মদ বেচে সরকারের আয় হচ্ছে কিন্তু মদ নাগরিকদের আয় খেয়ে নিচ্ছে কিনা সেই দিকেও নজর রাখছে তো সরকার?


যে মদ মানুষের নিঃস্ব হ‌ওয়ার পর্যন্ত কারণ সেই মদ‌ই নাকি এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আয়ের অন্যতম উৎস ! মদ বেচে সরকারের আয় হচ্ছে ভাল কথা, কিন্তু মদের নেশা যদি রাজ্যের বিরাট সংখ্যক মানুষের কর্মক্ষমতা হরণ করে নেয় শেষ পর্যন্ত সর্বনাশ হবে কার ? লিখলেন উত্তম দেব-

রাজ্যের কোষাগার যে কার্যত আইসিইউতে এই কথা গোপন রাখছেন না খোদ মুখ্যমন্ত্রী‌ই। দিন কয়েক আগেই ভরা মিটিংয়ে দলের জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফ সাফ জানিয়ে দেন – এখন চাই চাই করবেন না কারণ সরকারের কিছু আর্নিং নেই সব বার্নিং । এই পরিস্থিতিতে মদ‌ই নাকি মান রাখছে বাংলার। অন্য খাত যাই করুক মদ যে মুখ ফেরাবে না, এটা বহু আগেই বুঝতে পেরেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তাই দরাজ হস্তে মদের লাইসেন্স বিলিয়েছে সরকার। ফল মিলেছে হাতেনাতে। পশ্চিমবঙ্গ নাকি এখন মদ খাওয়ায়,মদ বেচায় দেশের মধ্যে দুই নম্বরে। এক নম্বরে উত্তরপ্রদেশ। কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার-যেই গতিতে সুরার বিক্রি বাড়ছে আশা করা যায় খুব শীঘ্রই যোগী রাজ্যকে পেছনে ফেলে এক নম্বর স্থানটি দখল করে নেবে বাংলা। যেই তিনটি উৎস থেকে রাজ্য সরকারের ঘরে সর্বাধিক রাজস্ব আসে আবগারি তার মধ্যে অন্যতম। ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি – মাত্র নয়দিনে মদ থেকে রাজ্য সরকার আয় করেছে ৬৫০ কোটি টাকা! চলতি অর্থবছরে রাজ্যের আবগারি দফতরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা। পুজোর কটাদিন রাজ্যজুড়ে মদের বাজার এতটাই তেজি ছিল পাঁচ মাস বাকি থাকতেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ফেলে সরকার। বোঝাই যাচ্ছে যে এক-একটা উৎসব মরশুম আসছে আর হেলায় পুরোনো রেকর্ড ভেঙে খান খান করে নতুন রেকর্ড গড়ে চলছেন বাংলার মদ্যপ্রেমীরা।

মদের প্রতি অত্যধিক আসক্তি মানুষের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা নষ্ট করে।

একটি হিসেব বলছে বাংলায় এখন মদ্যপায়ীর সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লক্ষ। এরা সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মীর দূত। বার থেকে বাড়ি ফিরতে পা টলমল করলে তাদের নিরাপদে ঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিতেও সরকার রাজি। যেই ছেলের রোজগারে সংসার চলে মা তো তাকে একটু বেশিই খাতির করেন। আগে মদ খেলে বাঙালি মধ্যবিত্তের জাত যেত। জাতে মাতাল তালে ঠিকরা তাই লুকিয়ে পাড়ায় ঢুকত। এখন মদ না খেলেই বরং জাত থাকে না। মদ খেয়ে এখন আর কেউ গন্ধ লুকোয় না। তবে মদ মহার্ঘ্য বস্তু। বাংলা টানলে আলাদা কথা। কিন্তু বিলিতি মদ সহজ লভ্য হলেও সস্তা নয়। কারণবারি পেটে পড়া মাত্র পথের ফকির নিজেকে আমীর ভাবতে শুরু করে। আবার মদে ডুবে প্রাসাদের রাজাও ভিখিরি হয়ে পথে বসে। আলালের ঘরের দুলালকে গোল্লায় পাঠানোর সবথেকে সহজ রাস্তা তার হাতে মদের গ্লাস ধরিয়ে দেওয়া। সেকালে কলকেতার বাবুদের ঘরে ছেলে চৌদ্দ পেরোলেই ইয়ার-বন্ধুরা ধরে মদ্যপ্রাশন করিয়ে দিত। তারপর বাবুটি বাকি জীবন মোসাহেব পরিবৃত হয়ে মদে মোচ্ছবে পার করে দিয়ে শেষতক যখন নিঃস্ব হত তখন মোসাহেবের দল কেটে পড়ত। যে মদ মানুষের নিঃস্ব হ‌ওয়ার পর্যন্ত কারণ সেই মদ‌ই নাকি এখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আয়ের অন্যতম উৎস !

মদ খেলে দেহমনে দারুণ ফূর্তি আসে। কাজেই মানুষের মদ খাওয়া খারাপ নয়। কিন্তু মদ মানুষকে খেতে শুরু করলে সংসারে অন্ধকার নামতে দেরি হয় না। যাদের পকেট সর্বদাই গরম মদ্যপান তাদের কাছে জল পানের তুল্য ব্যাপার। কিন্তু যাদের রোজগার সীমিত তারা মদ ধরলে সামাল দেবে কীভাবে ? খুব সাধারণ মানের ফরেন লিকারের সব থেকে ছোট বোতলের দাম‌ও ১২০টাকার কম নয়। কেউ যদি প্রতিদিন সন্ধ্যায় বোতলের পেছনে ১২০ টাকা করে খরচ করে মাস গেলে ৩,৬০০ টাকা তার পকেট থেকে বেরিয়ে যাবে। দশ হাজারি বাবুদের দেহেমনে যদি একবার মদের আসক্তি জাঁকিয়ে বসে তবে রাজ্য সরকারের কোষাগারে সমৃদ্ধি আসলেও তাদের সংসারের সুখ চিরদিনের মতো অস্ত যাবে। মোটা টাকা আবগারি রাজস্ব আসছে ভাল কথা । মদ বেচার টাকায় সরকার চলছে এটাও মেনে নেওয়া গেল । কিন্তু রাজ্য শুদ্ধু মানুষ মদে ডুবে গেলে আখেরে কি সরকারের ভাল হবে ?

সীমিত আয়ের মানুষের আয়ের একটা বড় অংশ মদের পেছনে ব্যয় হতে থাকলে সংসারে অনটন আসতে বাধ্য।

লোকের রোজগার বাড়ছে না। কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। উল্টে প্যান্ডেমিকের জেরে মানুষ কাজ হারাচ্ছে। সরকার যুবকদের চাকরি দিতে অপারগ। সরকারি দফতরে ঠিকা চাকরি করলে বেতন দশ হাজারের বেশি পাওয়া যায় না। রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ বেসরকারি ক্ষেত্রে কোন‌ও না কোনও কাজ জুটিয়ে কুড়িয়েবাড়িয়ে ৭-৮, ১০-১২ হাজার কি বড়জোর ১৫ হাজার টাকা আয় করছে। সীমিত আয়ের মানুষ মদের পেছনে অধিক টাকা ব্যয় করলে তাদের সংসারে কোন‌ও দিন সমৃদ্ধি আসবে ? শরীর অ্যালকোহলিক হয়ে গেলে মানুষ দেহ ও মনের উপর স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ হারায়। ফলে স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়। এই জন্য পাঁড় মাতালকে কেউ কাজে রাখে না। মদে নেশাগ্রস্ত হয়ে রাজ্যের একটি বিরাট সংখ্যক নাগরিক কর্মক্ষমতাহীন হয়ে পড়লে আখেরে বাংলার অর্থনীতি কি উজাবে ? সরকার ঘরে ঘরে লক্ষ্মীদের ৫০০-১০০০ করে ভিক্ষা দিচ্ছে। এই টাকাতেই সংসার চলবে ? ঘরের নারায়ণরা নেশাড়ু হয়ে পড়লে লক্ষ্মীদের কী জ্বালা এই কথা কি দাপটে যিনি রাজ্যপাট চালাচ্ছেন তাঁর গোচরে নেই ? রাজ্য সরকারের হাবভাব দেখলে মনে হয় সরকার যেন লোকজনকে আরো বেশি বেশি করে মদ খেতে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। সরকার কী চায় ? নাগরিকবৃন্দ সুরার অতলে নিমজ্জিত হোক ?

Photo Credit – mathrubhumi.com. All images are symbolic only.


Leave a Reply

Your email address will not be published.