মণিপুরে স্থায়ী শান্তি সুদূর পরাহত তবে অবিলম্বে আপাত স্থিতি না আনলে দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে - nagariknewz.com

মণিপুরে স্থায়ী শান্তি সুদূর পরাহত তবে অবিলম্বে আপাত স্থিতি না আনলে দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে


পৃথিবীর ইতিহাসে কোন‌ও যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, গোষ্ঠী সংঘর্ষ এমনকি রাজনৈতিক সংঘাত নারীর উপর যৌন নির্যাতন বিনা শেষ হয়েছে কিনা সন্দেহ। আরও যা লিখলেন উত্তম দেব-

মণিপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এন বীরেন সিংয়ের সরকার যে ব্যর্থ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের ব্যর্থতার দায় প্রধানমন্ত্রীকেও লজ্জিত করেছে। দুই মহিলাকে বিবস্ত্র করে ঘোরানো ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর দেশের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। কুৎসিত ঘটনাটি ঘটেছিল গত ৪ মে। এতদিন চাপা ছিল।‌ ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হ‌ওয়ার আগে পর্যন্ত দোষীদের গ্রেফতারে স্থানীয় প্রশাসন যে উদ্যোগ নেয় নি, তা স্পষ্ট। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন‌ও যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ এবং গোষ্ঠী সংঘর্ষ এমনকি রাজনৈতিক সংঘাত নারীর উপর যৌন নির্যাতন বিনা শেষ হয়েছে কিনা সন্দেহ।

নারীরাই নারীকে ধর্ষকদের হাতে তুলে দিয়েছে!

প্রায় তিন মাস ধরে গোষ্ঠী সংঘর্ষে জ্বলছে মণিপুর। মেইতেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কুকি-নাগা-জো প্রভৃতি উপজাতিবর্গের সংঘর্ষে এখনও পর্যন্ত ১৬০ জন খুন হয়েছে। আহত অসংখ্য। অগুণতি ঘরবাড়ি, দোকানপাট লুটতরাজ ও ধ্বংস হয়েছে। ৩২ লক্ষ অধিবাসীর ছোট্ট রাজ্যে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। দুই জাতিগোষ্ঠী মারমুখী মনোভাব নিয়ে একবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলে তাদের সংযত করা মুশকিল। যেই দুই নারীকে বিবস্ত্র করে হাঁটানোর ভিডিও ভাইরাল হয়েছে তারা কুকি সম্প্রদায়ের।‌ যে ছয় অভিযুক্তকে এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা মেইতেই সম্প্রদায়ের। এক‌ই দিনে রাজধানী ইম্ফলে কুকি সম্প্রদায়ের দুই নারীকে গণধর্ষণের পর খুন করা হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। এই ঘটনায় পাঁচ অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তারপরেও একাধিক নারী ধর্ষণের ঘটনা অশান্ত মণিপুরে ঘটেছে, যা এখন জানা যাচ্ছে। গত ১৫ মে পূর্ব ইম্ফলে ১৮ বছরের এক উপজাতি যুবতীকে ঘর থেকে তুলে এনে চারজন পুরুষের হাতে তুলে দিয়েছিল মেইতেই জনগোষ্ঠীর একদল মহিলা।

নারী ধর্ষণের প্রতিবাদে মণিপুরের চূড়াচাঁদপুরে বিরাট বিক্ষোভ। ফটো- সংগৃহীত

গণধর্ষিত সেই যুবতী নাগাল্যান্ডের একটি হাসপাতালে ভর্তি। যুবতীর অভিযোগ, যে মহিলারা তাকে ঘর থেকে বের করে এনে সশস্ত্র পুরুষদের হাতে তুলে দিয়েছিল, তারা সকলেই ‘মেইরা পেইবিস’ নামে একটি নারী সংগঠনের সদস্য। ‘মেইরা পেইবিস’ ইম্ফল উপত্যকায় ‘মাদার অব মণিপুর’ বা ‘মণিপুরের মা’ নামেও পরিচিত। মহিলাদের বিরুদ্ধে নির্যাতন বন্ধে যে সংগঠনের জন্ম, সেই সংগঠনের মহিলারাই ভিন্ন সম্প্রদায়ের অসহায় যুবতীকে নিজেদের সম্প্রদায়ের উন্মত্ত পুরুষদের হাতে তুলে দিচ্ছে! গোষ্ঠী হিংসা একবার ছড়িয়ে পড়লে তা কতটা নির্মম হয়ে উঠতে পারে, এই একটি ঘটনাই তা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট।

আইনের শাসন কার্যকর নেই

গত ৪ মে থৌবল জেলায় দুই জনজাতি নারীকে বিবস্ত্র করে হাঁটানোর ২৬ সেকেন্ডের ভিডিও প্রায় আড়াই মাস পরে ভাইরাল হ‌ওয়ার আগে পর্যন্ত নারী ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসে নি। ঘটনাগুলি যে স্থানীয় প্রশাসনের নজরে আসে নি, এই কথা বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। সব জেনেও যে মণিপুরের পুলিশ যে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে নি বা করার সাহস পায় নি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কুকি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অমূলক নয়

শুধু মণিপুর‌ নয়, সমগ্র উত্তরপূর্বাঞ্চলেই জাতিগোষ্ঠীগুলির মধ্যে সদ্ভাব নেই। গোষ্ঠীসংঘর্ষ বা ‘এথনিক কনফ্লিক্ট’ উত্তর পূর্বাঞ্চলের পুরোনো সমস্যা। মেইতেইরা মণিপুরের মোট জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ। মেইতেইদের অধিকাংশই ধর্ম বিশ্বাসে হিন্দু।‌ বাকিরা ‘সানামাহি’ ধর্মমত পালন করে। কিছু ইসলাম ধর্মাবলম্বীও আছে। কুকি-নাগা-জো প্রভৃতি জনজাতি পূর্বে সর্বপ্রাণবাদী বা প্রকৃতি পূজক ছিল।‌ বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে তাদের ধর্মান্তরিত করে খ্রিস্টান মিশনারিরা। এই মুহূর্তে মণিপুরে হিন্দু ও খ্রিস্টানের সংখ্যা প্রায় সমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইরা মণিপুরের ইম্ফল উপত্যকায় বাস করলেও কুকি, নাগা এবং জো সহ ছোট ছোট উপজাতি গোষ্ঠীগুলি রাজ্যের পার্বত্য জেলাগুলি দখল করে রেখেছে। কুকি সহ বাকি জনজাতিগুলির হাতে নিজেদের জমিজমা, সম্পদ ও সংস্কৃতি হারানোর ভয় চেপে বসেছে মেইতেইদের মধ্যে। ভারত ও মায়ানমারের কুকিদের নিয়ে পৃথক একটি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখে জঙ্গি সংগঠন কুকি ন্যাশনাল আর্মি বা কেএন‌এ। মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মিজোরাম এবং অসম সহ উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব রাজ্যেই কুকি জনগোষ্ঠীর মানুষ ছড়িয়ে থাকলেও মণিপুরেই তাদের সংখ্যা সবথেকে বেশি। কুকি, নাগা ও জো সহ বিভিন্ন জনজাতি মণিপুরের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ বলে ধারণা করা হয়। ফলে কেএন‌এ জঙ্গিদের উপদ্রব‌ও মণিপুরেই বেশি।

দুই কুকি জঙ্গি সংগঠনের হাতেই রয়েছে প্রচুর অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। মাদক পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। ফটো ক্রেডিট- টিওআই

গত মার্চেই রাজ্য সরকারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসে মণিপুরের দুই জঙ্গি সংগঠন কেএন‌‌এ ও জেড‌আর‌এ। এই দুই জঙ্গি গোষ্ঠীর হাতেই প্রচুর অত্যাধুনিক অস্ত্র। অতীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী কুকি জঙ্গিদের হাতে মেইতেই জনগোষ্ঠীর বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে মণিপুরে। এই পরিস্থিতিতে কুকিদের প্রতি মেইতেইদের ভয়কে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার‌ সুযোগ নেই। কুকি জঙ্গি সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে মেইতেইদের সবথেকে বড় অভিযোগ, মায়ানমারে ঘাঁটি গেড়ে থাকা কুকি জঙ্গিরা রাজ্যের দুর্গম পার্বত্য এলাকাগুলিতে অবাধে আফিম চাষ করে মাদক ব্যবসা চালাচ্ছে। উত্তরপূর্বাঞ্চল ও মায়ানমারের জঙ্গি সংগঠনগুলির আয়ের অন্যতম উৎস যে মাদক পাচার, তার প্রমাণ দেশের আর্মি ইন্টেলিজেন্স ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের হাতে আছে।

কুকিদের মধ্যেও বিজেপির প্রভাব আছে

উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যেই বিজেপির বিস্তার উল্লেখ করার মতো। অসম ও ত্রিপুরার পর উত্তর-পূর্বের যে রাজ্যে বিজেপির জনভিত্তি সবথেকে মজবুত তার নাম মণিপুর।‌ ৬০ সদস্যের মণিপুর ব বিধানসভায় বিজেপির সদস্য সংখ্যা ৩২। বিজেপির মূল শক্তির উৎস মেইতেইরা। তবে কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যেও বিজেপির ৫ বিধায়ক আছেন, যা মোট কুকি বিধায়কের অর্ধেক। ‘কুকি পিপল’স অ্যালেয়েন্স’ এন বীরেন সিং সরকারের শরিক। বিধানসভায় কেপিএ-র আছে দু’জন বিধায়ক। অর্থাৎ কুকি বিধায়কদের সংখ্যাগরিষ্ঠ‌ই এনডিএ শিবিরের। এই পরিস্থিতিতে মণিপুরের ঘটনায় দল হিসেবে বিজেপি যে যথেষ্ট‌ই বিব্রত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্থায়ী শান্তি কষ্টসাধ্য কিন্তু আপাত স্থিতি জরুরি

শান্তি ফিরিয়ে আনতে মণিপুরে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাইও বার কয়েক দিল্লি-ইম্ফল করেছেন। পরিস্থিতি শোধরাতে পারে- এমন আভাস যখন পাওয়া যাচ্ছিল, ঠিক তখনই নারী নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল করা হল। গোষ্ঠীসংঘর্ষে বিদীর্ণ মণিপুরে নারী নির্যাতনের একাধিক ঘটনা সামনে আসতেই মোদীকে চেপে ধরেছে বিরোধীরা। গত এপ্রিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই জনগোষ্ঠীকে তফসিলি জনজাতির মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি রাজ্য সরকারকে বিবেচনা করে দেখার নির্দেশ দিয়েছিল মণিপুর হাইকোর্ট। এতেই গাত্রদাহ শুরু হয় কুকি, নাগা ও জো সহ বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীগুলির। জনজাতিদের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন গত ৩ মে ‘অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ মণিপুর’ নামে মোর্চা গড়ে হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে পথে নামলে গোষ্ঠী সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিজেপি শাসিত এই রাজ্য। মণিপুরে জাতিগোষ্ঠীগুলির মধ্যে সদ্ভাব কোন‌ও কালেই ছিল না। তিন মাসের হানাহানিতে পরস্পরের প্রতি ন্যূনতম আস্থাও উধাও। কিন্তু তারপরেও গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ও সংহতির স্বার্থে মণিপুরে অনতিবিলম্বে শান্তি ও স্থিতাবস্থা ফেরানো‌ জরুরি।‌ ঠিক কী কী পদক্ষেপ করলে চিত্রাঙ্গদার দেশে একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসে, তা প্রধানমন্ত্রী মোদীকেই খুঁজে বের করতে হবে।

Feature Image is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *