বগটুই হত্যাকান্ড: তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে যাওয়ায় আশার আলো দেখছে মানুষ


ভাদু খুন ও বগটুই গ্রামে গণহত্যা- মানুষের মনে অনেক প্রশ্ন। বাতাসে অনেক ফিসফাস, কানাঘুষো। চুনোপুঁটিকে জালে তুলে আসল অপরাধীদের আড়াল করা হচ্ছে না তো? আদালতের নির্দেশের পর সিবিআই তদন্ত‌ই সব রহস্যের সমাধান করতে পারে- এমন আশা অনেকেরই।

কলকাতা :বগটুই হত্যাকান্ডের তদন্তে রাজ্যের গঠন করা সিটের উপর ভরসা রাখতে পারল না হাইকোর্ট। মমতা তড়িঘড়ি সিট গঠন থেকে কর্তব্যে গাফিলতির দায়ে পুলিশের আধিকারিকদের সাসপেনশন এমনকি নিজের দলের নেতাকে‌ গ্রেফতারের নির্দেশ- অনেক কিছুই করলেন কিন্তু তাতে ভিডিশন বেঞ্চের চোখকে ফাঁকি দেওয়া গেল না।‌ আসলে বগটুইকান্ডে পর্দার পেছনে এমন আরও অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে যা রাজ্যের ঠিক করা কোন‌ও ইনভেস্টিগেশন টিমের পক্ষে খুঁজে বের করা হয়তো সম্ভব নয়- এই সংশয় থেকেই সিবিআইকে তদন্তভার দিলেন বিচারপতিরা। বিরোধীদল সহ সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠার জায়গাটিও এখানেই ছিল। যারা সোমবার রাতে রামপুরহাটের বগটুই গ্রামে ঘটে যাওয়া নৃশংসতম নরসংহারের পেছনে থাকা সকল রহস্যের উন্মোচন চান ডিভিশন বেঞ্চের রায় নিঃসন্দেহে তাদের খুশি করবে।

বগটুই গণহত্যা- তদন্তভার সিটের থেকে নিয়ে সিবিআইয়ের হাতে দিল হাইকোর্ট।

বাতাসে অনেক ফিসফাস ভাসছে। বীরভূমে যার নির্দেশে গাছের পাতা পর্যন্ত পড়ে না, এই ঘটনার দায় তিনি কীভাবে এড়িয়ে যান- ঘটনার পর থেকেই মানুষের মনে এই প্রশ্ন উঠেছে। রাত আটটায় উপপ্রধান ভাদু শেখ খুন হল। দেড় ঘণ্টা বাদে ভাদুর ছেলেরা অ্যাকশান শুরু করল আর বীরভূমের দন্ডমুন্ডের কর্তাটি কিচ্ছুটি জানেন না – এই বাত তো বোলপুরের একটা বাচ্চার‌ও হজম হবে না। জেলাশাসক পর্যন্ত বাড়িতে গিয়ে যাকে সেলাম ঠুকে আসে, উপপ্রধান খুন হ‌ওয়ার পর থেকে ভোর পর্যন্ত রামপুরহাটের বগটুই এলাকায় যা যা ঘটেছে তার কোনও তথ্য‌ই প্রবল প্রতাপশালী সেই মানুষটির কানে পৌঁছায় নি, এটা বীরভূম জেলা তো বটেই এমনকি কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার- গোটা পশ্চিমবঙ্গেই কেউ বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। তিনি জেলার নেতা হতে পারেন। কিন্তু আপন কর্মগুণে তাঁর খ্যাতি গোটা বঙ্গে ছড়িয়ে গেছে। তাঁর অক্সিজেন কম যাওয়া মাথায় তিনি কী পারেন আর কী পারেন না- তা মিডিয়ার কল্যাণে রাজ্যবাসীর জানা হয়ে গেছে।

আড়ালে ভাদু হত্যা রহস্য?

বগটুইয়ে গণহত্যার কারণ হচ্ছে ভাদু শেখের মৃত্যু। এখন ভাদু কেন খুন হল ? ভাদুর শোকাতুরা বিধবা স্ত্রী বিলাপ পাড়তে পাড়তে তার কয়েকটি কারণ জানিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল গণহত্যাকান্ডের পর থেকে বিশেষ করে বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীর রামপুরহাট সফরের পর থেকে ভাদু হত্যা রহস্য আড়ালে চলে গেছে বা বলা ভাল আড়াল করার একটা চেষ্টা হচ্ছে। ভাদু শেখ মলো আর আনারুল হোসেন জেলে গেল।‌ রামপুরহাট থানার আইসি-ওসি এমনকি এসডিপিওকেও সাইজ করা হল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কি জানে না জেলায় জেলায় পুলিশকে কারা চালায়? পুলিশ চাইলেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে? পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়? যে রাজ্যে পাতি অপরাধীকে ধরার জন্য‌ও প্রতিটি থানার পুলিশকে নবান্নের শীর্ষতলার সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করতে হয় সেই রাজ্যে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে? ভাদু শেখের খুনের‌ পর থানার আইসি কিম্বা এসডিপিও চাইলেই সক্রিয় হতে পারতেন? কেউ যে পুলিশকে নীরব দর্শক হয়ে সবকিছু দেখে যাওয়ার নির্দেশ দেয় নি কে বলতে পারে? বরং এমন কানাঘুষোই শোনা যাচ্ছে যে বীরভূমের দন্ডমুন্ডের কর্তার ইচ্ছাতেই সেই রাতে গ্রামে হামলা হচ্ছে জেনেও আগায় নি পুলিশ।

শেষে বকরি হল আনারুল?

মৃত ভাদু শেখ আর ধৃত আনারুল হোসেন- দু’জনের বাড়ি দেখেই রাজ্যবাসীর চক্ষুস্থির। অবশ্য নেতাদের এমন ঘরদোর এখন রাজ্যের কোনায় কোনায়। পঞ্চায়েত-পুরসভার মেম্বার হ‌ওয়া মানে এখন আলাদিনের চিরাগ হাতে পাওয়া। পঞ্চায়েতের পুরপ্রধান হয়ে ভাদু এবং শাসকদলের ব্লক সভাপতি হয়ে আনারুল যদি এমন বিত্ত-বৈভবের মালিক হতে পারে তবে তাদের যারা বসায়, চলায় এবং নাচায় তাদের ঘরে কোন রাজার ভান্ডার থাকতে পারে আমরা সাধারণ মানুষ শুধু তা অনুমান করতে পারি মাত্র। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর পুলিশ আনারুলকে ধরেছে বটে কিন্তু তার দোষটা কতটা গুরুতর তা নিয়ে সাধারণের মনে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।‌ গ্রেফতার হ‌ওয়ার আগে পর্যন্ত আনারুল হোসেন ছিল রামপুরহাট ব্লক-ওয়ান তৃণমূলের সভাপতি। বগটুই গ্রামের পূর্ব পাড়ার বাসিন্দা ভাদু খুন হল। আর তার প্রতিশোধ নিতে পশ্চিম পাড়ায় ভাদুর অনুগামীরা হামলা চালাল। যখন ঘরের দরজায় ছিকল তুলে দিয়ে বাইরে থেকে আগুন দেওয়া হচ্ছে তখন নাকি আর্ত মানুষেরা আনারুলকে ফোন করে তাদের বাঁচাতে বলেছিল। বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী বগটুই গ্রামে দাঁড়িয়ে আনারুলের ব্যাপারে ঠিক কী বলেছেন আবার একটু দেখে নিই-” আনারুল আমাদের ব্লক প্রেসিডেন্ট। তাঁকে কমপ্লেন করেছিল ওরা( আক্রান্তরা)। কিন্তু আনারুল সময় মতো পুলিশ পাঠায় নি । ওকে অ্যারেস্ট করা হবে। কেন ও পুলিশ পাঠায় নি সময় মতো। পুলিশ পাঠালে ঘটনাটা নাও ঘটতে পারত।”

প্রশ্ন হল আনারুল হোসেন পুলিশ পাঠানোর কে? উপপ্রধান ভাদু শেখের খুনের পর থেকেই তো রামপুরহাট জুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে। ঘটনাস্থল জুড়ে কয়েক গাড়ি পুলিশ মোতায়েন ছিল‌ বলেই খবর। পুলিশ কি তৃণমূলের ব্লক প্রেসিডেন্টের নির্দেশের অপেক্ষায় বসে ছিল? বাপের উপরে বাপ থাকে। যেমন আইসির উপরে এসডিপিও। এসডিপিও-র উপরে এসপি। তেমনি বীরভূম তৃণমূলে আনারুলের উপরে কারা আছেন সবাই তাদের নাম জানে। ভাদু শেখের মৃত্যুর পর বীরভূম জেলা পুলিশের ‌শীর্ষকর্তা এবং বীরভূম জেলা তৃণমূলের শীর্ষকর্তার মধ্যে কোনও কথাবার্তা হয় নি এটা মানুষকে বিশ্বাস করতে হবে?

কী বলল ডিভিশন বেঞ্চ?

বিরোধী দলগুলির নেতা, সাধারণ মানুষ এবং বগটুইকান্ডে মৃতদের পরিবারের সদস্যদের মনে একটা সংশয় ছিল- তদন্তের ভার রাজ্য পুলিশের সিটের হাতে থাকলে এইসব রহস্যের সমাধান নাও হতে পারে। যাদের দিকে অভিযোগের তীর তাদের হাতেই তদন্তের ভার থাকলে এই সংশয়-সন্দেহকে অমূলক বলা চলে না। সৌভাগ্যের কথা মামলা আদালতে ওঠার পর পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ এবং ঘটনার ভয়াবহতা চিন্তা করে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতিদ্বয়‌ও বুঝতে পেরেছেন- নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্তভার সিটের হাত থেকে সরিয়ে সিবিআইয়ের কাছে দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। এইজন্যই ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের কোনও জায়গায় কোন‌ও ধোঁয়াশা নেই। শুক্রবার রায় দিতে গিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তব ও বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের ডিভিশন বেঞ্চ বলছে- ” আমরা এই ঘটনার বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করেছি। মামলার পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এই মামলা সিবিআইকে দেওয়া প্রয়োজন। বিচার ব্যবস্থা এবং সমাজের প্রতি ন্যায়-বিচারের জন্য স্বচ্ছ তদন্ত করে সত্য সামনে আনা জরুরি। সেই প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই এই মামলাটি সিবিআই-এর হাতে তুলে দিতে চায় আদালত। সেই অনুযায়ী রাজ্য সরকারকে এই মর্মে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে যে, যত দ্রুত সম্ভব মামলাটি সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিক তারা।”

ডিভিশন বেঞ্চের রায়কে ঘুরিয়ে কটাক্ষ করলেও ঢোক গিলে স্বাগত জানিয়েছে তৃণমূল। রাজ্য সরকারের অবস্থান কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের বিরুদ্ধে নবান্ন সুপ্রিম কোর্টে গেলে জনগণের কাছে এই বার্তাই যাবে, ভাদু শেখের খুন ও বগটুই হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচনে সরকারের সদিচ্ছার অভাব আছে।

Photo- File.


Leave a Reply

Your email address will not be published.