রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: প্রার্থীতেই বিরোধীদের মাৎ করে দিল বিজেপি,ভোট তো কেবল নিয়ম রক্ষার


দ্রৌপদী মুর্মুর রাষ্ট্রপতি হ‌ওয়া সময়ের অপেক্ষা মাত্র। দ্রোপদী জিতবেন‌ই। তার চেয়েও বড় কথা এটা বিজেপির এমন একটা মাস্টার স্ট্রোক যা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাইরেও পদ্ম শিবিরকে রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড দেবে।

পলিটিক্যাল ডেস্ক : আমাদের রাজনৈতিক প্রতিবেদনে আগেই বলা হয়েছিল- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আস্তিনে লুকোনো তাস এখনও সামনে ফেলে নি বিজেপি। তাসটি ফেলা হল মঙ্গলবার রাতে বিরোধী জোটের প্রার্থীর নাম প্রকাশের পর। ইলেক্ট্রোরাল কলেজে এনডিএ’র যা শক্তি তাতে যে কোনও একজনকে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দিলেই, তাঁকে জিতিয়ে আনতে বেগ পেতে হত না বিজেপিকে। কিন্তু দলটার নাম বিজেপি এবং দলটাকে চালান সংঘ পরিবারের পাকা মাথারা। কীভাবে এক ঢিলেই দশ পাখি বধ করতে হয়, ভারতের রাজনীতিতে এই মুহুর্তে এই কৌশল নাগপুরের হেডগেওয়ার ভবনের চেয়ে আর কেউই ভাল চালতে জানে না। সারা ভারত এতক্ষণে জেনে গেছে দেশের পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি হতে চলেছেন একজন‌ আদিবাসী নারী- যাঁর নাম দ্রৌপদী মুর্মু।

হিসেবের থেকেও বেশি ভোট পাবেন দ্রোপদী মুর্মু

মঙ্গলবার রাত দশটা নাগাদ দিল্লির দীনদয়াল ভবনে জেপি নাড্ডার মুখ থেকে এনডিএ’র রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর নামটি শোনার পরেই দেশের রাজনৈতিক মহল বুঝে যায়- ইলক্ট্রোরাল কলেজে এনডিএ’র যা মোট শক্তি তার থেকেও কমপক্ষে তিরিশ শতাংশ বেশি ভোট নিশ্চিত করে ফেললেন এনডিএ’র প্রার্থী। দ্রোপদী মুর্মু ওড়িশার মেয়ে। তাঁর নাম ঘোষণা হ‌ওয়া মাত্র মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক যে উচ্ছ্বসিত ভাষায় ট্যুইট করেছেন তাতে মনে হ‌ওয়াই স্বাভাবিক, বিজেপির সিদ্ধান্তে সবথেকে খুশি তিনিই। ওড়িশা থেকে ‌ দ্রোপদী মুর্মু যে রেকর্ড মার্জিনে জিতবেন, এই নিয়ে এখন আর কোনও সন্দেহ নেই। বরং দেখার এটাই- ওড়িশায় কংগ্রেসের নয় বিধায়কের ক’জন দলের হুইপ অমান্য করে প্রথম পছন্দের ভোটটি ঘরের মেয়েকেই দেন।

গান্ধীর স্বপ্ন, সাকার করার পথে বিজেপি

গান্ধীজি একবার এ’রকম একটা কথা বলেছিলেন- ভারতের স্বাধীনতা সেই দিন‌ই সার্থক‌‌ হবে যে দিন একজন অন্ত্যজ কন্যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হবেন। রাষ্ট্রপতি ভারতের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। ইতিপূর্বে দু’জন দলিত ভারতের সাংবিধানিক প্রধান হয়েছেন। সংখ্যালঘু শ্রেণি থেকে একাধিক জন রাইসিনা হিলে গিয়েছেন। নারীও রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত পুরুষ কিংবা নারী- দেশের বৈচিত্র্যময় জনজাতি গোষ্ঠীবর্গ থেকে কেউই সরকারের সর্বোচ্চ পদে বসার সুযোগ পান নি। দেশের পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি পদে একজন আদিবাসী নারীকে প্রার্থী করার পর বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করতেই পারেন- স্বাধীনতার ৭৫ বছরের মাথায় ইতিহাসের দায় মেটানোর কাজটি তাদের হাত দিয়েই সম্পন্ন হতে চলেছে।

শেষমেশ বিরোধীদের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী বিজেপি ছুট যশবন্ত সিংহ।

যশবন্তকে সামনে রেখে নিয়ম রক্ষার লড়াই বিরোধীদের

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধীদের সর্বসম্মত প্রার্থী নিয়ে সবথেকে বেশি উৎসাহী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়‌ই। যদিও যোগ্য প্রার্থী খুঁজতে গিয়ে যথেষ্টই নাকাল হতে হয়েছে বিরোধী শিবিরকে। মমতা জোরাজুরি করার পরেও প্রার্থী হন নি শরদ পাওয়ার। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ফারুক আবদুল্লা ও গোপালকৃষ্ণ গান্ধী‌ও। লড়াইয়ের শুরুতে এইভাবেই বিরোধী শিবিরের জোশ মাঠে মারা গেছে। শেষ পর্যন্ত বিরোধী শিবির থেকে যিনি প্রার্থী হলেন তিনি ৮৪ বছরের যশোবন্ত সিংহ। প্রাক্তন আইএএস আমলা যশবন্তের রাজনৈতিক জীবনের শুরুয়াৎ জনতা পার্টির হয়ে। পরে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বাজপেয়ী জামানায় কেন্দ্রীয় সরকারে অর্থ ও পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০১৪-র পর মোদী ও শাহের সঙ্গে যখন যশবন্তের দূরত্ব তৈরি হল তখন তো তাঁর বানপ্রস্থে যাওয়ার বয়স। ছেলে জয়ন্ত বিজেপির টিকিটে সাংসদ নির্বাচিত হলেও তাতে মন ভরে নি বৃদ্ধ পিতার। দলে কল্কে না পেয়ে শেষে ২০১৮-য় বিজেপি ত্যাগ করেন অশীতিপর এই নেতা। একুশের ১৩ মার্চ অগতির গতি তৃণমূলে যোগ দেন যশবন্ত সিংহ। বিরোধীরা যখন দেশের চারদিকে লোক পাঠিয়েও উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছে না তখন একবার সাধিবা মাত্র‌ই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে রাজি হয়ে যান যশবন্ত। বোঝা যাচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হতে না পারলেও একজন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে ইতিহাসে নাম তুলেই নিজের রাজনৈতিক জীবনে দাঁড়ি টানতে চান যশবন্ত সিংহ।

বিজেপি রাজনৈতিকভাবেও লাভবান হবে

এই বারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সব থেকে মজার ঘটনা হল প্রতিদ্বন্দ্বিতারত প্রধান দুই প্রার্থীর দু’জনের গায়েই বিজেপির গন্ধ- একজন বাগী এই যা! আগামী ১৮ জুলাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ২১ জুলাই গণনা। তার আগেই মহারাষ্ট্রে শিবসেনা-কংগ্রেস-এনসিপি জোট সরকারের পতন ঘটে যেতে পারে মহারাষ্ট্রে। উদ্ধব থ্যাকারের শিবির ত্যাগ করে ৪৬জন শিবসেনা বিধায়ক একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে বিজেপির ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। ১৫ থেকে ২১- পাঁচ বছর ঝাড়খন্ডের রাজ্যপাল ছিলেন দ্রৌপদী মুর্মু। ঝাড়খন্ডের আদিবাসী বিধায়কেরা বিবেকের টানে দলমত নির্বিশেষে দ্রৌপদী মুর্মুকে ভোট দিতেই পারেন।‌ টিআর‌এস এবং ওয়াইএস‌আর কংগ্রেসের মতো দল‌ও যে এনডিএ’র রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীকেই সমর্থন করবে তা এক প্রকার পরিস্কার। এমনকি বিরোধী শিবির থেকেও মুর্মুর পক্ষে বেশ কিছু ক্রশ ভোটিংয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী সকাশে দ্রৌপদী মুর্মু।

মোট কথা- প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি প্রাপ্তি এখন দেশবাসীর জন্য সময়ের অপেক্ষা মাত্র। দ্রৌপদী মুর্মু রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, এটা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর সর্বত্র একটাই আলোচনা- ইতিহাস ঘটানোর দাবিদার হ‌ওয়ার সুবাদে এর রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড কি চব্বিশে‌ও ঘরে না তুলে ছাড়বে বিজেপি?

Photo sources- Collected.


Leave a Reply

Your email address will not be published.