি। আমাদের শাস্ত্রে বলেছে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ মাত্রই ষড়রিপুর নিয়ন্ত্রণাধীন। কোনও রিপুর লাগাম হাতের বাইরে চলে গেলেই পতনের সমূহ সম্ভাবনা। এই জন্যই বিজ্ঞান ও দর্শন উভয়েই সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের কথা বলেছে। মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত শক্তিশালী, জটিল এবং দুর্বোধ্য। বিজ্ঞান দাবি করে, প্রাণী মাত্রের‌ই যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মের একমাত্র উৎস মস্তিষ্ক। যদিও ভারতীয় আধ্যাত্মবাদ মনে করে, মনের উপরেও আছে চৈতন্য।

মনের গতি ভয়ঙ্কর। মনের ক্ষমতা মারাত্মক এবং মনের স্বাধীনতাকে বেঁধে রাখার মতো কোন‌ও লৌহশৃঙ্খল জগতে তৈরি হয় নি। তবে আমাদের গুরুরা বলেন, কেবল বিবেক বা চৈতন্য দিয়েই মনকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাও যে মানুষের চৈতন্যোদয়ে অ‍ক্ষম, সূচনা শেঠের কুকীর্তি তার প্রমাণ। অনিয়ন্ত্রিত আবেগ, অন্ধ জেদ এবং সীমাহীন আক্রোশ মানুষকে কোথায় নামাতে পারে, আমাদের দুই মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারত তা দেখিয়েছে। আধুনিক উচ্চশিক্ষা, ধন-সম্পদ কিম্বা সফল ক্যারিয়ার‌ও যে মানুষকে অপরাধ বিমুখ করে না, তার ভুড়ি ভুড়ি উদাহরণ এখন আমাদের চোখের সামনে। সূচনা শেঠ একটা সংখ্যা বাড়াল মাত্র।

হার্ভার্ডে পড়ালেখা করা সূচনা শেঠ নিজের চার বছরের সন্তানকে খুন করেছে বলে অভিযোগ। সমাজ বলছে, এমন কুমাতা হ‌ওয়াও সম্ভব! প্রাণীমনে সকল প্রবৃত্তির উৎস প্রকৃতি। মাতৃত্ব‌ও একটা প্রবৃত্তি ভিন্ন কিছু নয়। তবে সুপ্রবৃত্তি। যে সুপ্রবৃত্তির উদ্দীপনায় একজন নারী মা হয়, কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় সেই নারীই কখনও কখনও কুমাতা হয়ে নিজের সন্তানকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। এমন উদাহরণ জগতে আছে। আজকালকার বাপ-মায়েরা সন্তানদের উচ্চশিক্ষা, ভাল রেজাল্ট, ভাল ক্যারিয়ার নিয়ে যতটা চিন্তিত থাকেন, সন্তানদের মানসিক গঠন নিয়ে ততটাই চিন্তিত থাকেন কি? ছেলেমেয়েদের মন বোঝার চেষ্টা করেন কি? কীসে সন্তানদের মনের জানালাগুলোর বন্ধ কবাট খুলে যায় এবং তা দিয়ে চৈতন্যের আলো ঢোকে, সেই চেষ্টা তাঁরা করেন?

সূচনা শেঠের ঘটনাটা অন্য দিক দিয়েও আমাদের ভাবাচ্ছে। স্বামী বেঙ্কটরমনের সঙ্গে সূচনার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেছে। সন্তানের দায়িত্ব তাকেই দিয়েছে আদালত। দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে গেলে নাবালক সন্তানকে লালন-পালনের দায়িত্ব ন্যায়সঙ্গত ভাবেই মায়ের হাতে ন্যস্ত করে থাকে আদালত। কিন্তু বাবাদের‌ও তো সন্তানের উপরে দাবি এবং দায়িত্ব দুটোই আছে। প্রশ্ন হল, বিবাহবিচ্ছিন্ন বাবারা কি সন্তানের উপর সেই দাবি ফলানোর সুযোগ পান? বাস্তব সত্য হল, আদালতের নির্দেশের পরেও অনেক ক্ষেত্রেই বিবাহবিচ্ছিন্ন বাবারা সন্তানের উপর দাবি হারান। দায়িত্ব তো মায়ের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দিয়েও সারা যায়। কিন্তু চাইলেও সন্তানের ধারেকাছে ঘেঁষতে পারেন না বহু বাবা। সূচনা শেঠের প্রাক্তন স্বামীকে প্রতি রবিবার করে সন্তানের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিয়েছে আদালত। কিন্তু অন্যায় জেদের বশে আদালতের নির্দেশকেও মানতে রাজি ছিল না একটি কর্পোরেট সংস্থার শীর্ষ পদে আসীন ওই উচ্চশিক্ষিত নারী। প্রাক্তন স্বামীকে ক্ষণিকের অপত্যসুখ থেকে বঞ্চিত রাখতে পেটের ছেলেকে খুন করতে পর্যন্ত বাঁধে নি সূচনার!

আমেরিকা-ইউরোপে বিবাহ বিচ্ছেদের পর সন্তানের উপর এমন অযৌক্তিক এবং অন্ধ কর্তৃত্ব ফলান না মায়েরা। সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্তানকে কাছে পান বাবারাও। ভারতে সূচনা শেঠদের মতো উচ্চশিক্ষিত, স্বচ্ছল, সম্পন্ন নারীরা ঠিক কোন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত? এঁরা না ভারতীয় মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করতে পারল, না পশ্চিমী দায়বদ্ধতাকে গ্রহণ করল। ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ ছাড়া এই মানসিকতাকে আর কী নাম দেওয়া যায়?


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *