মন্ত্রী ও তাঁর বান্ধবী এবং টাকার পাহাড়- গল্প যেন এখানেই না ফুরোয়


টাকার পাহাড় আমরা সাধারণত সিনেমায় দেখতে অভ্যস্ত। বাতাসে টাকা ওড়ে। নায়ক টাকার গহ্বরে তলিয়ে যায়। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমায় যেমন নায়ক অরিন্দম মুখার্জি ( উত্তমকুমার) স্বপ্নে টাকার পাহাড়ে টাকা ওড়াতে ওড়াতে টাকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিল। বাস্তবে‌ও এক শ্রেণীর মানুষ টাকার পাহাড়ে চড়ে। টাকার পাহাড়ে থাকে। কদাচিৎ টাকার পাহাড়ে চোরা খাদে তলিয়ে‌ও যায়। কার‌ও টাকার পাহাড় থাকলেই তো আর তা সকলের দৃষ্টিগোচর হয় না। আমরা যারা আম আদমি, মাস গেলে গোনাগুণতি টাকার মুখ দেখি তাদের কাছে টাকার পাহাড় দর্শন একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার বৈকি। শেষ পর্যন্ত আমরা কিন্তু টাকার পাহাড় দেখলাম!

সবাই তো টাকা চায়। কিন্তু পায় ক‌’জন। টাকা তো আর আকাশ থেকে পড়ে না। টাকা উপার্জনের জন্য কাজ করতে হয়। পশ্চিমবঙ্গে আজ মানুষের হাতে কাজ কোথায়? ঘরে ঘরে শিক্ষিত‌ বেকার।‌ যুবক-যুবতীরা চাকরির দাবিতে রাস্তায়- রোদে পুড়ছে, জলে ভিজছে। এই রকম পরিস্থিতিতে কার‌ও ঘরে টাকার পাহাড় ‌দেখলে জনগণের তো টাস্কি লাগবেই। সমাজে সবাই ধনী হতে চায়। যার টাকা আছে জাগতিক সব সুখ তার করায়ত্ত। যার নেই স্বীয় আঙুল চোষা ছাড়া তার উপায় কী। তাই টাকাওয়ালাকে দেখে যার টাকা নেই, তার চোখ টাটায়। যদিও সৎপথে বড়লোক হ‌ওয়া কোন‌ও অন্যায় নয়। কিন্তু যেই টাকার স্তূপে প্রতিটি নোটের মধ্যে কান পাতলে শোনা যায় বেকারের ফোঁপানি, অবসরপ্রাপ্ত পিতার দীর্ঘশ্বাস আর অসুস্থ মায়ের বিলাপ সেই টাকার পাহাড় দেখে দেহের কোষে কোষে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠা কি খুব অন্যায়?

ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ লেনদেন, ক্ষমতার আস্ফালন এবং স্বজনপোষণ সমাজে নতুন নয়। কিন্তু গত এগার বছর ধরে বঙ্গীয় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অনিয়ম, অনৈতিকতা, দুর্নীতি এবং দুর্বৃত্ততা চলছে তা আগে দেখা যায় নি। সবথেকে ভয়ঙ্কর কথা- পশ্চিমবঙ্গে টাকা ছাড়া চাকরি বন্ধ হয়ে গেছে। তোলা না দিয়ে ব্যবসা করার উপায় নেই। জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাট কিনতে গেলে নজরানা দেওয়া বাধ্যতামূলক। সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে স্বচ্ছতা শব্দটি উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। টাকা দাও চাকরি নাও। দশ লক্ষ, পনেরো লক্ষ, সতেরো লক্ষ টাকায় চাকরি বিক্রি হচ্ছে রাজ্যে। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এজলাসে বসে‌ নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা না করলে আমরা জানতেই পারতাম না স্কুল সার্ভিস কমিশন নামক প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে আগাপাশতলা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে এস‌এসসি নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তভার সিবিআই-ইডি নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে আমরা জানি না। কারণ এই দেশে রাঘববোয়ালদের জালবন্দী করা বড় সহজ কথা নয়। সারদা ও রোজভ্যালি কেলেঙ্কারি মামলায় সিবিআই-ইডির ভূমিকা ভুক্তভোগীদের হতাশ করার জন্য যথেষ্ট। যোগ্যতা থাকার পরেও‌ যে চাকরিপ্রার্থীরা বঞ্চিত হতে হতে আদালতের শরণাপন্ন, তারা শেষ পর্যন্ত ন্যায় বিচার পাবে কিনা তা সময়‌ই বলবে। তবে আপাতত আশার কথা- আদালতের কড়া নজরদারিতে নিয়োগ দুর্নীতির মামলা সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে মনে হয়। ইডি-সিবিআই জোরদার ছানবিন চালাচ্ছে বলেই আমরা জানতে পারলাম আমাদের রাজ্যের এক হেভিওয়েট মন্ত্রীর বিশেষ বান্ধবীর বাসায় টাকার পাহাড় আছে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় গ্রেফতার। তিনি রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী থাকার সময়েই এস‌এসসি নিয়োগ ঘোটালা হয়েছে। অর্পিতা মুখোপাধ্যায়। পার্থবাবুর বান্ধবী। অর্পিতা অভিনেত্রী ও মডেল। যদিও শুক্রবার সন্ধ্যার আগে আমরা কেউ তাঁর নাম জানতাম না। ইডির অভিযানে ফ্ল্যাটে টাকার পাহাড়ের খোঁজ পাওয়ার পর থেকেই অর্পিতা রাজ্য জুড়ে বিখ্যাত। অর্পিতার বয়স ত্রিশ‌ও পেরোয় নি। কিন্তু উনসত্তরের পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অর্পিতার নাকি দারুণ খাতির। এটা নিয়ে যদিও জনগণের মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। আমরা শুধু জানতে চাই- অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাট থেকে বাজেয়াপ্ত সাড়ে ২২ কোটি নগদ টাকার উৎস কী? নিয়োগ দুর্নীতির দুই নম্বরি টাকাই কি মন্ত্রীর বদান্যতায় ওই মডেল-অভিনেত্রীর জিম্মায়? শুধু তো‌ এই বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাই নয়। টালিগঞ্জের ডায়মন্ড সিটি হাউসের যে অভিজাত আবাসনে অর্পিতার ফ্ল্যাট, সেখান থেকে ইডি উদ্ধার করেছে ৫৮ লক্ষ টাকার সোনার গয়না। ৫৪ লক্ষ টাকার ফরেন কারেন্সি। ২২ টা মোবাইল হ্যান্ডসেট। কলকাতা শহরেই সব মিলিয়ে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিক অর্পিতা। একাধিক দামি গাড়ি। মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার টাকা গুণতে ব্যাঙ্ক থেকে চারটি মেশিন আনতে হয়েছে ইডির অফিসারদের।‌ তারপরেও টাকা গুণতে গুণতে হাত ব্যথা হয়ে গেছে তাঁদের। শুক্রবার সন্ধ্যায় টাকা গোনার কাজ শুরু করে শেষ হয় শনিবার বিকেলে। পঞ্চাশটি ট্রাঙ্কে টাকা ভরে ট্রাকে‌ তুলে রিজার্ভ ব্যাংকে পাঠাতে পাঠাতে ফের সন্ধ্যা হয়ে গেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আগে কখনও এমন দৃশ্য দেখে নি। পার্থবাবুর আরও এক বান্ধবীর খোঁজ পাওয়া গেছে। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা। সেই অধ্যাপিকাও নাকি মন্ত্রীমশাইয়ের অনেক খাজানার খোঁজখবর রাখেন এবং দেখভাল করেন। রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী সবান্ধবী ইডি হেফাজতে। যদিও আদালত থেকে বেরিয়েই যথারীতি এস‌এসকেএম-এ ঢুকে গেছেন মন্ত্রীমশাই। নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হ‌ওয়ার পরেও পার্থ‌ চট্টোপাধ্যায়ের মন্ত্রীত্ব এবং নিজ দলে মহাসচিব পদ অটুট আছে। অনেকেই বলছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীর ফ্ল্যাটে প্রায় বাইশ কোটি নগদ টাকা সহ যে বিপুল সম্পদের হদিস পাওয়া গেছে তা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। নিয়োগ দুর্নীতির আরও মালামাল নাকি আবিষ্কারের অপেক্ষায়। দুর্নীতির জেরে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত শিক্ষিত যুবকেরা এখনও খোলা আকাশের নিচে মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে। আমরা তো ঘর পোড়া গরু। আমরা ভয় পাই। আমাদের সংশয় দূর হয় না। আমাদের একটাই চিন্তা- মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে যারা নিজের বিত্ত-বৈভব বাড়িয়েছে, সেই গণশত্রুদের ন্যায়ের দরবারে শেষ পর্যন্ত শাস্তি মিলবে তো?

Feature photo is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published.