নাড্ডার ভর্ৎসনায় বন্ধ হবে কি বঙ্গ বিজেপির অলীক কুনাট্য রঙ্গ? - nagariknewz.com

নাড্ডার ভর্ৎসনায় বন্ধ হবে কি বঙ্গ বিজেপির অলীক কুনাট্য রঙ্গ?


শাহ যেতেই নাড্ডা এলেন বাংলায়। কিন্তু দল যে গাড্ডায়! গাড্ডাটা আবার নিজেদের খোঁড়া! নাড্ডা টেনে তুলে দিয়ে গেলেন কি? বিশেষ প্রতিবেদন-

বঙ্গ বিজেপি রোজ‌ই শিরোনামে। কিন্তু এই শিরোনাম যতটা না রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি গোষ্ঠী কোন্দলের জেরে। বিধানসভা নির্বাচনে স্বপ্নভঙ্গ হ‌ওয়ার পর প্রায় বছর খানেক বঙ্গ বিজেপিকে‌ নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না দিল্লির দীনদয়াল ভবনের। লোকসভা নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসতেই বাংলা নিয়ে আর উদাসীন থাকতে পারলেন না অমিত শাহ- জেপি নাড্ডারা। যেই রাজ্যে ৪২ টা লোকসভার আসন, সেই রাজ্যে দলটাকে আর কতদিন ধর্মের নামে চড়ে বেড়াতে ছেড়ে দিয়ে রাখতে পারেন এই বিচক্ষণ নেতারা। তাই শাহ যেতেই নাড্ডা এলেন বাংলায়। কিন্তু দল যে গাড্ডায়!

বাংলা সফর শেষ করে সদ্যই দিল্লি ফিরেছেন জেপি নাড্ডা।

জনগণ বঙ্গ বিজেপিকে গাড্ডায় ফেলে নি

এমন নয় যে বাংলার জনগণ বঙ্গ বিজেপিকে ঠেলে গাড্ডায় ফেলে দিয়েছে। ৩৮.১৩ শতাংশ ভোট আর ৭৭টা আসন কত মেহনতের পর জনতা জনার্দন থেকে আদায় করা সম্ভব, তা বোঝার মতো ক্ষমতা যদি মুরলীধর সেন লেনের পদ্মবাড়ির কর্তাকর্ত্রীদের থাকত, তবে বিধানসভায় প্রধান ও একমাত্র বিরোধীদল হ‌ওয়ার দুর্লভ সম্মানলাভের মাত্র এক বছরের মাথায় দলটাকে এমন খিল্লির বস্তু করে তুলতেন না তাঁরা। যে কোনও রাজনৈতিক দলেই একাধিক গোষ্ঠী থাকে এবং গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে মতানৈক্যের ঘটনা বিরল নয়। কিন্তু বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ শাখায় বিষয়টা আর মতানৈক্যে সীমাবদ্ধ নেই গৃহযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। বঙ্গ বিজেপির অন্দরে কটা শিবির এবং কে কার বন্ধু তা স্বয়ং ভগবানের পক্ষেও বোঝা সম্ভব নয়। কে গায়ে পদ্মফুলের নামাবলী চড়িয়ে অন্তরে‌ ঘাসফুলকে ধূপ-ধুনো দিচ্ছেন- এটাই হচ্ছে এই মুহুর্তে রাজ্য রাজনীতির সবথেকে চর্চিত বিষয়। নবান্ন হাতের মুঠোয় চলেই এসেছে- উনিশের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে এই আনন্দে পাইকারি হারে তৃণমূল থেকে লোক ঢুকিয়ে রাতারাতি বঙ্গ বিজেপির কলেবর স্ফীত করা হয়েছিল। দল হারলে এই নীতি যে ব্যাক ফায়ার করবে বিজেপির মধ্যেই এটা অনেকে বুঝেছিলেন। কিন্তু বিষয়টিতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রশ্রয় থাকায় তাঁদের নীরব দর্শক হয়ে দেখা ছাড়া উপায় ছিল না।

বঙ্গ বিজেপি কি তাসের ঘর?

একুশের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর রাজ্য বিজেপিতে তার ধাক্কা অবধারিত ছিল। কিন্তু সেই ধাক্কার জের যে এত দূর গড়াবে তা কেউ কল্পনা করতে পারে নি। বিধানসভা ভোটের পর বছর পার। বঙ্গ বিজেপি এখনও ঘরের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা তৃণমূলের চরদের‌ই শনাক্ত করে উঠতে পারল না। উল্টে মুরলীধর সেন লেনের পদ্মশিবিরে জোর কানাকানি চলছে- কে তৃণমূলের চর, কে নয়! অনেকেই ঠাট্টা করে বলছেন, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হবে যে। বাবুল সুপ্রিয়, অর্জুন সিং হাসতে হাসতে তৃণমূলের ঝান্ডা ধরার পর দলের নেতাদের প্রতি বিজেপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের বিশ্বাস টলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। গঙ্গাজল ছুঁয়ে দলে থাকার অঙ্গীকার করলেও মনে হয় না তাঁদের আর বিশ্বাস করবেন কর্মী-সমর্থকেরা। অর্জুন সিংকে হস্তগত করার পর তৃণমূলের যুবরাজ এমন ভাব দেখিয়েছিলন, যেন তিনি চাইলেই একটি টোকা দিয়ে বঙ্গ বিজেপির তাসের ঘর ভেঙে দিতে পারেন। তিনি প্রতিপক্ষ শিবিরের সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু বঙ্গ বিজেপির নেতারা কি কখনও আন্তরিকভাবে এই ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন?

লকেট‌ও কি ডুবে ডুবে আদিগঙ্গায় জল খাচ্ছেন?

বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা এমন সময় বাংলায় এলেন যখন দু’দিন আগেই দলের একজন হাই প্রোফাইল সাংসদ ‍‍ ড্যাং ড্যাং করতে করতে তৃণমূলে যোগ দিলেন। তিনি শুধু দলের সাংসদ‌ই ছিলেন না তাঁকে রাজ্য বিজেপির সহসভাপতির পদ‌ও দেওয়া হয়েছিল। নাড্ডা কলকাতায় পা দেওয়ার আগের দিন‌ও সংবাদ মাধ্যমে হুগলির সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে কানাঘুষো। সংবাদ মাধ্যমে এখন গবেষণার বিষয়- অর্জুনের পর বিজেপির আর ক’জন সাংসদ তৃণমূলে পা বাড়িয়ে। যাঁদের নিয়ে জল্পনা তাঁদের মধ্যে লকেট অন্যতম। দলের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এই পরিস্থিতিতে লকেটকে নিয়ে গুঞ্জন ওঠাটা স্বাভাবিক। গুঞ্জন ঠান্ডা হয় এমন কোনও জোরালো পদক্ষেপ হুগলির সাংসদ এখনও পর্যন্ত করেছেন বলে জানা নেই। কলকাতায় নাড্ডার কর্মসূচিতে লকেট ছিলেন। কিন্তু তাতেই আশ্বস্ত হ‌ওয়ার জন্য দলের সাধারণ কর্মীরা আর প্রস্তুত নয়। অভিষেক ব্যানার্জির ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে গিয়ে ঘর ওয়াপসির দু’দিন আগেই দিল্লিতে নাড্ডার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসেছিলেন অর্জুন সিং।

দিলীপ কি আদৌ শোধরাবেন?

বঙ্গ বিজেপির এমন অবস্থা, একজন ঘর গোছাতে চাইলে আরেকজন পারলে লন্ডভন্ড করে দেন। দিলীপ ঘোষ যখন রাজ্য বিজেপির সভাপতি তখন সুকান্ত মজুমদারের সঙ্গে দিলীপের সম্পর্কের রসায়ন খারাপ ছিল না। সুকান্ত সভাপতি হ‌ওয়ার পর নিজের মতো করে সংগঠন গোছাতে যেতেই দিলীপের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গেল টক হয়ে। এখন দিলীপ-সুকান্ত শিবির আড়াআড়ি বিভাজিত। সুকান্ত-শুভেন্দু জুটি যাতে নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে সেই লক্ষ্যে তাঁদের ঘাড়ের উপর থেকে দিলীপ ঘোষকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরে যাওয়ার নির্দেশ দিতেই দিলীপের গোঁসা। বিরোধীদের সম্পর্কে তো বটেই নিজের দলের নেতাদের সম্পর্কে‌ও দিলীপ ঘোষের মুখ থেকে বেফাঁস মন্তব্য বের করে আনা সাংবাদিকদের কাছে কোনও ব্যাপার‌ই নয়। প্রাতর্ভ্রমণ করতে করতে দলের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া দিলীপের জন্য দুই মিনিটের কাজ। তাঁকে এই কাজ থেকে বিরত রাখতে শেষ পর্যন্ত শক্ত পদক্ষেপ করে শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু দিল্লি থেকে দিলীপের কাছে চিঠি আসতেই সেই চিঠি মিডিয়ায় ফাঁস। দলের অন্দরের বিষয় বাইরের লোক জানল কেমন করে যদি ঘরের ভেতরেই গোপন কথা পাচার করার লোক না থাকে?

নাড্ডার সফরের মধ্যেও বঙ্গ বিজেপিতে সৌহার্দ্যের অভাব!

বাংলায় দলের এই হাল যে জেপি নাড্ডাকে খুশি করে নাই, তা বলাই বাহুল্য। নাড্ডার সফরের মধ্যেও বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্ব নিজেদের কোন্দল ধামাচাপা দিয়ে রাখতে ব্যর্থ। এক জায়গায় অসন্তোষ হাতাহাতিতে পর্যন্ত গড়িয়েছে। সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়কে আঙুল উঁচিয়ে শাসাতে দেখা গেছে। নাড্ডা বিজেপির প্রদেশ কার্যকারিণী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করার আগে পৃথক পৃথক ভাবে রাজ্যের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দলের মন্ডল সভাপতিদের সম্মেলনে ভাষণ দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত দলের সাংসদ, বিধায়ক এবং বিজেপির রাজ্য সংগঠনের পদাধিকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। নিজেদের মধ্যে মিলমিশ নেই দেখে বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে নাড্ডার তীব্র ভর্ৎসনার মুখেও পড়তে হয়েছে। নিজেদের মধ্যে লাঠালাঠি ভুলে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে জোরকদমে মাঠে নামতে সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারীদের নির্দেশ দিয়েছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি।

নাড্ডার ভর্ৎসনায় নেতাদের সম্বিৎ ফিরবে?

নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় রাজ্য সরকার আদালতে জেরবার। শিক্ষিত যুবসমাজ সরকারের উপর তিতিবিরক্ত। বিধানসভায় শূন্য পাওয়ার পরেও এই ইস্যুতে রোজ রাজপথে বামপন্থীরা। প্রধান বিরোধীদল কেন সেই স্থানটা নিচ্ছে না- বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরাই এই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। এখন জগৎপ্রকাশ নাড্ডার গুঁতোয় বঙ্গ বিজেপির নেতাদের সম্বিৎ ফিরবে কি? ইতিমধ্যেই যাহা তৃণমূল তাহাই বিজেপি- এই তত্ত্ব জনগণকে গেলাতে তৎপর হয়ে উঠেছে বামেরা। রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতারা যদি রাজপথে না থেকে নিজেদের মধ্যে কাঁকড়াবাজিতেই বেশি ব্যস্ত থাকেন তবে মানুষ কিন্তু এই সিদ্ধান্তে আসতে দেরি করবে না- এরা আসলেই তৃণমূলের বি টিম।

Photo Credit- Official FB page of Bengal BJP.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *