শুধু পুলিশে ভরসা নেই, পঞ্চায়েত ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের‌ও নির্দেশ দিল ডিভিশন বেঞ্চ - nagariknewz.com

শুধু পুলিশে ভরসা নেই, পঞ্চায়েত ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের‌ও নির্দেশ দিল ডিভিশন বেঞ্চ


কলকাতা: পঞ্চায়েত ভোটে মনোনয়ন পেশের সময়সীমা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত রাজ্য নির্বাচন কমিশনের উপর ছেড়ে দিলেও প্রার্থী, ভোটকর্মী ও ভোটারদের নিরাপত্তায় শুধু পুলিশে ভরসা নেই আদালতের, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের‌ও নির্দেশ দিল ডিভিশন বেঞ্চ। ভোটগ্রহণে স্বচ্ছতা ও ভোটকর্মীদের মন থেকে ভয়ভীতি দূর করতেও আর‌ও বেশ কিছু পদক্ষেপ করল কলকাতা হাইকোর্ট। পঞ্চায়েত ভোটে মনোনয়নের সময়সীমা বৃদ্ধি, সিভিক ভলান্টিয়ারদের ভোটের কাজের বাইরে রাখা, বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ও সিসি ক্যামেরার নজরদারির আর্জি জানিয়ে শুক্রবার ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বিরোধীরা। সোমবার মামলার শুনানি পর্ব শেষ হলেও রায়দান স্থগিত রাখে প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ। মঙ্গলবার বিকেলে এল সেই রায়, যার দিকে তাকিয়ে ছিল শাসক-বিরোধী এবং নবান্ন থেকে নির্বাচন কমিশন, সবাই।

৭ স্পর্শকাতর জেলায় এখনই কেন্দ্রীয় বাহিনী

বিরোধী দলগুলি সবথেকে বেশি চিন্তিত সন্ত্রাস ও হিংসা নিয়ে। মনোনয়ন পর্বে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেভাবে অশান্তির খবর আসছে, তাতে বিরোধীদের অভিযোগ অমূলক নয় বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। পরিস্থিতি বিবেচনা করে শঙ্কামুক্ত পরিবেশে পঞ্চায়েত ভোট করানোকেই সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিল আদালত। তাই রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন না চাইলেও কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে পঞ্চায়েত ভোট করার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ। ডিভিশন বেঞ্চের স্পষ্ট নির্দেশ- রাজ্যের ৭টি স্পর্শকাতর জেলায় অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ৭টি স্পর্শকাতর জেলাও চিহ্নিত করে দিয়েছে আদালত। মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পূর্ব মেদিনীপুর, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং জলপাইগুড়ি- এই সাতটি জেলাকে আপাতত স্পর্শকাতর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুলিশের ঘাটতি মেটাতে হবে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়েই

চিহ্নিত ৭টি স্পর্শকাতর জেলার বাইরে আরও কোন কোন জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক তা পর্যালোচনা করে দেখতে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। স্পর্শকাতর জেলাগুলি ছাড়াও যে জেলাগুলিতে বুথে মোতায়েন করার মতো পর্যাপ্ত পুলিশ রাজ্য প্রশাসনের হাতে নেই, সেই জেলাগুলিতেও প্রয়োজন অনুসারে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার নির্দেশ দিয়েছে ডিভিশন বেঞ্চ। আদালত বলেছে, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বাহিনী চাইবে রাজ্য। রাজ্যের চাহিদা অনুযায়ী বাহিনী পাঠাবে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় বাহিনীর খরচ কেন্দ্র‌ই বহন করবে, রাজ্য সরকারকে কিছু দিতে হবে না।

কমিশনকে দায়িত্ব মনে করিয়ে দিল আদালত

পঞ্চায়েত আইন মেনে পঞ্চায়েত ভোটের দিনক্ষণ ও মনোনয়ন নিয়ে যাবতীয় সিদ্ধান্তের ভার কমিশনের উপরেই ছেড়ে দিয়েছে আদালত। নির্বাচনের নির্ঘন্ট সংক্রান্ত ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের উপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না আদালত- এ রকম একটি নির্দেশ আছে সুপ্রিম কোর্টের। কিন্তু পছন্দের প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোট দেওয়া নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। তাই পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কমিশনকেই যাবতীয় পদক্ষেপ করতে হবে- মঙ্গলবার পঞ্চায়েত ভোট মামলার রায় দিতে গিয়ে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে হাইকোর্ট। প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ আরও বলেছে, ভোট সুষ্ঠু অবাধ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে যা যা পদক্ষেপ করা প্রয়োজন, তার সব‌ই করতে হবে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে।

ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা অথবা ভিডিও রেকর্ডিং

নিরাপত্তা নিয়ে ভোটকর্মীরাও শঙ্কিত। বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করেছিল রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন‌ও। ভোটকর্মীদের শঙ্কামুক্ত করতে যা যা করা প্রয়োজন, তা করতে নির্দেশ দিয়েছে প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ। বিরোধীদের দাবি ছিল- বুথের ভেতরে ও বাইরে সিসি ক্যামেরার নজরদারি।‌ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে এই দাবিও মেনে নিয়েছে আদালত। প্রতিটি বুথে সিসি ক্যামেরা বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতিরা। যে সব ভোটকেন্দ্রে সিসি টিভি বসানোর মতো পরিকাঠামো থাকবে না, সেই সব ভোটকেন্দ্রে ভিডিও রেকর্ডিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে কমিশনকে।

সিভিকদের ভোটের নিরাপত্তায় বহাল নয়

চুক্তিভিত্তিক কর্মী,সিভিল ডিফেন্স ও‌ এনসিসি-র ছেলেদের ভোটের কাজে নিয়োগ করতে চায় কমিশন। এদিন আদালত বলে দিয়েছে, একান্ত নিরুপায় হলে এঁদের চতুর্থ পোলিং অফিসারের পরবর্তী কোন‌ও পদে কাজে লাগাতে পারবে প্রশাসন। তবে সিভিক ভলান্টিয়ারদের ভোটে নিরাপত্তা রক্ষার কাজে ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

আদালতে মুখ পুড়ল রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের

কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে স্বাভাবিকভাবেই সন্তুষ্ট বিরোধী দলগুলি। আদালতে মুখ পুড়ল রাজ্য সরকার ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের। প্রথম থেকেই এক দফায় ভোট ও রাজ্য পুলিশ দিয়েই ভোট করানো নিয়ে অনড় ছিল সরকার ও কমিশন। বিরোধীদের আর্জিতে কমিশন কর্ণপাত তো করেই নি এমনকি ডিভিশন বেঞ্চের সামনেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরোধিতা করেন কমিশন ও রাজ্যের আইনজীবী। কিন্তু বিচারপতিদের চোখকান খোলা। মনোনয়ন পর্বেই যেভাবে হিংসা ছড়াচ্ছে, তাতে এটা উপলব্ধি করতে বিচারপতিদের কষ্ট হয় নি যে কেন্দ্রীয় বাহিনী ছাড়া সুষ্ঠু পঞ্চায়েত ভোট সম্ভব নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *