বিরোধীরা আগোছালো, হ্যাট্রিকের বর্ষপূর্তিতে বিপাকে পড়েও নিশ্চিন্তে মমতা


একুশে ভোটের আগে তৃণমূলের স্লোগান ছিল- বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়। পেয়েছেও। কিন্তু বাংলা কি বেকারদের কর্মসংস্থান, নারীর নিরাপত্তা, হিংসামুক্ত রাজনীতি আর ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষাও চায় না?

বিশেষ প্রতিবেদন : জয়ের হ্যাট্রিক গণতন্ত্রে যে কোন‌ও রাজনৈতিক দলের জন্য নিঃসন্দেহে গৌরবের। আজ ২ মে- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের হ্যাট্রিক হাঁকানোর দিন। বাংলায় টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট।‌ বাহান্নর নির্বাচন থেকে ধরলে রাজ্যে কংগ্রেস সরকারে ছিল টানা ১৫ বছর। তৃণমূল সরকারে দশ বছর পূর্ণ করে আরও পাঁচ বছর সরকারে থাকার জনাদেশ লাভ করেছিল এক বছর আগে ঠিক আজকের দিনটিতেই। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসন বাংলায় ভালমন্দ মিশিয়ে একাধিক গুণগত পরিবর্তন এনেছিল। গণতন্ত্রে একটি দল বা জোটের টানা ৩৪ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকাটা একটা বিস্ময়। একটা সময় মনে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে বামেদের শাসন হিমালয়ের মতোই অটল। এগারোয় সেই বামকে টলিয়ে দিয়ে মহাকরণ দখল মমতার।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বারের জন্য শপথ নিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

১১ বছরে পাল্টে গিয়েছে বাংলার রাজনৈতিক বিন্যাস

বাম পরবর্তী এগারো বছরে বাংলার রাজনৈতিক চালচিত্র আমূল বদলে গেছে বললে অতিশয়োক্তি হয় না। যেই বাংলার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করত যৌথ নেতৃত্বে চলা সিপিএমের মতো একটি সংগঠিত দল সেই বাংলার চালিকাশক্তি এখন একজন মাত্র নারী- যাঁর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এগার বছর আগে মমতা প্রথম যেদিন রাজভবন থেকে পায়ে হেঁটে মহাকরণে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছিলেন সেদিনের থেকেও রাজনৈতিকভাবে আজকের মমতা অনেক বেশি শক্তিশালী। এগারো বছর আগে‌ বামেরা যেদিন মসনদচ্যুত হয়েছিল সেদিন‌ও বাংলায় তাদের ভোট ছিল চল্লিশ শতাংশ। ২০২১-এর নির্বাচনে বামেদের ভোট নেমে আসে ছয় শতাংশের‌ও নিচে। বিধানসভায় শূন্য। বাম আমলে বাংলায় পাঁচ শতাংশ ভোটের পাওনাদার বিজেপি আজ বিধানসভার একমাত্র বিরোধীদল।‌ পাঁচ শতাংশ থেকে বিজেপির ভোট বেড়ে ৩৮.১৩ শতাংশ।

মমতার রাজত্বে বাংলায় সবথেকে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন বিজেপির উত্থান।

মমতার রাজত্বেই বাংলায় বিজেপির উত্থান

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের শাসনকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসন বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। সম্ভবতঃ মমতা নিজেও তেমনটি শুনতেই পছন্দ করেন।‌ মমতার এগারো বছরের শাসনে বাংলার সবথেকে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন বিজেপির  উত্থান। এবং এই উত্থান আকস্মিক বললে ভুল হয় না। ২০১৪-র নির্বাচনে বাংলায় বিজেপির ভোট ১৭ শতাংশ পার করেছিল। উনিশের লোকসভায় পদ্ম বেড়ে যখন চল্লিশ হল তখন থেকেই বাংলায় রাজনৈতিক জমির একটা বড় অংশীদার হয়ে উঠল বিজেপি।‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে একুশে নবান্নে প্রত্যাবর্তনটা ছিল নিঃসন্দেহে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। পরপর দুই দফায় ক্ষমতায় থাকার পর তৃতীয়বার ফিরে আসাটা যে কোনও রাজনৈতিক ‌দল‌ বা ব্যক্তিত্বের জন্য‌ই বরাবর চ্যালেঞ্জের। মমতাকে এই চ্যালেঞ্জটা ছুড়েছিল বিজেপি। অথবা বলা ভাল
চ্যালেঞ্জটা ছুড়েছিলেন মোদী এবং শাহ নামে ভারতীয় রাজনীতির দুই সুপার হেভিওয়েট।

মমতার কৌশলের কাছে পরাজয় বিজেপির

রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মমতা শুধু খাদের কিনারা থেকেই ফিরে আসেন নি বিরাট বিজয়‌ও ছিনিয়ে এনেছিলেন।‌ মমতার সেই বিজয়ের দিনটি আজ। উনিশের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে জোর ধাক্কা খাওয়ার পর তৃণমূল সুপ্রিমো যে খানিকটা উদভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন তা অস্বীকার করার জায়গা নেই। নিজের ভাবমূর্তি ও দলের সংগঠন মেরামতিতে ভোট কুশলী প্রশান্তকিশোরের সাহায্য নিতে বাধ্য হন মমতা। পিকের কৌশল যে মমতাকে ভোট বৈতরণী পার হতে বিশেষ সাহায্য করেছে, এতে কার‌ও কোন‌ও সংশয় নেই। উনিশের লোকসভা নির্বাচন থেকে বাংলায় মেরুকরণ বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করে। বিপর্যস্ত মমতা বলেছিলেন- যেই গরু দুধ দেয় সেই গরু লাথি মারলেও ভাল। একুশে সংখ্যালঘু ভোট‌ই মমতাকে রক্ষা করে। তবে “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়”- তৃণমূলের এই স্লোগানের যুৎস‌ই কোনও জবাব খুঁজে পায় নি বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী আর অমিত শাহ। যা মমতাকে বহিরাগত তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ করে দেয়। বিজেপিকে বাঙালি বিরোধী দল হিসেবে তুলে‌ ধরে তৃণমূল। মমতার বিকল্প কোনও মুখ‌ও তুলে ধরতে ব্যর্থ হয় পদ্ম শিবির। পাশাপাশি সবুজসাথী, কন্যাশ্রী, খাদ্যসাথী, স্বাস্থ্যসাথী ও দুয়ারে সরকারের মতো জনমোহিনী প্রকল্প এবং সর্বশেষে ঘরের মেয়ে-ব‌উদের পাঁচশ-হাজার করে মাসে মাসে নগদ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজের ভোটব্যাঙ্ক বাড়িয়ে নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিণামে ৪৭.৯৪ শতাংশ ভোট ও ২১৩টি আসন পেয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকারে আসে তৃণমূল কংগ্রেস। উনিশের লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ছয় শতাংশ ভোট বাড়ায় তৃণমূল। একুশের ভোটের লড়াইটা যে‌ই হেতু হয়েছিল ভীষণ রকমের দ্বিমুখী, তাই ৩৮.১৩ শতাংশ ভোট পেয়েও বিজেপিকে থামতে হয় মাত্র ৭৭টি আসনেই।

বিড়ম্বনায় পড়েও নিশ্চিন্তে মমতা

ভোটে জেতাই যদি হয় রাজনীতিতে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে সফলতম নেতা। এই মুহুর্তে মমতাকে টক্কর দেওয়ার মতো কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভীষণ অভাব বিরোধী শিবিরে। ভোটে হারার পর থেকেই বিজেপি ছন্নছাড়া। ২ কোটি ২৮ লক্ষ ভোট পাওয়ার পরেও দলটির আত্মবিশ্বাসের অভাব। সবথেকে বড় কথা, ভাড়াটে সৈন্যদের ‌দিয়ে লড়তে গিয়ে বঙ্গ বিজেপির এখন নাস্তানাবুদ দশা। তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়তে দলের আদৌ সদিচ্ছা আছে কিনা এই নিয়ে সংশয়ে খোদ বিজেপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরাই। সিপিএম সর্বস্ব খুইয়ে শূন্য থেকে শুরু করার লড়াই চালাচ্ছে। কংগ্রেস প্রায় সাইনবোর্ডে পর্যবসিত। প্রধান বিরোধীদল বিজেপি অন্তর্ঘাত আর  অন্তর্কলহে বিপর্যস্ত। গত এক বছরে বালিগঞ্জ বাদে প্রত্যেকটি উপনির্বাচনে বিরাট ব্যবধানে জিতেছে তৃণমূল। পুর নির্বাচনে তো জোড়াফুলের  সুনামি। হ্যাট্রিকের এক বছর পর রাজনৈতিক দিক দিয়ে বড়‌ই নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

নিজের মেয়ের রাজত্বে কেমন আছে বাংলা?

এখন প্রশ্ন হল পর পর ভোটে জেতাই  যদি শাসকের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি না হয় তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে রাজ্যের নাগরিকদের প্রাপ্তি কতটা? ঋণের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গ। ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে যখন রাজ্যপাট ছাড়তে হল সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লক্ষ ৭ হাজার কোটি টাকা। এগার বছর পর রাজ্য সরকারের ঘাড়ে ঋণের বোঝা ৬ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। তিন-চারমাস পর পর ঋণ নিতে হচ্ছে রাজ্যকে। আমরা যারা এই রাজ্যের বাসিন্দা তাদের প্রত্যেকের মাথায় গড়ে ৬০ হাজার টাকা করে দেনা! সরকারের বাজেটের ২৪ শতাংশ বেরিয়ে যায় পুরোনো ধার ও সুদ মেটাতেই। পুরোনো ঋণ মেটানোর জন্য আবার নতুন ঋণ করতে হচ্ছে সরকারকে। এই ঋণ জর্জরিত সরকার রাজ্যে পরিকাঠামো নির্মাণ ও স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টিতে বিনিয়োগ করবে কেমন করে?

বাংলা জুড়ে কর্মসংস্থান তলানিতে।‌ বেকারত্ব ঘরে ঘরে। শিক্ষিত বেকারেরা মানসিক অবসাদে ভুগছে। স্কুলে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে আদালতে মামলার পর মামলা। রাজ্য সরকারের দফতরগুলি থেকে স্থায়ী নিয়োগ প্রায় তুলেই দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য সম্মেলনে খানাপিনা, বক্তৃতাই সার। বড় বিনিয়োগের দেখা নেই। বাংলার শিল্পক্ষেত্রে পুনরুজ্জীবনের কোনও সুদূর সম্ভাবনা‌ও কেউ দেখছে না।‌ রাজনৈতিক হানাহানি বাংলায় আগেও ছিল। এখনও চলছে। এদিকে তোলাবাজি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে এবং এটাই হয়ে উঠেছে এক শ্রেণীর যুবকদের উপার্জনের একমাত্র রাস্তা। বালি-পাথর,কয়লা এবং গরুপাচার ঘিরে শাসকদলের সিন্ডিকেট রাজ ব্লকে ব্লকে ছড়িয়ে পড়েছে। তোলার টাকার বখরা নিয়ে তৃণমূলের ভেতরে গন্ডগোল রোজকার ঘটনা। মানুষের লাশ পড়ছে টপাটপ। এমনকি রেহাই মিলছে না জনপ্রতিনিধিদের‌ও।

মানুষের জ্বালা-যন্ত্রণা উপশমের একটি সহজ রাস্তা বের করেছে সরকার। সস্তায় মদ জুটছে সবার। পারলে দুয়ারে পৌঁছে দেয় আবগারি দফতর। চ্যানেল অন করলেই ধর্ষণের খবর। সরকারি স্কুলগুলিতে পড়ালেখার মান নিয়ে ঘোর সংশয়ে শিক্ষাবিদেরা। কারণ বাংলা বর্ণ পর্যন্ত ভুল লিখছে মাধ্যমিকের পড়ুয়ারা। একুশে ভোটের আগে তৃণমূলের স্লোগান ছিল- ”বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়।” পেয়েছেও। কিন্তু বাংলা কি বেকারদের কর্মসংস্থান, নারীর নিরাপত্তা, হিংসামুক্ত রাজনীতি আর ছেলেমেয়েদের সুশিক্ষাও চায় না?

Photo Credit- Official FB page of Mamata Banerjee and BJP-West Bengal.

  



Leave a Reply

Your email address will not be published.